Thokbirim | logo

৮ই ফাল্গুন, ১৪৩০ বঙ্গাব্দ | ২১শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

পালাগান সেরেজিং ।। পর্ব-১।। মতেন্দ্র মানখিন

প্রকাশিত : জুলাই ৩০, ২০২০, ০৯:১০

পালাগান সেরেজিং ।। পর্ব-১।। মতেন্দ্র মানখিন

ময়মনসিংহের গীতিকার মহুয়া মলুয়া চন্দ্রাবতী প্রভৃতি লোক গাঁথা যুগ যুগ ধরে লোক সংস্কৃতির অঙ্গনে সুপরিচিত। এছাড়াও আমাদের দেশে সামাজিক, রাজনৈতিক পৌরাণিক কাহিনি নিয়ে পালাগানের অভাব নেই। বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভের আগেও আমাদের আশ-পাশ এলাকায় নানাযাত্রা গানের পালা ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল। গারোভাষা কৃষ্টি সংস্কৃতির অভিনব বুননের এ রকম একটি পালা গানের কথা সেই ছোট বেলা থেকেই শুনে আসছি যার নাম সেরেনজিং।

মূলত সেরেনজিংয়ের মূল উৎস গারো পাহাড় অঞ্চলে। এক কালে গারোপাহাড় পাদদেশ এলাকায় পালাগান হত। ক্রমে এর জনপ্রিয়তা বাড়ে এবং ময়মনসিংহ জেলার দূর্গাপুর কলমাকান্দা, ধোবাউড়া, এবং হালুয়াঘাট থানা সমূহের পাহাড় সংলগ্ন সমতল ভূমি অঞ্চলে এ পালাগান ছড়িয়ে পড়ে।

১৯৭৩সালে মার্চ মাসে সেরেজিং পালা আমি প্রথম দেখেছি চাম্বিল গিরিতে। দলটি এসেছিল কনচিখল আখল স্থান থেকে। এর পর দেখেছি নিজ এলাকা ভূইয়াপাড়ার সেরেজিং  পালা ১৯৮৭ সালের ডিসেম্বরের ২৭ তারিখ ভালুকাপাড়া মিশনে ফা. মনীন্দ্র চিরানের যাজক বরণ অনুষ্ঠান, উপলক্ষ্যে। আর তৃতীয়বার দেখি ২০১০ সালে রাণীখং শতবর্ষ জুবিলী উপলক্ষ্যে। কয়েক বার দেখার পর বুঝতে চেষ্টা করেছি ভাবতে চেষ্ট করেছি। সেরেজিংয়ের এর কাহিনি দেখে ও শুনে মনে হয়েছে। আমাদের অতি পরিচিত ঘরের কথা, সমাজ সংসারের কথা। আমাদের সমাজ সাংসার সংস্কৃতির পরিচিত বাস্তব রূপই ফুটে উঠেছে সেরেজিং পালায়।

মাতৃহারা পিতৃহারা ওয়ালজান সেরেজিং এর জীবনে এসেছে অনেক দুখঃ কষ্ট, বেদনা প্রেম বিরহ বিচ্ছেদ এসেছে পরকীয়ার হাতছানি। এসেছে সেরেজিংয়ের জীবনে শেষ পর্যন্ত চরম দূর্দ্দশা যার জন্য সতী সাবিত্রী সীতার মত সেও অগ্নিপরীক্ষার মুখোমুখী হয়েছেন। এসব মর্মস্পর্শী বিষয়গুলো শুধু গারো পাহাড় অঞ্চলেই নয় এর আবহ বাংলাদেশের সমতল ভূমির মাটি ও মানুষের হৃদয় মনকেও স্পর্শ করে নাড়া দেয়। সুখ-দুঃখ আনন্দ বেদনা, প্রেম বিরহ বিচ্ছেদের অনুভূতি গারো পাহাড়ে যেমন বাংলাদেশের মাটিতেও একই। তাই যতবার সেরেজিং পালা দেখেছি ততবারই নিজেদের সমাজের চিত্রকল্প ফুটে উঠতে দেখেছি। নিজেদের সমাজ সংস্কৃতির সাথেই মুখোমুখী হয়েছি।

সেরেজিংয়ের প্রথম আবহেই রয়েছে বন্দনা গীত। এরকম বন্দনা গীত সাধারনত বাংলাদেশের লোকগীতি লোকনাট্য পালায় দেখতে পাওয়া যায়। এরকম বন্দনাগীত মানুষকে আকর্ষণ করে স্পর্শ কাতর করে। যেমন-

“সালাম চিং মা-ফারাং ফিলাক রিপ্পেংরাং

ইন্দিবা রাম রাম তামাসা নিফালসান।

অংজা চিংয়ি দাকারাং চুসকজা.চিং কামরাং

 ইন্দিবা রাম রাম তামাসা নিফালসান।

গানদিং চিনদিং দংজা চিংআ

দাকমেশকনা চাংজা চিংআ

ইন্দিবা রাম রাম তামাসা নিফালসান।”

বাংলা:

“সালাম মোদের পিতা মাতা যত জ্ঞানীগুণিজন

আমরা অতি দীন হীন অতি অভাজন

বিদ্যা বুদ্ধি নেইকো মোদের অতি সাধারণ

শুধু করতে চেয়েছি মোরা ক্ষুদ্র আয়োজন

সাজ সজ্জা নেইকো মোদের

মোদের আছে অনটন

শুধু আছে দেয়ার মত

মোদের ভালবাসার মন।”

সেরেনজিং পালাগানের কাহিনি সংক্ষেপে বলতে প্রথমে গারোদের পূর্ব ইতিহাস ঐতিহ্যের প্রসঙ্গই এসে পড়ে। চীন তীব্বত থেকে একটি আদিবাসী দল এদেশে খাসিয়া, জৈয়িন্তা ও গারো পাহাড়ে এসে ছত্রভঙ্গ হয়ে বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে। এই সেরেনজিং-এর পালাগানের নায়িকা সেরেনজিং এর মা-বাবা খাসিয়া পাহাড়ের মিগাম এলাকায় বসতি স্থাপন করে। সেরেনজিং এর বাবার নাম সলনারাং আর মায়ের নাম চিনারাং।

সময়ের বিবর্তনে দিন যায়, মাস যায়, যায় বছর। সালনারাং চিনারাং-এর ঘরে একে একে জন্ম নেয় দুটি মেয়ে সন্তান। স্বামী স্ত্রী আদর করে তাদের নাম রেখেছে বড়টি সেরেনজিং ও ছোটটির নাম সেরানী। দিনে দিনে এরা বড় হয়ে ওঠে। ফুট ফুটে সুন্দর চেহারা। পাহাড় জঙ্গলে ঘুরে বেড়ায় ছুটে বেড়ায় দুবোন সেরেনজিং ও সেরানী। এ সুন্দর ছোট সুখি পরিবারে একদিন দুঃখের কালো ছায়া নেমে আসে। অকালে মারা যায় সেরেনজিং এর বাবা সালনারাং। বিধবা মা চিনারাং দু মেয়েকে নিয়ে ঘোর বিপদে পড়ে। তার আত্মীয় স্বজন যারা আছে তারা কেউ ধারে কাছে নেই। নানা চিন্তা ও দুঃখ কষ্টে সেরেনজিং এর মা চিনরাং দূর্বল হয়ে পড়ে এবং ক্রমে রোগে শোকে ভোগে একদিন মৃত্যুবরণ করে। সেরেনজিং আর সেরানীর দুঃখের সীমা আর রইল না। সেরানজিং মৃত মাকে জড়িয়ে বুক ফাঁটা কান্নায় ভেঙে পড়ে।

 “না-আদে আমাদে চিংখো দন.নি সিয়াংজক

 চিখোরা.না রেয়াংওন খুরাং খিন্নারিক জাজক আইয়াও”

বাংলা

পানি আনতে যাবার সময় মা তুমি গেলা চইলা

শুনতে নাই পেলাম মাগো কী কথা কয়ে গেলা হায় হায়”

মৃত মাকে নিয়ে ভীষণ বিপদে পড়ে সেরেনজিং আর সেরানী। এই পাহাড় জঙ্গল অঞ্চলে তারা কোথায় যাবে? কে দেবে তাদের আশ্রয় কে করবে লালন পালন?  ভয়ে দুঃশ্চিন্তায় সেরেনজিং ছোট বোনকে ধরে বিলাপ করতে থাকে। এমন সময় ঐ পথ দিয়ে ২/৩ জন লোক যাচ্ছিল। পাহাড় জঙ্গলের মধ্যে নারী কণ্ঠের বিলাপ শুনে তারা সেরেনজিং ও সেরানীর বাড়িতে চলে আসে। সেরেনজিং সেরেনীর এ অবস্থান দেখে তাদের ভীষণ মায়া লাগে। তখন সেরেনজিং এর বয়স দশ আর সেরেনীর বয়স ৮ বৎসর তারা সেরেনজিংকে প্রশ্ন করে তোমাদের কি কোনো আত্মীয় স্বজন নেই? সেরেনজিং কেঁদে কেঁদে উত্তর দেয়,

“ আওয়াং মাংদে দংফারা বালশ্রী গিত্তিম সংওনা

আওয়াং মাংনি বিমুংখো সিমরেং আরও নোরেংনা।”

বাংলা :

জ্ঞাতি কুটুম আছে তবে সেই বালশ্রি গিত্তিম গ্রাম

মাসি মেসো হয় যে তারা নোরেং সিমরেং নাম।”

সেরেজিং আগন্তুকদের বলে- দেখুন আমরা খুব দুঃখি এ অবস্থায় এখন আমরা কী কবর, কোথায় যাবো জানি না। দয়া করে আমাদের মেসো ও মাসিকে খবর দিলে খুব উপকার হয়।

আগন্তুকরা সমবেদনা জানিয়ে বলে, ঠিক আছে মা তোমরা কোনো চিন্তা কর না। আমরা গ্রামে পৌছে খবর দেবো। আমরা অবশ্য তাদের নিয়ে আসব। এ ঘোর বিপদের দিনে সেরেনজিং সেরেনীর কাছে একজন আগন্তুক থেকে গেল। আর বাকি দুজন বালশ্রীগিত্তিম গ্রামের উদ্দেশ্যে পা বাড়াল।

কভার প্রচ্ছদ তিতাস চাকমা।

চলবে…




সম্পাদক : মিঠুন রাকসাম

উপদেষ্টা : মতেন্দ্র মানখিন, থিওফিল নকরেক

যোগাযোগ:  ১৯ মণিপুরিপাড়া, সংসদ এভিনিউ ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৫। 01787161281, 01575090829

thokbirim281@gmail.com

 

থকবিরিমে প্রকাশিত কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। Copyright 2020 © Thokbirim.com.

Design by Raytahost