Thokbirim | logo

২০শে ফাল্গুন, ১৪৩০ বঙ্গাব্দ | ৪ঠা মার্চ, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

পালাগান সেরেজিং ।। পর্ব-৬।।মতেন্দ্র মানখিন

প্রকাশিত : আগস্ট ০৮, ২০২০, ১৭:০৩

পালাগান সেরেজিং ।। পর্ব-৬।।মতেন্দ্র মানখিন

পূর্ব প্রকাশের পর…

পরদিন সকালে নোরেং মাসি সেরেনজিংকে ডেকে বলে,

– তোমার আর জঙ্গলে খড়ি সংগ্রহ করার কাজে যেতে হবে না। এখন থেকে ঘরের কাজ করতে হবে তোমাকে।

সেরেনজিং এর কোনো অর্থ বুঝতে পারলোনা। দুপুরে নদীতে স্নান করতে গেলে ছোট বোন সেরানী সব কথাই বললো দিদিকে। সেরেনজিং সে খবর শুনে সেদিন আর আনন্দে স্নানই করতে পারলো না। আজ নদীর জল খুব জ্বালাদিচ্ছে তাকে।

ওয়ালজান সেরেনজিংয়ের কাছে তার মনের কথাটি বলবার আর কোনো সুযোগই পাচ্ছেনা। তাকে এমন সব কাজ দেয়া হয় যে কাজে কখনো সেরেনজিংকে সাথে পাওয়ার কথা নয়। বেশ কয়েকদিন হয় সেরনেজিং এর সাথে তার দেখা নাই। সেদিন ওয়ালজান দুপুরে মাঠে  গরু ছেড়ে দিয়ে নদীতে গিয়েছিল জলপান করতে। কাছের স্রোতে সোমেশ্বরীর ঘোলাজল দেখে তার মনে সন্দেহ হল। বোধহয় উজানে সেরেনজিং স্নান করছে। ওয়ালজাম হাঁটতে শুরু করে নদীর পার ঘেঁষে। কিছুকক্ষণ হাটাঁর পর নদীর ঘাটে সেরেনজিং ও সেরানীকে দেখতে পেলো ওয়ালজাম। ওয়ালজামকে দেখেই সেরানী ছুটে আসে কাছে।

দাদা তুমি এ পথে আর পা বাড়িও না। বাঘের সাথে লড়াই করেছিলাম মনে পড়ে? যাকগে সে কথা। নদীর ভাটি স্রোতে ঘোলাতে জল দেখে বুঝতে পেরেছি তোমরা স্নান করছো। সেজন্যেই আসলাম। ততক্ষণে সেরেনজিং কান্নায় ভেঙে পড়েছিল। সে ওয়ালজানের কাছে এসে হাত জোড় করে বললো।

– তোমাকে ওরা মেরে ফেলবে। দোহাই তোমার এক্ষুণি তোমার কাজে যাও। তোমাকে ওরা মারলে আমি তা সহ্য করতে পারব না। আমি আত্ম হত্যা করব।

-আমি চলে যাচ্ছি সেরেনজিং। তবে শুধু একটি কথার জবাব দাও। তুম কি আজ পর্যন্ত আমার হবে?

– ও কথা বলে আমাকে আর কষ্ট দিওনা সালজং (সূর্যদেবতা) দেবতার দোহাই দিয়ে বলছি আমি তোমার।

“সংনি নকনি খা.সাখো ওয়াত্তি রিগ্নক গিপ্পিনছি

রোগেন আনচিং ফাংছিনান সংনক রি.ক্কে বুরুংছি।”

বাংলা

“ঘর সংসারের মায়া ছেড়ে চলো যাই দেশান্তরে

বন-জঙ্গলে ঘর বেঁধে থাকবো মোরা জনম ভরে।”

ওরা দুজনে পা বাড়ায় অচেনা অজানা পথে। সেরেনজিংয়ের ঘরে ফিরতে বিলম্ব দেখে তার মাসির সন্দেহ জাগল। সাথে  সাথে এ বাড়ি ও বাড়ি সবাইকে ডেকে আলাপ আলোচনা করে সেরেনজিং এর খোঁেজ বেড় হয়ে পড়ল সিমরেং (মেসো)। সাংওয়ান ও মাংওয়ান (মামারা) বিভিন্ন দিকে ছূটে চললো তারা তখনো সেরেনজিংকে নিয়ে ওয়ালজাম খুব বেশি দূরে অগ্রসর হতে পারেনি। নদী পথ ছেড়ে কাছের পাহাড়ি পথে পালাছিল ওরা। আকাশে তখন চাঁদ ওঠেছে। চাঁদের আলোতে পথ দেখে চলছিল ওয়ালজাম আর সেরেনজিং। পেছনে লোকজনের হাক ডাক শুনে থমকে দাড়ায় দুজনে। অনুস্মরণ কারীদের গলার আওয়াজ চেনা লাগছে। সেরেনজিং ওয়ালজামকে অস্ফুট স্বরে বলে।

-খালু আর মামাদের গলার আওয়াজ এটা।

বিপদের কথা ভেবে দুজন দ্রুত পাশের ঝোপটায় লুকিয়ে পড়লো। সিমরেং সাংওয়ান এখানে এসে বিড়ি ধরালো। কাছেই গাছের পাতার খচখচ শব্দে কিছুটা ভয় পেলো ওরা। বন্য জন্তুর ভয়ে একটা গাছে চরে চুপকরে বসে রইল তারা। এমনি করে কিছুক্ষণ হেটে যাবার পর লোক জনের কোনো সাড়া শব্দ না পেয়ে ওয়ালজান সেরেনজিং ভাবল এখন যাওয়া যায়। আবার ঝোপ থেকে বের হয়ে পথে নামলো তারা। কাছেই আবার পাতার খচ খচ শব্দে সিমরেং ও তার সাথীর টনক নড়লো। গাছের উপর থেকে তারা সস্পট দেখতে পেল দুজন লোক। সিমরেং মাংয়ানকে কানে কানে বললো

-এইতো ওরাই পালাচ্ছে। সন্তর্পণে গাছ থেকে নেমে ওরা সেরেনজিং ও ওয়ালজামের পেছনে ধাওয়া করলো। অল্পক্ষণের মধ্যে ওরা তাদের হাতের মুঠোয় এসে গেলো। দুই দলে মারামারি, ধরাধরি হল কতক্ষণ। ওয়ালজানকে পরাজিত করে যখন সিমরেং ও মাংওয়ান বর্শা দিয়ে আঘাত করতে উদ্যত হল তখন সেরেনজিং ওয়ালজানের প্রাণ ভিক্ষা চাইলো মেসো ও মামার কাছে। অত পর ওয়ালজামকে তারা বললো,

– তোমার প্রাণে বধ করলাম না। তবে এখন থেকে তুমি আর এ অঞ্চলে থাকতে পারবে না। যদি কোনদিন এমন কাজ কর তাহলে তোমাকে আর ক্ষমা করা হবে না।

চলবে…

পূর্বে প্রকাশিত পর্বগুলো:

পালাগান সেরেজিং ।। পর্ব-৫।।মতেন্দ্র মানখিন

পালাগান সেরেজিং ।। পর্ব-৪ ।।মতেন্দ্র মানখিন

পালাগান সেরেজিং ।। পর্ব-৩।।মতেন্দ্র মানখিন

পালাগান সেরেজিং ।। পর্ব-২।।মতেন্দ্র মানখিন

 

 




সম্পাদক : মিঠুন রাকসাম

উপদেষ্টা : মতেন্দ্র মানখিন, থিওফিল নকরেক

যোগাযোগ:  ১৯ মণিপুরিপাড়া, সংসদ এভিনিউ ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৫। 01787161281, 01575090829

thokbirim281@gmail.com

 

থকবিরিমে প্রকাশিত কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। Copyright 2020 © Thokbirim.com.

Design by Raytahost