Thokbirim | logo

১লা আষাঢ়, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ | ১৫ই জুন, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

কোভিড-১৯ ও আদিবাসী সক্ষমতা ।। পর্ব-১।। পাভেল পার্থ

প্রকাশিত : আগস্ট ১১, ২০২০, ১৫:৩৬

কোভিড-১৯ ও আদিবাসী সক্ষমতা ।। পর্ব-১।। পাভেল পার্থ

অংথাংয়ের পিজংয়ে কী আছে?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছে। অং থাং সিয়্যেনের বয়স তখন তিন কী চার। একদিন দুটি জাপানি জেট ফাইটার বিমান হঠাৎ তাদের এলাকায় আছড়ে পড়ে। পটুয়াখালীর কলাপাড়ার ধুলাশ্বর ইউনিয়নের বৈলতলী রাখাইন গ্রামের কাছে। সেই বিকট আওয়াজ আর ধোঁয়ার স্মৃতি এখনো তার মনে ভাসে। করোনাকালের থমকে যাওয়া সময়ে এমন আরো কত স্মৃতি তড়পায়। করোনার আগে আরো দুই মহামারীর কথা মনে আছে তার। ‘চাউ রগা (গুটিবসন্ত)’ আর ‘ওয়্যাঁও রগা (কলেরা)’। মহামারীকে রাখাইন ভাষায় বলে ‘রিনাহ রগা’। তার নিজেরই বসন্ত হয়েছিল, ডান হাতে গুটির দাগ এখনো আছে। কলেরার চেয়ে বসন্তে মানুষ মরেছিল বেশি, আর কলেরায় ভুগেছিল বেশি। অং থাং সিয়্যেন এখন একজন প্রসিদ্ধ রাখাইন ‘সিত্যেমা (কবিরাজ)’।

তিনি আদি রাখাইন চিকিৎসাবিদ্যা ‘বিংদ ছেরা’ জানেন। তার কাছে শতবছরের প্রাচীন অনেক ‘পিজং (তালপাতায় লেখা আদি চিকিৎসাশাস্ত্র)’ আছে। সেখানে নানা ভেষজবিধি ও করণীয় লেখা আছে। ইতিহাস থেকে ইতিহাসে সামাল দিতে হয়েছে নানা মহামারী ও বিপদ। গড়ে ওঠেছে মহামারী সামালের স্বাস্থ্যবিধি। আজ করোনাকালেও সেইসব বিধির নিয়ম আর শিখনগুলোই কাজে লাগছে রাখাইনদের। বাংলাদেশে রাখাইনদের মোট জনসংখ্যা প্রায় ১৪,৫০০। এর ভেতর পটুয়াখালী ও বরগুণা নিয়ে বরিশাল বিভাগের রাখাইন জনসংখ্যা প্রায় আড়াই হাজার। এখনও পর্যন্ত রাখাইনদের ভেতর কেউ করোনায় মারা যাননি, এমনকি উপসর্গ নিয়েও মৃত্যু হয়নি। পাশাপাশি গুরুতর সংক্রমণের কোনো তথ্যও নেই। দেশ-দুনিয়া যখন করোনায় বেসামাল, কিন্তু রাখাইনরা সামাল দিয়ে চলেছেন এক বৈশ্বিক মহামারী।

কীভাবে? মহামারী সামালে তিনটি বিষয় মেনে চলার বিধান রাখাইনদের ভেতর আদি থেকেই চল ছিল। লকডাউন-সঙ্গনিরোধ-সাময়িক বিচ্ছিন্নতা বিষয়ক স্বাস্থ্যবিধি পালন, বিশেষ খাদ্যাভাস এবং সামাজিক কৃত্য-রীতি আয়োজন। অসুখ ও মহামারী থেকে বাঁচতে রাখাইনরা সামাজিকভাবে ‘চোয়াইসেন মা এম্প্যা’পূজা আয়োজন করেন। এসময় পাড়ায় মানুষের প্রবেশ ও যাতায়াত নিষিদ্ধ করা হয়। পরবর্তীতে পাড়ায় প্রতিটি বাড়ি কাপাস তুলোর সূতা দিয়ে ঘিরে ফেলা হয় এবং পূজার মঙ্গল পানি ছিটিয়ে পরিচ্ছন্ন করা হয়। এভাবে মহামারী সামাল দিতে রাখাইনরা ‘প্রারাই এরা’ বিধির মাধ্যমে মহামারী শেষ না হওয়া কিছুদিনের জন্য পাড়া বন্ধ করে দেন। কঠিন অসুখ ও মহামারীতে কেউ মারা গেলে বা গ্রামের বাইরে কেউ মারা গেলে রাখাইনদের ভেতর সেই মৃতব্যক্তির সৎকারে কঠিন সামাজিক বিধি পালিত হয়।

প্রতিটি রাখাইন পাড়ায় দু ধরনের ত্যান্সায় বা শশ্মান থাকে। এনঙ্গাদু ত্যান্সায় বা অতিথি শশ্মান এবং রওয়া ত্যান্সায় বা পাড়ার শশ্মান। রোগের সংক্রমণ ও মহামারীতে মৃতদের সৎকার থেকেই এই বিশেষ স্থাপনার চল হয়েছে। কোনো ব্যক্তি যদি পাড়া বা গ্রামের বাইরে মারা যান তবে মৃতদেহকে গ্রামের বাইরে শশ্মান বা বিহার থেকে নিরাপদ দূরত্বে তৈরি অস্থায়ী ঘরে সৎকারের আগ পর্যন্ত রাখা হয়। শেষকৃত্যের আনুষ্ঠানিকতা শেষে মৃতদেহকে ‘এনঙ্গাদু ত্যান্সায়’ শশ্মানে সৎকার করা হয়। মৃতের ব্যবহৃত বস্ত্র, কাপড় ও তার স্পর্শে আসা সকলকিছু পুড়িয়ে ফেলা হয়।

গ্রামের বাইরে বা রোগের সংক্রমণে মৃতদের শেষকৃত্যে অংশগ্রহণকারীদের ঘরে ফেরার আগে গ্রামের বাইরের পুকুরে ভালো করে স্নান করতে হয়। ঘরের সামনে হলুদ মেশানো পানি এবং আগুন জ্বালিয়ে রাখা হয়। হলুদ-পানিতে হাত-পা ধুয়ে এবং আগুনে সেঁকে তারপর ঘরে প্রবেশ করতে হয়। কেবল রাখাইন নয়, দেশের প্রায় সকল আদিবাসী সমাজেই মহামারী সামালের লোক স্বাস্থ্যবিধি ও কৃত্যআচার আছে। কোভিড-১৯ থেকে শুরু করে আগামীর কোনো মহামারী সামালের ক্ষেত্রে এসব বিধি ও ব্যবস্থাপনা থেকে আমাদের শেখার ও জানার আছে অনেককিছু।

বিগত মহামারী ও আদি অভিজ্ঞতা

২০১৯ সনের ডিসেম্বরে চীনের উহানে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ শুরু হলে বিষয়টিকে ‘প্রাণ-প্রকৃতি-প্রতিবেশের’ সংকট হিসেবে চিহ্নিত করে লেখা শুরু করি জানুয়ারি থেকে। শুরু থেকেই মহামারী সামালে আদিবাসী সমাজের বিজ্ঞান ও দর্শনকে বোঝার চেষ্টা করেছি। দীর্ঘ পাঁচ মাস ধরে খোঁজার চেষ্টা করেছি মহামারী সামালের আদিবাসী বিজ্ঞানভাষ্যের স্মৃতিটুকরোগুলো। করোনা মহামারী সামালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা যেসব স্বাস্থ্যবিধি ঘোষণা করছে, সেসব আদিবাসী সমাজে বহু আগেই চর্চা হয়েছে। নিজস্ব কায়দায় লকডাউন,আইসোলেশন, সঙ্গনিরোধ, বিশেষ খাদ্যাভাস থেকে শুরু করে লক্ষণ ভিত্তিক চিকিৎসা পর্যন্ত।

রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘ক্ষুদ্র জাতিসত্তা’, ‘উপজাতি’, ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী’, ‘নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী’, ‘ট্রাইবাল’ পরিচয়গুলো ব্যবহৃত হলেও চলতি আলাপে ‘আদিবাসী’ প্রত্যয়খানি ‘আত্মপরিচয়ের অধিকার’ মান্য করে ব্যবহৃত হয়েছে। ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আইন ২০১০ এ চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, ম্রো, তঞ্চঙ্গা, বম, পাংখোয়া, চাক, খিয়াং, খুমি, লুসাই, কোচ, সাঁওতাল, ডালু, উসাই(উসুই), রাখাইন, মণিপুরী, গারো, হাজং, খাসিয়া, মং, ওরাও, বর্মণ, পাহাড়ী, মালপাহাড়ী, কোল এবং বর্মণ নামে মোট ২৭ জনগোষ্ঠীর নাম অন্তর্ভূক্ত করা হয়। পূর্বের ২৭ আদিবাসী জাতির পাশাপাশি বর্তমানে কুর্মি মাহাতো, কন্দ, গঞ্জু, গড়াইত, মালো, তুরি, তেলী, পাত্র, বানাই, বাগদী, বেদিয়া, বড়াইক, ভূমিজ, মুসহর, মাহালী, রাজোয়ার, লোহার, শবর, হদি, হো এবং কড়া এই ২১ আদিবাসী জাতির নাম পরবর্তীতে তফশিলভূক্ত হয়।

সাধারণভাবে দেশের আদিবাসীদের অনেকে ‘সমতল’ ও ‘পাহাড়ের’ এভাবে ভাগ করেন। আবার বিদ্যায়তনিকভাবে ‘মঙ্গোলয়েড’ ও ‘অস্ট্রালয়েড’ এরকম ভাগও আছে। করোনাকালে চলমান পাঁচমাসের গবেষণায় দেখতে পেয়েছি তুলনামূলকভাবে ‘মঙ্গোলয়েড’ আদিবাসী জাতিসমূহের ভেতর মহামারীর স্মৃতি ও বিধি পালনের চর্চা এখনো প্রবল। ‘মঙ্গোলয়েড’ আদিবাসী জাতিদের ভেতর মহামারী, লকডাউন, বিচ্ছিন্নতা, সঙ্গনিরোধ বিষয়ক সুস্পষ্টবিধি ও এসবের নিজস্ব নাম পাওয়া যায়। ‘অস্ট্রালয়েড’ আদিবাসী জাতিদের ভেতর মহামারী সামালের প্রার্থনা, পূজা ও কৃত্যের চল থাকলেও সুরক্ষাবিধির বৈচিত্র্য ও নিজস্ব শ্রেণিকরণ সকলের খুঁজে পাওয়া যায়নি। অধিকাংশদের ভেতর কলেরা, গুটিবসন্ত, কালাজ্বর মহামারীর সাম্প্রতিক স্মৃতি আছে।

মহামারী সামালের আদিবাসী স্বাস্থ্যবিধিসমূহ ‘সুপ্রাচীন’ এবং এসব বিধি মূলত জাতিসমূহের ভেতর প্রচলিত আদি ধর্মদর্শনের সাথে অধিকতর সম্পর্কিত। দেখা গেছে অধিকাংশ জাতি এবং অঞ্চলে মহামারী সামালের স্বাস্থ্যবিধিগুলো করোনা মহামারীকালে আবারো ‘লকডাউন-সাময়িক বিচ্ছিন্নতা-বিশেষ খাদ্যাভাস এবং কিছু বিশেষ কৃত্য’ হিসেবে পুন:চর্চার চল শুরু হলেও এসব আদি বিধি ও বিধি সম্পর্কিত দর্শন এবং ভাষিক অনুষঙ্গের প্রচলন নতুন প্রজন্মের কাছে ‘প্রায় অনুপস্থিত’।

চলবে…

কভার প্রচ্ছদ : শিল্পী তিতাস চাকমা

লেখক পরিচিতি

পাভেল পার্থ  :  প্রাণবৈচিত্র্যির গবেষক ও লেখক। আদিবাসীদের পরম বন্ধু।

লেখক ও গবেষক পাভেল পার্থ

পাভেল পার্থ

 

কোভিড-১৯ সম্পর্কিত আরো খবর

কোভিড-১৯ ও আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস ।। সোহেল হাজং

রাষ্ট্রের অ্যান্টাগনিজম ।। নিগূঢ় ম্রং

কোভিড-১৯: আদিবাসী দিবসে গ্রিকা করতে পারলেন না জনসন মৃ

আদিবাসী ধর্মের আধ্যাত্মিকতা  ।। গৌরব জি. পাথাং

করোনা কেড়ে নিয়েছে স্বপ্ন ।। বিউটিশিয়ানদের বয়ান।। পর্ব-১

করোনা তবু আশায় বাঁধি বুক ।। বিউটিশিয়ানদের বয়ান।। পর্ব-২




সম্পাদক : মিঠুন রাকসাম

উপদেষ্টা : মতেন্দ্র মানখিন, থিওফিল নকরেক

যোগাযোগ:  ১৯ মণিপুরিপাড়া, সংসদ এভিনিউ ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৫। 01787161281, 01575090829

thokbirim281@gmail.com

 

থকবিরিমে প্রকাশিত কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। Copyright 2020 © Thokbirim.com.

Design by Raytahost
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x