Thokbirim | logo

৮ই বৈশাখ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ | ২১শে এপ্রিল, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

সংস্কৃতি সংরক্ষণে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট জানার প্রয়োজনীয়তা  ।। পর্ব-২ ।। মণীন্দ্রনাথ মারাক

প্রকাশিত : আগস্ট ০৮, ২০২০, ১০:১৭

সংস্কৃতি সংরক্ষণে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট জানার প্রয়োজনীয়তা  ।। পর্ব-২ ।। মণীন্দ্রনাথ মারাক

পূর্ব প্রকাশের পর…

এই উপ-মহাদেশে অতীতে কোনো ইতিহাস লেখক বা ঐতিহাসিক ছিলেন না। রামায়ণ ও মহাভারত মহাকাব্যে কোনো কোনো সময় কোনো কোনো মুনিঋষি কোনো রাজা বা মহারাজার পূর্বপুরুষের বংশবলি ও কার্যাবলি বলিতেন। তাহারই কাব্য মহাকাব্য লিখিতেন, রাজ-রাজাদের ও বীর পুরুষদের শৌর্যবীর্য বর্ণনা করিতেন, তাঁহাদের গুণকীর্ত্তন করিতেন। এই সকলের মধ্যে কিছু কিছু ঐতিহাসিক বিষয়বস্তু থাকিলেও পূর্ণাঙ্গ ও বিজ্ঞান সম্মতভাবে ইতিহাস লিখিত হয় মুসলিম আমলে মুসলিম ঐতিহাসিকদের দ্বারা। আর ‘বুরুঞ্জ’ নমে ইতিহাস লিখিয়া সংরক্ষণ করেন আসামের অহোমেরা। ব্রিটিশ আমলে আর্বিভাব হন হিন্দু-ঐতিহাসিকগণ। গারোরা সবেমাত্র লেখাপড়া আরম্ভ করিয়া অনুসন্ধান করিতেছে তাহাদের অতীত ইতিহাস। কাজটি অতি দুরূহ। তবুও তাহারা চেষ্টা চালাইতেছে। সম্প্রতি মি. জবাং ডি. মারাক The Garo History নামে একটি ইতিহাস পুস্তিকা রচনা করিয়াছেন। ড. মিল্টন সাংমা History and Culture of the Garos.নামে একটি পুস্তক রচনা করিয়াছেন। মি. দেওয়ানসিং রংমুথু নিরক্ষর, বয়স্ক গারোদের নিকট হইতে ব্যক্তিগতভাবে গারোদের Folk Tales, Folk Lores পৌরাণিক কাহিনি, অতীত ইতিহাস প্রকৃতি সংগ্রহ করিয়া গিয়াছেন। মি. মিহির এস. সাংমা অপ্রকাশিত ঐতিহাসিক তথ্যাদি সংগ্রহ করিয়া প্রকাশ করিতেছেন। এইভাবে এখন শিক্ষিত গারোরা অন্যান্য বিষয়ে বই পুস্তক লিখিতেছেন। কথিত আছে, অতিতে গারোদের পশুর চামড়ায় নিজেদের লিখিত বই-পুস্তকাদি ছিলো। তিব্বত হইতে বই উপমহাদেশে আগমণকালে দুর্ভিক্ষ খাদ্যের অভাবে সেই সব পুস্তকাদি রান্না করিয়া খাইয়া ফেলে। মি.গাব্রিয়েল রাংসার মতে, এই ঘটনা ঘটে ব্রহ্মদেশের মান্দালয়ে। আর মি.দেওয়ানসিং রংমুথুর মতে, ভারতের উত্তর প্রদেশের কুমায়ূন বিভাগের গাড়োয়াল অঞ্চলে। তিনি লিখিয়াছেনÑ

Chengo A۰chik Pagitchamrang Ahsong Tibetni

Jahrehae jahnengthakon ‘Brio Garhwalni’

Matbilgilrang segiminko Achik Jatni

Song۰e chahjok manjae adal.’

অর্থাৎ-পূর্বে গারোদের পূর্বপুরুষগণ তিব্বত হইতে পদব্রজে গাড়োয়াল পর্বতে আসিয়া অবস্থান কালে দুর্ভিক্ষের কবলে পড়েন। তখন খাদ্যের অভাবে গারো জাতিরা পশুর চামড়ায় লিখিত বই-পুস্তকাদি রান্না করিয়া আহার করেন। ব্যবহারের পূর্বে মানুষ তালপাতায়, পদ্মপাতায়, পশুর চামড়ায়, মাটির টেবলেটে প্রভৃতিতে লিখিত।

গারোরা জগতের অন্যান্য জাতির ধর্মীয় বিশ্বাসের মতই এক ঈশ্বরের সৃষ্টিতে বিশ্বাস করিত। গারোদের সেই সৃষ্টিকর্তার নাম, ‘তাতারা’। ‘আপাসং আগানা’ পুস্তকে তাঁহার কাজ ও গুণগত নাম অনুসারে তাহার শতাধিক নাম আছে বলিয়া উল্লেখ আছে। তাঁহারই আদেশে বিভিন্ন দেবদেবী তাঁহারই বন্টনকৃত কাজ বা দায়িত্ব সম্পন্ন করিয়া পৃথিবীটা পরিপূর্ণ করিয়া সৃষ্টি করিয়াছেন। তাঁহারই আদেশে দেবতা ‘রুরুবে কিন্নাসে মারেসু মারেবক’ জগতের প্রথম নরনারী-‘শান্তি ও (Sane and Mune) কে ‘আমিতং আসিলজং’ নামক স্থানে সৃষ্টি করিয়া রাখেন। তাঁহাদেরই সন্তান-সন্তুতি ‘গানচেং ও দজং’। আর তাঁহাদেরই পরবর্তী বংশধরদের মধ্যে ‘নরমান্দি’ (পুরুষ) ও ‘দিমারঞ্চি বা বিমারিসি’ (নারী), গারো জাতির আদি পিতা-মাতা। ‘মান্দে’ অর্থ মানুষ। ‘নর’ শব্দ সংস্কৃত শব্দ, ইহার অর্থ পুরুষ মানুষ। কেন এই সংস্কৃত শব্দ ও গারো শব্দ একত্রে ব্যবহৃত হইলে তাহা বুঝিতে পারিলাম না। ইহা কি বৈদিক সংস্কৃতির প্রভাব?

গারোরা এক সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাসী। সৃষ্টিকর্তা হিসাবে তাতারা আর এক নাম ‘দাকগিপা’। জগতের মালিক ও প্রভু হিসাবে তাঁহার আর এক নাম-‘নকগিপা’ বা ‘নকমাগিপা’। গারোরা অন্যান্য আদিবাসী ও জাতিদের মতই রোগ-ব্যধি ভুত-প্রেত, ও নানা প্রকার মন্দ শক্তি হইতে রক্ষা পাইবার জন্য নানা দেব-দেবীর পূজা অর্চনা করিয়া থাকে ঠিকই; কিন্তু তাহাদের জীবনের মালিক বা প্রভু বলিয়া স্বীকার করে না। এই প্রসঙ্গে গোয়ালপাড়া মিশনের আমেরিকান ব্যাপ্টিস্ট মিশনারির উক্তি আলোচনা করিতে চাই। তিনি বলিয়াছেন- গারোদের কোন ঈশ্বর জ্ঞান নাই। কিন্তু নৃবিজ্ঞানী ল্যাং বলিয়াছেন-“জগতের বিভিন্ন আদিবাসী ও জাতিরা নানা দেব-দেবীর পূজা অর্চনা করিলেও এবং এক সৃষ্টিকর্তা ঈশ্বর সম্বন্ধে অস্পষ্ট হইলেও জ্ঞান ও বিশ্বাস আছে। তাহাদের এই জ্ঞান ও বিশ্বাস তাহারা আধুনিক নিরাকার ও একেশ্বরবাদীদের নিকট হইতে পায় নাই। তাহাদের একান্তভাবেই নিজস্ব। কিছু ধর্মতত্ত্ব স্কুল না থাকায় শিক্ষা ও চর্চা অভাবে ধর্মীয় দর্শন উন্নত ও বিকশিত হইতে পারে নাই। নৃবিজ্ঞানী ল্যাং এর এই অভিমত গারোদের জন্যও প্রযোজ্য বলিয়া আমি মনে করি।

চলবে…

লেখক পরিচিতি 

গারো সম্প্রদায়ের জ্ঞানতাপস, পণ্ডিতজন রেভা. মণীন্দ্রনাথ মারাক জন্মগ্রহণ করেন ১৯৩৭ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি। বর্তমনে তিনি দুর্গাপুর থানা ধীন নিজ বাড়ি বিরিশিরির পশ্চিম উৎরাইল গ্রামে বসবাস করছেন।  দুই ছেলে  এক মেয়ে। স্ত্রী প্রতিভা দারিংও একজন শিক্ষক ছিলেন। বর্তমানে অবসরে আছেন। রেভা. মণীন্দ্রনাথ মারাকের অনেক লেখা বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। উনার গারো সংস্কৃতি এবং বিরিশিরি মিশিন এবং ব্যাপ্টিস্ট মণ্ডলীর ইতিহাস একটি গুরুত্বপূর্ণ বই।

জ্ঞানতাপস মণীন্দ্রনাথ মারাক

 

আরো লেখা

গারো অঞ্চলে খ্রিষ্ট ধর্মের আগমন  ।।  শেষ পর্ব ।। মণীন্দ্রনাথ মারাক

সংস্কৃতি সংরক্ষণে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট জানার প্রয়োজনীয়তা  ।। পর্ব-১ ।। মণীন্দ্রনাথ মারাক

সংস্কৃতি সংরক্ষণে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট জানার প্রয়োজনীয়তা ।। পর্ব-৩ ।। মণীন্দ্রনাথ মারাক

সংস্কৃতি সংরক্ষণে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট জানার প্রয়োজনীয়তা  ।। পর্ব- ৪।। মণীন্দ্রনাথ মারাক




সম্পাদক : মিঠুন রাকসাম

উপদেষ্টা : মতেন্দ্র মানখিন, থিওফিল নকরেক

যোগাযোগ:  ১৯ মণিপুরিপাড়া, সংসদ এভিনিউ ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৫। 01787161281, 01575090829

thokbirim281@gmail.com

 

থকবিরিমে প্রকাশিত কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। Copyright 2020 © Thokbirim.com.

Design by Raytahost