Thokbirim | logo

৬ই আষাঢ়, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ | ২০শে জুন, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

নরেশ মৃ ।। সাংসারেক খামাল

প্রকাশিত : জুলাই ২৮, ২০২০, ১৩:৩০

নরেশ মৃ ।। সাংসারেক খামাল

গারো সম্প্রদায়ের আদি ধর্ম সাংসারেক-এর পুরোহিতকে বলা হয় খামাল। যাকে বাংলাতে পুরোহিত হিসেবে ভাষান্তর করা হয়। খামাল সাংসারেক ধর্মের সকল আমুয়া- খৃতা- (পূজা-অর্চনা) পরিচালনা করে থাকেন। এককথায় খামালক সাংসারেক ধর্মের ধর্মীয় গুরু।

গারো সম্প্রদায়ের পণ্ডিতজন  মণীন্দ্রনাথ মারাক তাঁর ‘সাংসারেক রীতিতে খামাল সংআ’ প্রবন্ধে সাংসারেক বা সংসারেক বিষয়ে লিখেছেন-‘বর্তমানে এ আদিধর্মের নাম ‘সাংসারেক’ সংক্ষেপে ‘সাংস্রেকে’। ভারতে বলা হয় ‘সংসারেক’। আমার মনে হয়, ্ এ নামে গারো অঞ্চলে খ্রিষ্ট ধর্মের আগমন ও গারোদের খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণের সঙ্গে চালু হয়েছে। এ ‘সাংসারেক’ বা ‘সংসারেক’ নামে বিদেশি খ্রিষ্টান মিশনারিদের দেশীয় প্রচারকর্মী বাঙালি ও আসমিস খ্রিষ্টান ধর্ম প্রচারকগণ তুচ্ছার্থে দিয়েছেন। সংসার থেকে সাংসারেক, যার অর্থ সংসার সম্বন্ধীয় বুঝায়। আর এ অর্থেই সাংসারেক বা সংসারেক ধর্ম মানে জাগতিক বা পার্থিব ধর্ম বুঝায়। তাঁরা এ অর্থেই হয়তো গারোদের ধর্মকে সাংসারেক বা সংসারেক আখ্যা দিয়েছেন। কারণ সাংসারেক বা সাংসারেক গারো ভাষার শব্দ নয়, এটা বাংলা ভাষার ‘সংসার’ বা সাংসারিক শব্দ থেকে উদ্ভত শব্দ’।

খামাল খুব গুরুত্বপূর্ণ অংশ সাংসারেক ধর্মে। কারণ খামাল ছাড়া কোনো শুভ কাজ কিংবা যে কোনো অনুষ্ঠান শুরু করা প্রায় অসম্ভব। সাংসারেক রীতিতে মানুষের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত যে আচার-রীতি জড়িয়ে আছে সেটি সম্পন্ন করেন একমাত্র খামাল।

তবে বংশানুক্রমিকভাবে কিংবা উত্তরাধিকারী সূত্রে খামাল হতে হবে এমন নিয়ম নেই।খামাল সংআ নিয়ে মণীন্দ্রনাথ মারাক তাঁর ‘সাংসারেক রীতিতে খামাল সংআ’ প্রবন্ধে খামাল সম্পর্কে লিখেছেন- ‘গারোদের মধ্যে কোনো গোষ্ঠী, গোত্র, বংশ, পরিবার কেন্দ্রিক খামাল (যাজক বা পুরোহিত) শ্রেণি নেই। গারো সমাজে বংশানুক্রমিকভাবে উত্তরাধিকারী সূত্রে কেউ খামাল হন না। যে কেউ খামাল হতে চাইলে তাঁকে দক্ষ খামালের সঙ্গে সঙ্গে থেকে দেবদেবীদের সম্বন্ধে তাঁদের পূজা-অর্চনা সর্ম্পকে জেনে নিতে হয়, শিখে নিতে হয়। তাঁকে শিক্ষানবীশ হয়ে পূজা-অর্চনার বেদী তৈরি, মন্ত্র, নিয়ম-রীতি, আচর অনুষ্ঠান, রোগ-ব্যাধির লক্ষণ দেখে রুষ্ট দেবদেবীর সংশ্লিষ্টতা নির্ণয়ের উপায় (Divination)  দেখে প্রতিকারের উপায় শিখে নিতে হয়, জেনে নিতে হয়। বড় বড় দেবদেবীর পূজা-অর্চনায় তাঁকে খামালের সহকারী (রাবগিপা) হিসাবে কাজ করতে হয়। এভাবে ধীরে ধীরে দেখে, শুনে, করে, শিখে খামালের গুণাবলী ও দক্ষতা অর্জন করতে হয়। নিজের ইচ্ছায় ও চেষ্টায় তা করতে হয়। অন্যান্য ধর্মে যাজক বা পুরোহিত গড়ে তোলার জন্য ধর্মতত্ত্ব স্কুল-কলেজ আছে। কিন্তু গারো সাংসারেক ধর্ম শিক্ষা ও খামাল গড়ে তোলার জন্য কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছিলো না এবং এখনো নেই। তাই আদিকাল থেকেই নিজ ইচ্ছায়, কখনো অন্যের প্রেরণায়, নিজের ব্যক্তিগত চেষ্টায়, ব্যক্তিগতভাবে খামাল হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করে এসেছেন। আর যে এ যোগ্যতা অর্জন করেন, সমাজের লোক নিজেদের পূজা-পার্বন অনুষ্ঠান সম্পাদনের প্রয়োজনের জন্য তাঁকেই খামাল মনোনীত করেন। নকমা বা সমাজপতি সমাজস্থ লোকদের একত্রে সমাবেশ করে, ভোজন পানের ব্যবস্থা করে, সবার সম্মতি নিয়ে তাঁকে খামাল নিয়োগের সিদ্ধান্ত  নেন, নিয়োগ দানের দিন তারিখ নির্ধারণ করেন। তারপর সবাই মিলে নিয়োগ দানের অর্থাৎ খামাল অভিষেক ও বরণের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। আর নির্ধারিত দিন উপস্থিত হলে তাঁকে স্নান করে নকমার পরিচালনায় তাঁকে খামাল পদে অভিষেক করে, বরণ করে নেওয়া হয়। এরপর ভোজন-পান, ও আমোদ-প্রমোদ করে দিন শেষে তাঁকে মদ ও খাদ্যদ্রব্যসহ সম্মান সহকারে বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে আসা হয়।’

বর্তমানে বাংলাদেশে হাতেগোনা মাত্র কয়েকজন খামাল জীবিত আছেন। যেমন- খামাল জনিক নকরেক, দীনেশ নকরেক, উপেন্দ্র চিসিম,  নরেশ মৃ, টুইক্কা খামাল প্রমুখ।

খামাল নরেশ মৃ বর্তমানে মধুপুর থানার সাইনামারী গ্রামে বসবাস করছেন। জানা গেছে-উনার শরীর তেমন ভালো নেই। করোনায় তিনিও কাবু হয়ে আছেন। আর্থিক সমস্যায় করোনার মতো মহামারীতে সাংসারেক রীতিতে যে আমুয়া ( পূজা) করতে হয় সেই আমুয়া করতে পারছেন না। তবে তাঁর বিশ্বাস নকগুবা ঠিকই করোনা জয়ের একটা উপায় করে দিবেন।

চলবে…

খামালের ছবি : থকবিরিম অ্যালবাম।

সূত্র :

সাংসারেক রীতিতে খামাল সংআ-মণীন্দ্রনাথ মারাক

বাংলাদেশের গারো সম্প্রদায়- সুভাষ জেংচাম

গারোদের লোকায়ত জীবন ধারা- মতেন্দ্র মানখিন

।। মিঠুন রাকসাম




সম্পাদক : মিঠুন রাকসাম

উপদেষ্টা : মতেন্দ্র মানখিন, থিওফিল নকরেক

যোগাযোগ:  ১৯ মণিপুরিপাড়া, সংসদ এভিনিউ ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৫। 01787161281, 01575090829

thokbirim281@gmail.com

 

থকবিরিমে প্রকাশিত কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। Copyright 2020 © Thokbirim.com.

Design by Raytahost