Thokbirim | logo

৮ই বৈশাখ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ | ২১শে এপ্রিল, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

গারো অঞ্চলে খ্রিষ্ট ধর্মের আগমন  ।। পর্ব-২।। মণীন্দ্রনাথ মারাক

প্রকাশিত : জুলাই ২৭, ২০২০, ১১:০৫

গারো অঞ্চলে খ্রিষ্ট ধর্মের আগমন  ।। পর্ব-২।। মণীন্দ্রনাথ মারাক

রেভা. মণীন্দ্রনাথ মারাক গারোজাতিসত্তার একজন পণ্ডিতজন এবং সমাজ চিন্তক। তিনি পুরো জীবনটাই লেখালেখি আর সমাজ ভাবনায় ব্যয় করে যাচ্ছেন। বর্তমানে উনার বয়স প্রায় ৮৫ বছর। রেভা. মণীন্দ্রনাথ মারাকের  ‘ গারো অঞ্চলে খ্রিষ্ট ধর্মের আগমন ’ লেখাটি থকবিরিম পাঠকদের জন্য  লেখকের প্রকাশিতব্য ‘প্রবন্ধ সংগ্রহ’ গ্রন্থ থেকে ধারাবাহিক প্রকাশ করা হচ্ছে। ‘গারো অঞ্চলে খ্রিষ্ট ধর্মের আগমন’ লেখাটির আজ পর্ব-২ প্রকাশ করা হলো-সম্পাদক।

লেখক মণীন্দ্রনাথ মারাক

গারোদের আদি ধর্মকে Animism সর্বপ্রাণবাদ ও Polytheism বহু দেবদেবীবাদ বা বহু ঈশ্বরবাদ বলা হয়। সর্বপ্রাণবাদ হলো সব জড় ও প্রাকৃতিক পদার্থ বা আত্মার আরোপ করা। বহুদেবদেবীবাদ হলো বহু দেবদেবীতে (Deity) বিশ্বাস করা। প্রাচীন গ্রীক, রোমান, পার্শিক, মিশরীয়, চীনা প্রভৃতি জাতিরাও বহুদেবদেবীতে বিশ্বাস করতো। এদেশের লেখকগণ গারোদের জড়োপাসক ও প্রেতোপাসক বলে উল্লেখ করেছেন। এটা সর্বাংশে সত্য নয়।

তারা নানা পদার্থে প্রাণের বা আত্মার আরোপ করলেও তাদের সৃষ্টি কর্তা, জগতের মালিক বা প্রভু বলে বিশ্বাস করতো না। এগুলোকে কোনো কোনোটা মানব হিতৈশী আত্মা- Benevolent spirits এবং কোনোটা কোনোটা ঈর্ষা পরায়ণ আত্মা Malevolent spirit বলে মানতো ও অবস্থা বা ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে পশু-পাখি বলি দিয়ে, ভোগ দিয়ে তাদের খুশি করতো, ক্রোধ ও ঈর্ষা প্রশমিত করতো। তাদের  Deity দেবতা বা ঈশ্বর বলে মানতো না।

তাদের প্রধান দেবতা –সৃষ্টি কর্তা, জগতের মালিক বা প্রভু-ঝঁঢ়ৎবসব নবরহম হলেন-পান্ডুরা, তাতারা রাবুগা, দাকগিপা, নকগিপা, বাব্রা প্রভৃতি শতাধিক নামে তাঁকে বিশ্বাস করতো। গারোরা নাস্তিক ছিলো না, আস্তিক ছিলো। তারা আত্মার অবিনাশিতায় ও জন্মান্তরবাদে বিশ্বাস করতো। কিন্তু তাদের ধর্ম শিক্ষার প্রতিষ্ঠান ও ধর্ম শিক্ষার ব্যবস্থা না থাকায়, আনুষ্ঠানিকভাবে ধর্ম শিক্ষাদানের অভাবে ধর্মীয় দর্শন উন্নত হয়ে উঠতে পারে নাই। এতদসঙ্গে প্রাসঙ্গিকভাবে বলতে চাই-প্রাচীন কামরূপী তান্ত্রিক ধর্মও তাদের অল্পবিস্তর প্রভাবিত করেছিলো।

কামরূপ যাদুর (magic)জন্যে বিখ্যাত ছিলো। অনেক গারো যাদু বিদ্যা জানত। মন্ত্রতন্ত্র ও সাধন বলে অনেক কিছু ভাল-মন্দ (white black magic) করতে পারতো, হতে পারতো। এখন অতীতের বিষয়। গারোদের আদি ধর্মের নাম কি? তারা তাদের ধর্মকে কি বলতো জানি না। ‘সাংসারেক’ নামটা খুব সম্ভব সাম্প্রতিক কালের। খুব সম্ভব খ্রিষ্টান প্রচারকগণই এই নামটি দিয়ে থাকতে পারেন।

সংসার থেকে সংসারিক (সংসার সন্বন্ধীয়) শব্দ থেকে গারোদের ধর্মকে জাগতিক বা পার্থিব ধর্ম বোঝাতে তাঁরাই দিয়ে থাকেতে পারেন। তাই বোধ হয় এখন গারো সাংসারেক, সংক্ষেপে সাংস্রেক বলে থাকে। ভারতের গারোরা বলে সংসারেক ধর্ম। যাই হোক, গারো ধর্ম সম্বন্ধে লিখা আমার উদ্দেশ্য নয়। আমি ধর্ম সম্বন্ধে কিছু উল্লেখ ও মন্তব্য করলাম মাত্র।

আগেই বলেছি Captain David scott সরকারের কাছে গারোদের জন্য খ্রিষ্টান মিশনারি পাবার জন্যে মিশনারিদের সঙ্গে যোগাযোগ করার জন্য যেন অনুমতি দেয়া হয়। সরকার জানতো গারোরা শান্তি প্রিয় নয়। তারা আন্তঃ গোষ্ঠী, আন্তঃ গ্রাম বা আন্তঃ আ‘খিং (রাজ্য) প্রায়ই আক্রমণ ও প্রতি আক্রমণ করতো।

জমিদারদের গারোদের রাজ্য দখলের চেষ্টা, ব্রিটিশ টেরিটরির সীমান্তের বাজারগুলোর পথের উপর কর দেওয়া বাজারে তোলা নেওয়া, বাজারে আসতে না দেওয়া, ব্যবসায়ী প্রতারনা প্রভৃতি কারণে গারোরা ব্রিটিশ রাজ্যের গ্রামগুলোতে আক্রমণ চালাতো, বাড়ি ঘর পুড়ে দিতো, মানুষের মাথা কেটে নিয়ে যেতো। সরকার এসবে উদ্বিগ্ন হয়ে যেতো। গারোদের বলতো, এরা Rude, savage, bloodthirsty I War-like peoples     তাই এদের শেষ করে দেয়া উচিত। Rev. C. D. Baldwin তাঁর God and the Garos – পুস্তকে ২৩ পৃষ্ঠায় গোয়ালপাড়া গারো মিশনের মিশনারি (আমেরিকান) Rev. T.J. Keith এর লেখা How came the Bible into the Garo Language পুস্তকের ৯ পৃষ্ঠা থেকে কিছু অংশ উদ্ধৃতি দিয়ে বঙ্গ দেশের লাটের কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি লিখেছেন- A former lieutenant governor writes ÒThey (the Garos) are a bloodthirsty set of savages, and deserve extermination. In his day they were broken up into Unfriendly plans among themselves, standing out obstinate and defiant.Ó It looked for a while as if the government would exterminate them for several expeditions were made.

এই অশান্ত, যুদ্ধবাজ, রক্ত পিপাসু গারোদের খ্রিষ্টান করা ও শিক্ষার জন্যেই Captain David Scott  গর্ভনমেন্টের সেক্রেটারীর নিব খ্রিষ্টান মিশনারি আনার জন্যে ২৭শে এপ্রিল, ১৯২৫ খ্রিষ্টাব্দে পত্র লিখেন। উক্ত পত্রের কিছু কিছু অংশ নিম্নে দেওয়া হলো-‘I am satisfied that nothing permanently good can be obtained, by other means, that if we is not interfere on behalf of the poor Garos they will soon become Hindoos of half Hindoos, retaining and acquiring many of the bad par of their present and improved creeds. I would greatly prefer two or more Moravian missionaries of the of School who along with religion would teach useful arts…….. I would willingly take upon myself the expense in the first instance and £ 300 per annuam would suffice.’ সেক্রেটারি Mr. W. H. Bayley এই পত্র পেয়ে খুশি হন এবং তিনি লিখেন,‘I do not think the favorable opportunity for making this very interesting experiment soul be lost.’ তিনি ক্যাপ্টেন ডেভিড স্কটের পত্র সুপারিশসহ কলকাতার বিশপ রেজিনাল্ড হেযারের নিকট প্রেরণ করেন।

তিনিও সুপরিশসহ নভেম্বর মাসে উত্তর দেন। ঐ পত্র মেষ্ট সেক্রেটারি ক্যাপ্টেন ডেভিড স্কটকে পাঠান। এভাবে বেশ ক’একবার যোগযোগা হয়। এস যোগাযোগ পত্র নিয়ে ১২ই অক্টোবর ১৮২৬ ফোর্ট উইলিয়াম কাউন্সিল চেম্বারে মিটিং বসে। সভা পরিচালনা করেন Lord Cmober Mere commander-in-chief সাভায় গারোদের জন্যে স্কুল খোলার অনুকূলে সিদ্ধান্ত হয়। এই সম্পর্কে The Garo Jungle Book-Rev. William Carey’ “এইরূপে লিখেছেন -‘It was ordered that the Secretary send a reply, which furnishes us with pleasing picture of the August council entering fully and sympathetically into the project of a little school for the project of a little school for the benefit of the wild mountaineers; and the interest is heightened when we remember that Lord Comber Mere, presiding was a soldier and Commander-in-chief, to whom the Garos might well appear a mere pestilent meet of savages to be burned or bayoneted out their retreat.’

সরকার ১৮২৬ সনেই বিশপ হেবারের পরামর্শ অনুসারে স্কুল খোলার ব্যবস্থা করেন। সরকারই শিক্ষকের বেতন দিবে সিদ্ধান্ত হয়। শিক্ষক ধর্ম শিক্ষা দিলেও তাঁকে মিশনারি হিসাবে গণ্য করা হবে না, শিক্ষক হিসাবেই বেতন দিবে। কারণ ঐ সময়ে সরকার সংখ্যা গরিষ্ঠ হিন্দু-মুসলিমদের প্রতি তোষণ নীতি অবলম্বন করতো। প্রকাশ্যে খ্রিষ্ট ধর্ম প্রচার করতে দিতো না। এই কারণেই প্রথম ব্যাপ্টিস্ট মিশন ১৮০১ সনে ব্রিটিশ টেরিটেরিতে স্থাপন না করে ডেনমার্কের অধীনস্থ শ্রীরামপুরে স্থাপিত হয়।

১৮২৬ সনেই সিঙ্গিমারিতে ৪০ জন গারো ছেলেদের জন্য স্কুল খোলা হয়। স্কুল খোলার আগেই সহৃদয় বিশপ রেজিনাল্ড হেবার মার যান। প্রথম শিক্ষক হন Mr. Valentine William Hurley কিন্তু তিনি কিছু দিনের জন্যেই ভাষাগত সমস্যায় পদত্যাগ করেন। পরে; Mr. Fermie শিক্ষক নিযুক্ত হন। তিনি মারা গেলে ১৮২৯ সনে স্কুলটি বন্ধ হয়ে যায়। এই ১৮২৯ সনেই শ্রীরামপুরের মিশনারি Mr. James Rae গৌহাটীতে গারো ও খাসিয়াদের জন্য স্কুল খুলেন। স্কুলে ৯ জন গারো ও ৩ জন খাসিয়া ছাত্র ছিলো।

কিন্তু ক’এক বছর পর অর্থাভাবে স্কুলটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। ১৯৪৭ সনে সরকার গারোদের জন্য স্কুল খুলে। এই স্কুলে প্রথম গারো খ্রিষ্টান ওমেদ ও রামথে সহ ১২ জন গারো ছাত্র ছিলো।

চলবে…

কভার ছবি : থকবিরিম গ্যালারি।

আরো লেখা

সংস্কৃতি সংরক্ষণে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট জানার প্রয়োজনীয়তা  ।। পর্ব-১ ।। মণীন্দ্রনাথ মারাক

সংস্কৃতি সংরক্ষণে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট জানার প্রয়োজনীয়তা  ।। পর্ব-২ ।। মণীন্দ্রনাথ মারাক

গারো অঞ্চলে খ্রিষ্ট ধর্মের আগমন  ।।  শেষ পর্ব ।। মণীন্দ্রনাথ মারাক

সংস্কৃতি সংরক্ষণে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট জানার প্রয়োজনীয়তা ।। পর্ব-৩ ।। মণীন্দ্রনাথ মারাক

গারো অঞ্চলে খ্রিষ্ট ধর্মের আগমন  ।।  শেষ পর্ব ।। মণীন্দ্রনাথ মারাক




সম্পাদক : মিঠুন রাকসাম

উপদেষ্টা : মতেন্দ্র মানখিন, থিওফিল নকরেক

যোগাযোগ:  ১৯ মণিপুরিপাড়া, সংসদ এভিনিউ ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৫। 01787161281, 01575090829

thokbirim281@gmail.com

 

থকবিরিমে প্রকাশিত কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। Copyright 2020 © Thokbirim.com.

Design by Raytahost