Thokbirim | logo

১০ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ | ২৪শে মে, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

সাংসারেক ‘চিজং নকমা’ উরফে রাগেন্দ্র নকরেক ।। জাডিল মৃ

প্রকাশিত : আগস্ট ১২, ২০২০, ০০:০৭

সাংসারেক ‘চিজং নকমা’ উরফে রাগেন্দ্র নকরেক ।। জাডিল মৃ

১.

রাগেন্দ্র নকরেক অনেকের কাছে চিজং নকমা, মাতবর, রাগেন মণ্ডল নামেই অধিক পরিচিত। অত্র এলাকাতো বটেই দূরবর্তী গারো এলাকাগুলোতেও এক নামেই সবাই চিনে ‘চিজং নকমা’ নামে। চিজং নকমা নামকরণের ইতিহাস অনেকে অনেকভাবেই বলে, ব্যাখ্যা করে কিংবা সেটারো কেচ্ছা বা গল্প আছে। তবে কোনটা সত্য কোনটা মিথ্যা বোঝা দায়! তিনি অত্র এলাকায় জীবন্ত কিংবদন্তি। তাঁর নিজস্ব ধারা কাজ কর্মের জন্য সবার কাছে যেমন সমাদৃত তেমনি স্মরণীয় বরণীয় হয়ে  থাকবেন আজীবন।

আজকে যে বিষয়টা ফোকাস করবো মানে যে মূল টপিক, যেটা নিয়ে কথা বলবো সেটা হলো তাঁর ধর্মের দৃষ্টিকোণ। সে ধর্ম কীভাবে দেখে এবং এখনো বেঁচে থাকাকালীন কেমন জীবন আচরণে সাথে অভ্যস্ত সেটাই সংক্ষিপ্ত আকারে আলোচনা করবো।

২.

গারো জাতি নিজস্ব ধর্ম ‘সাংসারেক’ ত্যাগ করে বেশিভাগ গারো খ্রিষ্টধর্মে দীক্ষিত হয়েছে অনেক আগেই। তবে এখন কিছু সংখ্যক  ইসলাম ধর্ম, হিন্দু ধর্ম অনু্সারি দেখা যায়/ রয়েছে। তবে সর্বোপরি যে ধর্মের প্রতি  মানুষের (গারো) অনাস্থা দেখা দিয়েছিল নতুন প্রজম্ম তা পালনে রক্ষার্থে যথেষ্ট চেষ্টা করছে, করে চলছে, সেটা হলো ‘সাংসারেক’ ধর্ম। যদিও তেমন সফলতার মুখ দেখেনি তবে তাঁদের কার্যক্রম চলমান। কতদূর ধর্ম রক্ষার্থে কিংবা জীবন দর্শনে জীবনেবোধের সাথে ধারণ করতে পারবে, সেটা সময়ই বলে দিবে! সাংসারেক ধর্ম শুধু মাত্র ধর্ম নয় একটা জীবন দর্শন। যে জীবন দর্শন ধারণের শক্তি বর্তমান প্রজম্মের কাছে খুবই সীমিত। ইচ্ছে করলেও ধারণ ক্ষমতা নেই, এতটা সোজা না! যেমন সহজ মনে হবে ততটা সোজা নয়।

সাংসারেক চিজং নকমা

সাংসারেক চিজং নকমার বাড়ির গেট।

৩.

গারো জাতির বেশিরভাগ সাংসারেক অনু্সারি যে ক’জন বেঁচে আছেন তাঁর মধ্যে মধুপুর অঞ্চলে সংখ্যায় অধিক। এখনো সাংসারেক ধর্মবলাম্বীদের অস্তিত্ব দেখতে পাওয়া যায়। যে ক’জন এখনো বেঁচে আছেন তাঁর মধ্যে রাগেন্দ্র নকরেক অন্যতম। তাঁর মেয়ে ছেলে অনেকেই রোমান ক্যাথলিক, ব্যাপ্টিস্ট, চার্চ অব বাংলাদেশ এর সাথে সংম্পৃত। কিন্তু তিনি কোন চার্চের সাথে এখনো যুক্ত হননি। তিনি মনে করেন,” মানুষের(গারো) একতা আছে শুধু সাংসারেক ধর্মে। অন্যান্য ধর্ম বিভেদ সৃষ্টি করেছে। আমার ধর্ম শয়তান ধর্ম হলেও ভালো (খ্রিষ্টানরা -শয়তান ধর্ম বলে আখ্যায়িত করে)। কারো কোন ক্ষতি করে না। হিংসা নেই, রাগ নেই, লোভ নেই আছে শুধু ভালোবাসা। সাংসারেক ধর্ম কাউকে জোর করে সাংসারেক বানাই না। নিজে থেকেই সাংসারেক হয়।”

তিনি আজীবন সাংসারেক ধর্ম পালন করছেন। কিন্তু তবুও অন্যান্য ধর্মের প্রতি কোন রাগ নেই, ক্ষোভ নেই। তাই তো তিনি বিভিন্ন চার্চের জন্য জমিদান করেছেন। তিনি আরো মনে করেন কোন ধর্ম আসলে খারাপ না সবচেয়ে খারাপ হলো মানুষ। বিভিন্ন চার্চে তাঁকে সদস্য পদ নেওয়ার জন্য আহ্বান করেছিলেন। কিন্তু তিনি নেননি। কারণ তাঁর কাছে নিজস্বতা এবং নিজেদের ধর্মের যে গ্রহণযোগ্যতা সেটাই মূখ্য।

সাংসারেক চিজং নকমার বাড়ির গেট।

সাংসারেক চিজং নকমার কাঠের তৈরি দুতলা বাড়ি

৪.

তিনি পছন্দ করেন কাঠের ঘর। তাই তো তিনি বিন্ডিং ঘর না তুলে নিজের থাকার ঘর কিংবা অন্যান্য ঘর কাঠ দিয়ে তৈরি করেছেন। তিনি বলেন, “আমি গারো মানুষ, কাঠ আছে তাই কাঠের ঘর তৈরি করেছি। যেখানে আমাদের সংস্কৃতি ঐতিহ্য প্রকাশ পায়”। তিনি সবসময় গারোদের ঐতিহ্য রক্ষায় সর্বদা সচেষ্ট। তাই যতটুকু পারেন সংস্কৃতি রক্ষার্থে চেষ্টা করে চলছেন। তথাপি একদিকে তিনি সফল কারণ তাঁর কাছে কিছু মূল্যবান সম্পদ রয়েছে।

 ৫.

তাঁর ইচ্ছা আজীবন তিনি সাংসারেক ধর্ম পালন করে যাবেন যতদিন প্রাণ আছে। এই তো ক’দিন আগে তিনি ফাদার ইউজিন হোমরিক সিএসসি’র জন্য তাঁকে স্মরণার্থে সাংসারেক নিয়মে ফাদারের চিহ্ন স্বরূপ  ‘খিম্মা’ স্থাপন করেছেন। ফাদার হোমরিকের কাছে  মধুপুর অঞ্চলের মানু্ষজন যেমন কৃতজ্ঞ তিনিও তেমন ফাদারের কাছে কৃতজ্ঞ নানাভাবেই। তাঁর সাথে ফাদারের সু-সম্পর্ক ছিল বটে। সে-ই জন্যই তো অন্য ধর্মের হলেও কিংবা ফাদার সাংসারেক ধর্মের অনু্সারি না হলেও তাঁর স্মরণার্থে যে ‘খিম্মা’ স্থাপন করা হলো তা নিশ্চিয় বিরল ঘটনা বটে। যদিও সে জাতিতে গারো নয়, তবে সে নিজেকে ‘নকরেক’ বলতো। এবং আনুষ্ঠানিকভাবে ‘নকরেক’মাহারি নিয়েছিল।

সাংসারেক চিজং নকমার বাড়ির সামনের খিম্মা

বাড়ির সামনে খিম্মা

৬.

সংক্ষিপ্ত আলোচনায় সহজেই অনুমেয় তাঁর কাছে ধর্মের দৃষ্টিকোণ কেমন! এবং কীভাবে তিনি ধর্মজীবন জীবন দর্শন যাপন করেন। তাঁর অবদানের যেমন খুবই গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় রয়েছে তেমনি তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি খুবই ইতিবাচক এবং ধর্মের ব্যাপ্তি কতটা বড় হতে পারে সেটাই দেখিয়ে দিয়েছেন। তিনি করোনাকালে স্ট্রোক করেছেন। তিনি শারীরিকভাবে দুর্বল। আপনারা সবাই উনার জন্য প্রার্থনা করবেন। যেন তাড়াতাড়ি সুস্থ্য হয়ে আগের অবস্থায় ফিরে যেতে পারেন। কারণ এমন মানুষের অবদান কিংবা আমাদের কাছে না থাকা মানে অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে যাবে। সাংসারেক ধর্মের অনু্সারি’র – জ্বলন্ত প্রদীপ জ্বলছে। যেন জোরে বাতাস না আসে, প্রদীপ যেন নিভে না যায় সে-ই প্রত্যাশা করি। আমেন।

ছবি : থকবিরিম গ্যালা।

আরো খবর

ফাদার হোমরিকের  স্মরণে  ‘ মিমাংগাম’ করলেন চিজং নকমা

জলছত্র ধর্মপল্লিতে ফাদার হোমরিকের স্মরণ সভা

খিম্মা ( স্মৃতি স্তম্ভ/খুঁটি ) ।। আদি গারো সাংসারেক রীতি

দীনেশ নকরেক ।। সাংসারেক খামাল




সম্পাদক : মিঠুন রাকসাম

উপদেষ্টা : মতেন্দ্র মানখিন, থিওফিল নকরেক

যোগাযোগ:  ১৯ মণিপুরিপাড়া, সংসদ এভিনিউ ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৫। 01787161281, 01575090829

thokbirim281@gmail.com

 

থকবিরিমে প্রকাশিত কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। Copyright 2020 © Thokbirim.com.

Design by Raytahost
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x