Thokbirim | logo

১১ই কার্তিক, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ | ২৭শে অক্টোবর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

মুক্তিযোদ্ধা দীলিপ রিছিলের যুদ্ধকথা  ।। মাহমুদ আবদুল্লাহ

প্রকাশিত : আগস্ট ১১, ২০২০, ১৪:২৮

মুক্তিযোদ্ধা দীলিপ রিছিলের যুদ্ধকথা  ।। মাহমুদ আবদুল্লাহ

বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করেছেন গারো মুক্তিযোদ্ধা দীলিপ রিছিল। একাত্তরে সংগ্রামী এক কিশোর ছিলেন তিনি।মুক্তিযোদ্ধা দীলিপ রিছিলের বাড়ি ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট উপজেলার ভুবনকুড়া ইউনিয়নের ঐতিহাসিক যুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত তেলিখালী গ্রামে। তিনি ১৯৫৪ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন। পিতার নাম গজেন্দ্র দ্রং, মাতার নাম বিমলা রিছিল। তিনি ১৯৬৯ সালে বিরিশিরি পিসি নল মেমোরিয়াল হাইস্কুল থেকে এসএসসি পাস করেন।
১৯৭১ সালে তিনি ময়মনসিংহ নাসিরাবাদ কলেজের একাদশ শ্রেণির ছাত্র। বন্ধুরা ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতির সাথে যুক্ত থাকায় তিনি ছিলেন এ ধারার একজন সমর্থক। মার্চ মাসে অসহযোগ আন্দোলন শুরু হলে বাড়ি চলে আসেন। ২৬ মার্চ গ্রামের বাড়িতে ছিলেন। স্বাধীনতা ঘোষণার পর এলাকার লোকজন ভারতে চলে যেতে থাকেন। স্থানীয় সুযোগসন্ধানী লোকেরা নানাভাবে মানুষজনকে উত্যক্ত করতে শুরু করে। বিভিন্ন স্থানে ডাকাতি বেড়ে যায়। এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সময়ে দীলিপ রিছিলের পরিবারের সবাই ভারতে চলে যান। যাবার সময় তেমন কিছুই নিয়ে যেতে পারেনি। তাছাড়া পরিস্থিতি এমন ছিলো যে ধন-সম্পদের চাইতে জীবনের মায়া ছিলো বেশি। তার এক মামা এখানে থেকে গিয়েছিলন, সে জন্মভূমি ছেড়ে যেতে চাইল না। পরে পাকিস্তানি আর্মি এ এলাকায় এলে তাদেরকে চাল, ডাল দিয়ে সহযোগিতা করেছে।
মিশনারির কারণে কিছুদিন পাকিস্তানি বাহিনী গারো খৃস্টানদের কিছু বলেনি। ভারতে গিয়ে কিছুদিন তিনি যাত্রাকোনায় থাকলেন এক আত্মীয় বাড়িতে। ওখান থেকে ডিমাপাড়া শরণার্থী শিবিরে গিয়ে উঠেন। শিবির নানারকম সমস্যায় জর্জরিত। ডায়রিয়াসহ নানা অসুখে লোকজন মারা যাচ্ছে। শরণার্থী শিবিরের জীবন ছিল অত্যন্ত কষ্টকর। সমসময় দ্বিধাদ্বন্দ্বে থাকতেন আর দেশে ফিরে যেতে পারবেন কি-না।
গারো মুক্তিযোদ্ধা

গারো মুক্তিযোদ্ধা দিলীপ রিছিলকে গার্ড অব অনার প্রদর্শন করা হয়

তিনি মুক্তিযুদ্ধে যাবেন প্রথমে এমন সিদ্ধান্ত ছিল না। একদিন বন্ধুদের মধ্যে প্রদীপ চিসিম, তুস চিসিম, আরেং রিছিল, ধরনী রিছিল, নিকোলাস মারাক, পংকজ রেমা, সুরুজ রেমা, আলিনুস ঘাগ্রা, জিনেন্দ্র দ্রং প্রমুখ ডালু ট্রানজিট ক্যাম্পে যাচ্ছিল। তিনিও তাদের সাথে গেলেন। এরকম আকস্মিকভাবে যুদ্ধে যোগ দেবার পর নিজের মধ্যে অন্যরকম সাহস এবং আনন্দ পাচ্ছিলেন। ডালুতে থাকলেন ১৫ দিন। এখানে পিটি-প্যারেড হলো। এরপর তাদের নিয়ে যাওয়া হলো তুরা রংনাবাগ ক্যাম্পে। রংনাবাগে একমাসের অস্ত্র ট্রেনিং হলো। রাইফেল, এলএমজি মার্টার, গ্রেনেড ইত্যাদি অস্ত্র ব্যবহার কৌশলের ট্রেনিং হলো। এছাড়াও এক্সক্লুসিভ ব্যবহার কৌশলও শেখানো হলো। তিনি ইঞ্জিনিয়ারিং কোর-এ গেলেন। রংনাবাগ থেকে ধামালগিরি গেলেন এক সপ্তাহের  জঙ্গল ট্রেনিং এর জন্য। জুলাই মাসের শেষ দিকে আবার ধামালগিরি থেকে রংনাবাগে ফিরে এলেন।
এখানে তাদের নামে অস্ত্রের ইস্যু হল। দীলিপ রিছিলকে দেওয়া হলো এসএমজি। আগস্ট মাসে বর্ডারে আসার সিদ্ধান্ত নিলেন। তাদের গ্রুপে মোট সদস্য ছিল ৮০ জন। এরমধ্যে পাঁচজন ইঞ্জিরিয়ারিং কোরের। তাদেকে অপারেশনে পাঠানো হলো। ভারতের ভেতর দিয়ে তারা লক্ষ স্থানে গিয়ে অপারেশন না করেই ফিরে এলেন। তাদের হাতে পর্যাপ্ত অস্ত্র এবং অ্যামুনিশন না থাকায় অপারেশন ব্যর্থ হলো। ডালুতে তারা ফিরে এলেন। এরমধ্যে একদিন রাত ১২টার দিকে সীমান্ত অতিক্রম করে দেশের ভেতরে ঢুকলেন। উদ্দেশ্য সাধারণ জনগণের মধ্যে থেকে শত্রুপক্ষের সাথে গেরিলা যুদ্ধ পরিচালনা করা। কিন্ত তাদের মধ্যে ভুল বুঝাবুঝি হবার কারণে দলের একটি অংশ ভারতে ফিরে যায়। এতে বাকি অংশ অনেকটা দুর্বল হয়ে পড়ে এবং মনোবল কমে যায়। তাছাড়া যারা ভারতে ফিরে যায় তাদের হাতে অধিকাংশ গুলি এবং এ্যামুনিশন থাকায় তারা অস্ত্রের দিক দিয়েও দুর্বল হয়ে পড়েন। তবুও আবদুল গফুর এর নেতৃত্বে বাকি অর্ধেক অংশ বাংলাদেশে প্রবেশ করেন।
প্রচণ্ড বৃষ্টির মধ্যে নৌকায় করে ভোগাই নদী পার হন। হাঁটতে হাঁটতে তারা চলে যান হালুয়াঘাট-নালিতাবাড়ির মাঝামাঝি একটি গ্রামে। এখানে রাতে থাকলেন। এরপর বিভিন্ন স্থানে অবস্থান করে শুধু রাতে বের হন অপারেশনের জন্য। এ বাহিনীতে গারো মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন ১০/১২ জন। অসংখ্য চোরাগোপ্তা আক্রমণ করেন। বিশেষত রাজাকার বিরোধী অপরেশর করেন। তাছাড়া মাঝেমাঝে আর্মি ক্যাম্পে আকস্মিক গুলি ছুঁড়ে তাদের মধ্যে আতংক সৃষ্টি করতেন। এভাবে গেরিলা যোদ্ধা হিসেবে তারা সাহসী হয়ে উঠেন। কিন্তু তাদের গোলা-বারুদ শেষ হয়ে আসছিল এবং নতুন গোলাবারুদ হাতে এসে পৌঁছাচ্ছিল না। হঠাৎ একদিন পাকিস্তানি বাহিনী ও রাজাকার দ্বারা ঘেরাও হয়ে যান তারা। সামান্য কিছু গোলাবারুদ নিয়ে পাল্টা আক্রমণ শুরু করেন।
কিন্তু দ্রুত তাদের গোলাবারুদ ফুরিয়ে যাওয়ায় পশ্চাদপসরণে বাধ্য হন। এতে তাদের বাহিনী বেশ এলোমেলো হয়ে পড়ে। এ সময় হালুয়াঘাটের বাঘাইতলা গ্রামের আরেং রিছিল ও মনিকুড়া গ্রামের পরিমল দ্রং শত্রুপক্ষের হাতে ধরা পড়েন। এবং তাদেরকে অমানুষিক নির্যাতন করে হত্যা করা হয়। বাকি মুক্তিযোদ্ধারা ডালুতে ফিরে আসেন।
ইতোমধ্য ভারতীয় আর্মি সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণ শুরু করেন। মুক্তিযোদ্ধা দীলিপ রিছিল হালুয়াঘাটের তেলিখালীসহ আরো কয়েকটি যুদ্ধে অংশ নেন।
যুদ্ধকালীন সময়ে তার কোম্পানি কমন্ডার ছিলেন ঝিনাইগাতীর আবদুল গফুর ও হালুয়াঘাটের চরবাঙ্গালিয়ার উইলিয়াম ম্রং। প্লাটুন কমান্ডার ছিলেন হালুয়াঘাটের আচকিপাড়া গ্রামের প্রদীপ কুমার চিসিম। ১৬ ডিসেম্বর তিনি ডালুতে ছিলেন। পরে ময়মনসিংহ মিলিশিয়া ক্যাম্পে যোগ দেন। পরবর্তীকালে রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু মুক্তিযোদ্ধাদের স্ব-স্ব  পেশায় ফিরে যেতে বলেন। তিনি বাড়ি চলে আসেন। এবং পুনরায় কলেজে ভর্তি হন।
১৯৭২ সালে ময়মনসিংহের নাসিরাবাদ কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাস করেন।মুক্তিযোদ্ধা দীলিপ রিছিল ১৯৭৯ সালে ঝিনাইগাতী গ্রামের জহিন্দ্র ম্রং ও গেন্দিমনি মানখিনের কন্যা সুনিতা মানখিনকে বিয়ে করেন। সুনিতা মানখিন ১৯৯৮ সালে মারা গেলে তার ছোট বোন মুক্তি মানখিনকে বিয়ে করেন। প্রথম পক্ষের সন্তানদের নাম- বেনডিক মানখিন, উর্মী মানখিন ও সিনথিয়া মানখিন। দ্বিতীয় পক্ষের সন্তানদের নাম- চান মানখিন ও চিসা মানখিন। মুক্তিযোদ্ধা দীলিপ রিছিল জিবিসি মিশনারি স্কুলের শিক্ষকতা পেশায় দীর্ঘদিন নিয়োজিত ছিলেন। তিনি অনেকদিন ধরেই স্ট্রোক করে অসুস্থ ও প্যারালাইস হয়ে গ্রামের বাড়িতে ছিলেন। ২০২০ সালের ৮ আগস্ট বিকাল ৩ টার দিকে তিনি না ফেরার দেশে চলে গেছেন।
তথ্যসহায়তা:
১. সাক্ষাৎকার: মুক্তিযোদ্ধা দীলিপ রিছিল, তেলিখালী, হালুয়াঘাট
২. বাংলাদেশের আদিবাসী মুক্তিযোদ্ধা, শফিউদ্দিন তালুকদার
৩. মুক্তিযুদ্ধে নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী, আইয়ুব হোসেন
লেখক পরিচিতি
মাহমুদ আবদুল্লাহ হালুয়াঘাট দর্পণের সম্পাদক এবং তরুণ লেখক।

লেখক মাহমুদ আবদুল্লাহ

এ সম্পর্কিত আরো খবর

বীর মুক্তিযোদ্ধা দীলিপ রিছিল আর নেই

সমরাজ মারাক ।। মুক্তিযোদ্ধার মুখচ্ছবি

সন্ধ্যা রানী সাংমা ।। মুক্তিযোদ্ধার মুখচ্ছবি

কোম্পানি কমান্ডার ডা. উইলিয়াম ম্রং ।। মুক্তিযোদ্ধার মুখচ্ছবি




সম্পাদক : মিঠুন রাকসাম

উপদেষ্টা : মতেন্দ্র মানখিন, থিওফিল নকরেক

যোগাযোগ:  ১৯ মণিপুরিপাড়া, সংসদ এভিনিউ ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৫। 01787161281, 01575090829

thokbirim281@gmail.com

 

থকবিরিমে প্রকাশিত কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। Copyright 2020 © Thokbirim.com.

Design by Raytahost