Thokbirim | logo

২০শে ফাল্গুন, ১৪৩০ বঙ্গাব্দ | ৪ঠা মার্চ, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

পশু সত্ত্বায় রূপান্তরিত হওয়া ।। গারো লোককাহিনি

প্রকাশিত : জুলাই ২৬, ২০২০, ০৯:২১

পশু সত্ত্বায় রূপান্তরিত হওয়া ।। গারো লোককাহিনি

থকবিরিম পাঠকদের জন্য ধারাবাহিক গারো লোককাহিনি প্রকাশ করা হচ্ছে। গারো লোককাহিনি মূল ইংরেজি থেকে বাংলা ভাষান্তর করেছেন  দেবাশীষ ইম্মানূয়েল রেমা। ২০২০ সালের অমর একুশে গ্রন্থমেলায় থকবিরিম প্রকাশনী থেকে ‘গারো লোককাহিনি- ১ম খণ্ড’ নামে  বইটি প্রকাশিত হয়। বইটির  মূল লেখক দেওয়ানসিং এস রংমুথু ।

আচিকরা বিশ্বাস করে থাকে যে মানুষ সজ্ঞানে কিংবা অচেতনভাবে নিজেদেরকে বাঘ, হাতি, হরিণ, বন্য শুকর, খেঁকশিয়াল, নেকড়ে, ভালুক, উড়ন্ত কাঠবিড়ালি, ইঁদুর প্রভৃতি প্রাণিতে রূপান্তরিত করতে পারে। এর অর্থ এই নয় যে, সজ্ঞানে কিংবা অচেতন অবস্থায়, গোটা দেহের আকার বদলায়। কিন্তু সজারুর কাঁটার অগ্রভাগের ক্ষুদ্রাংশের মতো অতিক্ষুদ্র এবং বর্ণে সাদা তার জাবিরং বা জাছ্রি অর্থ্যাৎ শক্তিশালী জীবনদায়ী প্রাণসত্ত্বা বহির্গত হয়ে পশুর দেহাভ্যন্তরে স্থাপিত হয়। এটি ঘটে যখন ব্যক্তিমানুষটি ঘুমন্ত থাকে। কোন ব্যক্তির জাবিরং স্বেচ্ছায় সেই ব্যক্তির নাসারন্ধ্র (nasal passage) দিয়ে ক্ষরে পড়ে এবং শূন্যে চলাফেরা করে (বাতাসের মধ্য দিয়ে চলাফেরা করে)। তারপর স্বচ্ছন্দে কোন প্রাণিদেহে প্রবেশ করে।

এভাবে ঘুমের ভিতরে কোনো মানুষ আত্মায় একটি বাঘ বা কোন জীবন্ত প্রাণিতে রূপান্তরিত হতে পারে। জাগ্রত অবস্থায় হুবহু সেই এক ব্যক্তি সম্পূর্ণরূপে স্মরণ করতে পারে যে বাঘ কিংবা যেটির দেহে তার জাবিরং প্রবেশ করেছিলো সেই অন্য যে কোন প্রকার প্রাণি হয়ে সে যা যা করেছিলো সেভাবে সেই প্রাণিরূপে তার অতীত কর্মকাণ্ড কিংবা অভিজ্ঞতার কথা পরিস্কার বর্ণনা করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, যে ব্যক্তি আত্মায় একটি বাঘে রূপান্তরিত হয়েছিলো সে জাগ্রত অবস্থায় বাঘরূপে তার ঘুরে বেড়ানোর জায়গা, তার দেখা ব্যক্তি ও বস্তু, তার দেখা দূরবর্তী জায়গাগুলিতে যে সব ঘটনা ঘটেছিলো সেসবই অন্য লোকদের কাছে বলতে পারে। কিন্তু যেসব অভিজ্ঞতা মানুষরূপে সে লাভ করেনি।

আচিকদের মধ্যে কেউ কেউ নির্দিষ্ট ভেষজ ও মন্ত্র এবং কোন দিব্যপদ্ধতি জানে যা দ্বারা কোন ব্যক্তি ইচ্ছামতো নিজেকে বাঘ বা অন্য কোনো প্রাণিতে রূপান্তরিত করে। সেইভাবে তারা অপর পদ্ধতিগুলিও জানে যা দ্বারা মানবসত্ত্বার বাঘ বা কোন প্রাণিতে পরিণত হওয়াকে পরিত্যাগ বা দমন করতে পারে।

একবার যদি কোন মানুষের জাবিরং বা জাছ্রি নির্দিষ্ট কোনো প্রাণিদেহে প্রবেশ করে থাকে, তবে সেই জাবিরং বা জাছ্রি সবসময় মানুষটি ঘুমন্ত অবস্থায় থাকলেই সেই প্রাণীদেহে প্রবেশ করবে। জীবনভর এমনটি চলতে থাকবে যদি না বা যতোক্ষণ পর্যন্ত না সেই ব্যক্তি বা তার আত্মীয়-স্বজন অভ্যস্ত কর্ম থেকে জাবিরংকে আটকানোর জন্য কোন পদ্ধতি বা নিরাময় মন্ত্র (exorcism) অবলম্বন না করে এবং একে স্থায়ীভাবে এর আসল মানব-শরীরে রাখা না হয়।

কথিত আছে যে, প্রাচীনকালে আচিকগণ নিজেদের দেহ বাঘ কিংবা কুমির কিংবা সাপ কিংবা কোন পশু বা সরীসৃপে নিজেদের ইচ্ছামতো রূপান্তরিত করার এবং যতোক্ষণ না মানবশরীর পুণরায় পরিগ্রহ করার ইচ্ছা না করতো ততোক্ষণ সেই রূপেই থেকে যাওয়ার রহস্য-বিদ্যা জানতো। এভাবে নিজেদেরকে পশুদেহ বা সরীসৃপে রূপান্তরিত করে তারা তাদের শত্রুদের নিধন করতো।

আরও কথিত আছে যে, সেই এক আচিকরাই কোন নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে কিংবা তারা যাদের ঘৃণা করে কিংবা তাদের ব্যক্তিগত শত্রুকে যাদেরকে সরিয়ে দিতে চায় সেই সব ব্যক্তিদেরকে নিধনের জন্য আসল বাঘ, হাতি, সাপ এবং অন্যান্য বনবাসীকে নিযুক্ত করার বিদ্যা জানতো। নির্দিষ্ট মন্ত্রের সাহায্যে বন্য পশু ও ধূর্ত সরীসৃপদেরকে আহবান করা হতো এবং তাদেরকে জীবনহানির আদেশ দিয়ে পাঠানো হতো।

আচিকরা বিশ্বাস করে থাকে যে যখন কোন ব্যক্তি সর্ব শক্তিশালী মানবাত্মা বা জাবিরং বহির্গত করার এবং স্বস্থানে একে পুণরায় ফিরিয়ে নেওয়ার কিংবা তার মধুর ইচ্ছানুসারে বিশ্রাম নেওয়ার লক্ষ্যে নির্দিষ্ট অনুশীলনের মাধ্যমে দক্ষতা অর্জন করে, তখন সে প্রাণবধের সেই শক্তিকে যে কোথাও লুকিয়ে রাখতেও পারে এবং যতোদিন ইচ্ছা ততোদিন সেইস্থানে রেখে দিতে পারে। এমন লোক সজ্ঞানে তার পছন্দসই যে কোথাও, যেকোন সময়, যেকোন স্থান এবং যেকোন পন্থায় অপরের মৃত্যু সংঘটিত করতে পারে।

এখন কোন ব্যক্তি যদি বুঝে যে ঘুমের ভিতর আত্মায় সে একটি নির্দিষ্ট পশুতে রূপান্তরিত হয় এবং অন্যান্যদের কাছে সেই নির্দিষ্ট পশুরূপে তার অতীত কর্মকাণ্ড বা অভিজ্ঞতা অত্যধিক মাত্রায় বলে ফেলে তবে আত্মা মাঝেমধ্যে নিজের খেয়ালখুশীমতো বহির্গত হয়ে সেই পশুতে প্রবেশ করা থামিয়ে দেয়।

সেইমতো, যদি কোন ব্যক্তির জাবিরং কোন পশুতে স্থায়ীভাবে অভ্যন্তরে স্থাপিত হয়, আর সেই পশু সহিংস মৃত্যুবরণ করে বা তাকে মেরে ফেলা হয়, তবে যার জাবিরং এতে স্থাপিত ছিলো সেও মারা যায়। যাহোক, সে পুণরুজ্জীবিত হয়ে উঠতে পারে যদি সেই এক পশুর কিঞ্চিৎ পরিমাণ রক্ত বা বিশেষত লেজের রক্ত সঙ্গে সঙ্গে এনে লোকটিকে দেওয়া হয় যাতে তখনি পান করে। জীবিতজন বিষয়টির ওপর কোন তথ্য ছাড়াই সঠিকভাবে কোথায় এবং যে পশুতে তার জাবিরং স্থাপিত হয়েছিলো সেই নির্দিষ্ট পশু কীভাবে মৃত্যুর সম্মুখীন হয়েছিলো তা ব্যক্ত করতে পারে।

অবশেষে, বিশেষ মন্ত্র বা পদ্ধতি ব্যবহারের মধ্য দিয়ে যদি কেউ নিজেকে আত্মায় বাঘ বা পশুতে পরিণত করে, তবে তেমনটি থেকে যাবার বিদ্যা নিশ্চিত করার জন্য তাকে তার জাবিরং যে প্রাণিদেহে স্থাপিত হতে অভ্যস্ত প্রাণীটির সেই নির্দিষ্ট কুলের অধিকর্তার অধীনে পরিচালিত হওয়ার নির্দিষ্ট পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়।

এমনক্ষেত্রে নিজেকে বাঘে ও পশুতে রূপান্তরিত করা হয় স্বেচ্ছায় ও সজ্ঞানে। কোন কোন ক্ষেত্রে মানবসত্ত্বা মাঝেমধ্যে জাবিরংকে পাঠিয়ে পুণরায় স্বস্থানে আহবান করে। এসবই করা হয় বরঞ্চ অচেতন অবস্থায়। এমনক্ষেত্রে পশু হিসেবে কোন মানুষের কর্মকাণ্ড বা অভিজ্ঞতা মাঝেমধ্যে ভুলবশত স্বপ্ন হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়।

  • জাকওয়িল সাংমা স্নাল, আওয়াঙ্গা গ্রামে, ডিস্ট্রিক্ট গারো হিলস

পাদটীকা:

১. জাবিরং: আক্ষরিক অর্থে, জীবনীশক্তি, মানুষ বা প্রাণীর প্রাণবীজ।

২. জাচ্রি: আক্ষরিক অর্থে, the vital mobile, স্বতশ্চল (self-projecting – স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেহ থেকে বেরিয়ে আত্মার যাতায়াত এবং অন্যদেহে প্রবেশ যা বহুপ্রাচীনকাল থেকেই চীনারা বিশ্বাস করে থাকে), এবং স্বয়ংক্রিয় (self-active) প্রাণবীজ।

ইন্দ্রজাল ও যাদুবিদ্যায় পারদর্শী গারো বিশেষজ্ঞগণ দৃঢ়ভাবে বলেন যে জাবিরং বা জাচ্রি-কে শক্তিশালী নারসিং মন্ত্রের (Narsing Mantras/সম্ভবতঃ Narsingh বা নরসিংহ বা নৃসিংহ মন্ত্র) সাহায্যে শরীর থেকে টেনে এনে (প্রলুব্ধ/আকর্ষণ করে) কোন জীবন্ত প্রাণী যেমন ঘাসফড়িং, ছোট টিকটিকি প্রভৃতিতে প্রবেশ করানো যায় এবং চর্চাকারীর ইচ্ছানুযায়ী তন্মধ্যে যেকোন সময় ধরে দীর্ঘক্ষণ আটকে রাখা যায়। ইচ্ছানুযায়ী সেই জীবন্ত প্রাণীকে মেরে ফেলার মধ্য দিয়ে, তার মধ্যে যার আত্মা, সেই ব্যক্তিকেও বধ করা যায়।




সম্পাদক : মিঠুন রাকসাম

উপদেষ্টা : মতেন্দ্র মানখিন, থিওফিল নকরেক

যোগাযোগ:  ১৯ মণিপুরিপাড়া, সংসদ এভিনিউ ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৫। 01787161281, 01575090829

thokbirim281@gmail.com

 

থকবিরিমে প্রকাশিত কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। Copyright 2020 © Thokbirim.com.

Design by Raytahost