Thokbirim | logo

৮ই বৈশাখ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ | ২১শে এপ্রিল, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

চু ।। গারো সম্প্রদায়ের প্রধান পানীয় ।। মতেন্দ্র মানখিন

প্রকাশিত : জুলাই ২৩, ২০২০, ১৩:২৬

চু ।। গারো সম্প্রদায়ের প্রধান পানীয় ।। মতেন্দ্র মানখিন

চু

প্রচলিত চু (পচুইমদ) গারো সমাজ সংস্কৃতিতে চু বা পচুই মদের প্রভাব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ধর্মীয় সামাজিক নানা আচার অনুষ্ঠানেই চু এর ব্যবহার দেখা যায়। চু এর সাথে গারোদের জীবনের সর্ম্পক একান্ত নিবিড়। কোনো পরিবারে গারো শিশু জন্ম হওয়ার একমাস আগেই তার জন্য চু জাংগি মানে জীবন মদ প্রস্তুত করে রাখা হয়। অন্যান্য সমাজে শিশু জন্ম হওয়ার পর মধু খাওয়ানোর রীতি প্রচলিত আছে।

কিন্তু গারো সমাজে চু জাঙ্গি খাওয়ানোর রেওয়াজ প্রচলিত। তাদের বিশ্বাস এতে শিশুর পেটের ব্যাথ্যা হবে না এবং শিশু কাঁদবে না বরং ঘুমাবে। অর্থাৎ শিশুর রোগ প্রতিরোধক হিসেবে চু জাঙ্গি খাওয়ানো হয়। তাই তারা শিশু জন্ম হওয়ার পর চু জাঙ্গির রসে আঙুল ভিজিয়ে শিশুকে তা চুষতে দেয়। এভাবে জন্ম হওয়ার সাথে সাথে একজন গারো শিশু চুয়ের সাথে পরিচিতি লাভ করে।

এছাড়াও গারোদের কোন পালা পার্বন সামাজিক উৎসব, ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান, অতিথি আপ্যায়নে চু গারোদের অপরিহার্য্য। কোনো অনুষ্ঠানে ভাত মাংস খাওয়াকে তারা খুব বেশি প্রধান্য দেয় না কিন্তু যদি চু না দেয় তাহলে তারা অনুষ্ঠান কর্তাকে নানাভাবে জাচারা আগানা অর্থাৎ নানাভাবে নিন্দা প্রকাশ করে থাকে। তাই যে কোনো অনুষ্ঠানেই চু এর প্রচলন থাকেই।

আর যারা আমন্ত্রনে আসবে তারও খালি হাতে আসতে চাইবে না। এসব অনুষ্ঠানে টাকা পয়সার কোনো গুরুত্ব নেই। যদি কেউ চু আর দো (মোরগ) চাল বা ওয়াক (শূকর) ইত্যাদি নিয়ে যায়। সেটাই বেশি গুরুত্ব পাবে। গারোরা তাই প্রতিবছর ‘চু’এর জন্য প্রতিটি পরিবারে যথেষ্ট পরিমাণ ধান মওজুদ রাখে। আতপ চালের মদ উৎকৃষ্ট তবে বিনিড়ব ধানের মদ আরও উনড়বত আরও উৎকৃষ্ট।

চু বা পচুইমদ শুধুমাত্র আদিবাসী সমাজে প্রচলিত এমন নয়। অআদিবাসী সমাজে এমন কি পৃথিবীর বেশির ভাগ দেশেই মদ্যপানের প্রচলন রয়েছে। অনেক আদীবাসী সমাজে নিজেরাই চু বা মদ প্রস্তুত করে থাকে। আমাদের দেশে এই দেশি মদ বিভিনড়ব অঞ্চলে বিভিনড়ব নামে পরিচিত। প্রচলিত মদের মধ্যে পচুই মদ সব আদিবাসী অঞ্চলে পাওয়া যায়। সাধারণত চাল, গম, ভূট্টা, যব গারো আলু (থাবলচু) ইত্যাদি দিয়ে দেশি মদ তৈরি হয়।

গারো সমাজে বেশির ভাগ ভাত পচিয়েই মদ তৈরি করতে দেখা যায়। এ জাতীয় মদই গারো ভাষায় ‘চু’ নামে পরিচিত। ‘চু’ এর প্রকার ভেদ গারো আদিবাসী সমাজে সাধারণত তিন প্রকার ‘চু’ এর ব্যবহার দেখতে পাওয়া যায়। বিভিন্ন অঞ্চলে সেগুলোর ভিন্ন ভিন্ন নাম রয়েছে। তবু ‘চু’ বললে সবগুলোকেই বুঝায়।

চু এর প্রকার ভেদ

চু এর প্রকার ভেদে মোটামুটি তিন ভাগে ভাগ করা যায়। যথা- ১. হান্ডি চু – কলসী মটকার চু। ২. সো.আচু – পোড়ামদ বা পাকামদ। ৩. ফল-মূল জাতীয় চু।

১. হান্ডি চু

বিভিন্ন অঞ্চলে এটির আঞ্চলিক নাম রয়েছে। হান্ডি শব্দটি বাংলা হাঁড়ি বা মাটির কলসি শব্দের আঞ্চলিক শব্দ। আদিবাসী অঞ্চলে এই হান্ডিই কোথাও হাংগি কোথাও গড়া বিভিন্ন নামে পরিচিত। এ মদের আবার দু’টি ভাগ রয়েছে। একটি কলসির মদ অন্যটি মটকার মদ। কলসি বা তৎ সমতুল্য আকারের পাত্রে পচুই মদ তৈরি করতে আড়াই থেকে তিন/চার সের চাল এর ভাতের প্রয়োজন হয়। আর মটকায় ১০ থেকে ১৫ /২০সের চালের ভাতের প্রয়োজন হয়। কলসি মদের স্থিতিকাল ৩ থেকে ৪/৫দিন আর মটকার মদ একমাস পর্যন্ত রাখা যায়। এ মদই উৎকৃষ্ট। এ থেকেই চু বিচ্ছি রসি মদ পাওয়া যায়। এ ছাড়াও মটকায় আর এক জাতীয় মদ তৈরি হয়ে থাকে গারোরা আখাম বিচ্চি বলে। এতে আংশিক পোড়াভাত দিয়ে মিকখল/খোমি মদের ঔষধ পানিতে মিশিয়ে দিতে হয়।

চু-এর প্রস্তুত প্রণালি

মিদ্দি মান্দিনি চাসং অর্থাৎ মানুষ ও দেব-দেবীর যুগ থেকেই মদ প্রস্তুত ও মদের প্রচলন শুরু হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। কারণ মদ প্রস্তুতির মূল বিষয়টি দেব-দেবীর কাছ থেকেই পেয়ে এসেছে। মদ প্রস্তুতির যে প্রধান বস্তু তাহল মিকখল। কেউ কেউ ওয়ান্থি মিকখল বা পিতালি বলে। মিকখল তৈরি হয় আতপ চাল পরিমাণ মত বিজিয়ে তার সাথে দু একটা পাকা মরিচ দু একটা খিমখা ছোট ছোট তিতা ফল। কিছু কিছু আদার টুকরো, কিদু ঔষধি গাছের পাতা গন্ধ যুক্ত পাতা, পানেত ও তুলসি পাত দিয়ে ডেকিটে গুড়ি কাটতে হয়। ঐ চালের গুড়ি পানিতে ভিজিয়ে পুরাতন মিকখলের কিছু অংশ গারোরা বলে গায়মা মিশাতে হয়। ঐ গায়মা বা পুরাতন মিকখল কিছু মিক্সার না করলে মদ হবে না। তাই ঐ জিনিস মিশিয়ে ছোট পিতালি বানিয়ে খের বা খর বিছিয়ে নিরাপদ জায়গায় প্রায় এক সপ্তাহ রোদে শুকাতে হয়।

আতপর যে পাত্রে বা কলসিতে মদ বানানো হবে সেই পাত্র বা কলসিটিকে ভাল করে ধূয়ে মুছে দু একদিন তাপ দিতে হয়। বড় মটকা হলে আরও কয়েকদিন আগুনে তাপ দিতে হবে। এরপর ভাত ছড়িয়ে প্রথমে ঠান্ডা করতে হয়। ভাত ঠান্ডা হলে ঐ মিখল বা খামি বা পিতালী গুড়া করে ভালভাবে ভাতের সাথে মিশিয়ে কলসি বা পাত্রে ভরতে হবে। পরে কলসির মুখ কলাপাতা দিয়ে ভালভাবে বেঁধে রাখতে হবে। দু’তিন দিনের মধ্যেই ঐ মদের গন্ধ বের হবে। সাধারণত কলসির মদ ৪/৫ দিন হলেই খাওয়া যায়। আজকাল কলসির ব্যবহার নেই বলেই চলে।

এখন সব ডেকচিতে মদ বানাতে দেখি। কোনো কোনো এলাকায় বড় লাউয়ের পাত্রে মদ বানাতেও দেখা যায় এবং লাউপাত্রের মদ খুব সুস্বাদু হয়। কোনো কোনো এলাকায় কলসির মদ দু একটি বাঁশের চুঙ্গি ফিটিং করেও মদ তৈরি করে। ঐটিকে গারো ভাষায় ওয়াফেক চাটা বলে। ঐ মদ কলসিতেপানি ঢালার সাথে সাথে চুঙ্গি দিয়ে চুষে খাওয়া যায়। আর শুধু কলসি বা ডেকচির মত পানি ঢেলে নাড়াচাড়া করতে হয়। পরে মদ তৈরি হলে তা অন্য পাত্রে ঢেলে গ্লাসে গ্লাসে খাওয়া হয়।

বড় মটকার মদ বানাতেও একই পদ্ধতি অনুসরণ করতে হয়। তবে মটকার জন্য প্রয়োজন হয় ঝান্থির। ঝান্থি বেতি দিয়ে তৈরি এক ধরনের যের যার উভয় পাশই খোলা কিন্তু গোলাকৃতি লম্বায় প্রায় একফুট। ঐ ঝান্তির এক পাশ কলাপাতা দিয়ে বেঁধে মটকার মাঝখানে বসাতে হয় এবং মিকখাল মিশ্রিত ভাত ঐ ঝান্তির চারপাশে দিতে হয় খেয়াল রাখতে হবে ভাত ভরার সময় ঐ ঘেরের ভিতর যাতে না ঢোকে। এর জন্য ঝান্তির উভয় পাশের মুখ কলাপাতা বাঁধা হয়। মটকায় ভাত ভর্তি হলে মটকার মুখ কলা পাতা দিয়ে ভালভাবে বেঁধে রাখতে হয়।

চু বিচ্চি এবং খাজি

মটকার মদ সাধারণত ১৮-২০ দিনের মধ্যে খাওয়া চলে। মটকার ভিতরে যে ঝান্থি বসানো হয় তাতে ঐ ১৮-২০ দিনের মধ্যেই মদের রস জমা হয়। যাকে গারোরা চু বিচ্চি বলে, বাংলায়, বলে রসিমদ। রসিমদ খেতে খুব স্বাদ। তার রং হবে সরিষা তেলের মত। মটকার মদ প্রস্তুত করতে ফং এর প্রয়োজন হয়। ফং এক প্রকার লাউ যা নিমড়বভাগ মোটা ও অগ্রভাগ সরু। এটা পাহাড় এলাকায় পাওয়া যায়। ফং এ পানি ভরে ঝান্তির চারদিকে পানি চালতে হয় এবং ফং দিয়ে ঝান্তির ভিতর থেকে মদ বের করে আনতে হয়। মটকার মদ বিভিন্ন ধানের চালের হলে সবচেয়ে ভাল হয়। এর স্বাদ, গন্ধ ও মান যে কোন উৎকৃষ্ট মানের বিদেশি মদের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়।

অনেকেই এ জাতীয় মদ পান করে অল্পতেই নেশাগ্রস্থ হয়। মটকার রসিমদ বা চু বিচ্চি বোতলে ভরে বহুদিন রাখা যায়। মটকার রস সম্পূর্ণ তোলা হলে তার তেজ কম হয়। তবু ২৫-২০ জন লোককে আনায়াসে খাওয়ানো যায়। কলসি বা মটকার মদ শেষ হলে পানি ঢেলে পরদিন বাসি মদ বা সেগ্রা হিসেবে খাওয়া যায়। মটকায় ঝান্তি মদ তৈরিকালে অনেকেই এর ভেতরে দু’একটুকরো আখ, বা বাকলবিহীন কলা রেখে দেয়। মদের রস ঐ আখ বা কলায় সঞ্চারিত হয়। ঐ আখের টুকরো বা কলা খেলে রসের মতই নেশা ধরে। বড় মটকার মদ দীর্ঘদিন হলে ঐ মদ থেকেইে পোকার জন্ম হয়। ভয় পাবার কারণ নেই কারণ ঐ পোকা কোনো ক্ষতিকারক নয়। অনেকেই ঐ পোকা খেতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।

২. সো-আ-চু

এ মদকে পোড়ামদ, পাকামদ আবার অনেক জায়গায় চুলাই মদ বলে। এ দেশে একটিকে অনেকেই বাংলামদ বা পাট্টামদ বলে। এ দেশে মেথর মুচিরা এটিকে দারুও বলে। মোটামুটি এ মদ সব জায়গায় ক্সতরি হয় বলে এটির সাথে অনেকেরই পরিচিত। সাধারণত বাস্পের সাহায্যে এ মদ ক্সতরি হয়। এটি স্পিরিট জাতীয়। আয়ুবের্দীক শাস্ত্রীয় সুরাও নাকি অনেকটা এভাবেই ক্সতরি করা হয়। তবে বাংলা বা পোড়া মদ সুরার তুলনায় অনেক পরিমাণে কড়া এবং নি.সন্দেহে স্বাস্থের হানিকর। স্পিরিট জাতীয় এই মদ্যপানে পাকস্থলী ও ফুসফুসে আলসার কেন্সার হতে পারে। এই মদ অনেক দিন বোতলে ভরে রাখা যায়। এ মদ ক্সতরিরর জন্য প্রধানত গুড়ের প্রয়োজন হয়।

৩. আলু ও ফল-মূল জাতীয় চু

থামা-থারিং থাজং (আলু জাতীয় মূল্য) এবং থাম্লাং (মিষ্টি আলু) আর থাবলচু (শিমুল আলু) দিয়েও পচুই মদ তৈরি করা যায়। আনারস দিয়েও উনড়বতমানের মদ তৈরি করা যায়। বাংলাদেশের রাজশাহী অঞ্চলের আদিবাসীরা মহুয়া ফুল থেকে এক প্রকার মদ তৈরি করে। মদ খাওয়ার আসরে গারোরা নারী পুরুষ এক সাথে বসে খায়। মদ খাওয়াকে গারো ভাষায় চু রিংআ বলে। গারো সমাজে নারীরাই মদ তৈরি করে। মদের সাথে গারোরা ওয়াক (শূকর), গরু, ছাগল, হাঁস-মুরগির মাংস রানড়বা করে খাজি খায়। কখোনোবা ছোট মাছ বা শুকনা মাছের নাখাম খারি অথবা কুৎছিয়া, কচ্ছপ, ইত্যাদি খায়। ওয়াক মাংসের খাজি হলে লম্বা লম্বা করে মাংস কাটে, এটাকে তারা শ্রীকংকাল বলে। এছাড়াও গারোরা কাঁচা বাঁশের চে․ঙ্গায় কচি মুরগির মাংস বা মাছ, কাচা মরিচ, তেল, নুন, মসলা, দিয়ে আগুনে পুড়িয়ে খায়। এ পদ্ধতিতে তারা ব্রেংয়া বলে। এই ব্রেংয়া অত্যন্ত উপাদেয় খাদ্য।

মদ পানের নিয়ম

গারো সমাজে মদ পানের কিছু নিয়ম প্রচলিত।আগেকার আমলে মদ পানের আগে দেব-দেবীদের স্মরণে কিছু কিছু মদ মাটিতে ঢেলে দেয়া হত। বিশেষভাবে নকমিদ্দি (গৃহদেবতা) হা-মিদ্দি মাটির দেবতা। রংদিক মিদ্দি চালের দেবতা। এসব দেব-দেবীর উদ্দেশ্যে প্রথমে মদ উৎসর্গ করতে হয়। একে গারো ভাষায় রুগালা বলে। এর পরে মদ পরিবেশন করা হয়। সবচেয়ে বয়সে যে প্রবীণ তাকে আগে এর পর পর্যায়ক্রমে সবাইকে। গারো সামজে একে অপরকে মদ পান করানোর নিয়ম আছে। একজন শুধু দিতেই থাকবে আর একজন শুধু পান করতে থাকবে এটা গারো সমাজে চলে না। যে পরিবেশন করে তাকেও পান করতে হয়।

গারো সামাজে চু সংস্কৃতি একটি সম্মানের। কোনো বিশেষ অতিথি এলে বা চ্রা (মাতৃগোষ্ঠীর দাদা মামা, ভাই) এলে ঐ চু দিয়েই আপ্যায়ন করতে হয়। কোন বৈঠক শালিসি হলে বা কোন পারিবারিক সমস্যা হলেও তা আলাপ আলোচনার জন্য মদের প্রয়োজন। কারো জন্ম হলে বা কারো মৃত্যু হলে, শ্রাদ্ধভোজ বা বিবাহ হলে ঐ চু বা মদের প্রয়োজন। এই চু কোনো কোনো সময় খারাপ ঘটনা ঘটায়। চু খেয়ে গারো সমাজে মারামারিও হয়ে থাকে। তবে তা আবার চু দিয়েই মীংমাসা হয়। চু খেলে কথা বের হয় যুক্তি তর্ক বাড়ে, শক্তি বাড়ে, চু খাওয়ার মাধ্যমে আন্তরিকতাও গড়ে ওঠে আবার কখনো ভেঙেও যায়। আবার কখনো কখোনো এই চু সমাজে একতা আনার ভূমিকা রাখে।

আদি গারো আদিবাসীদের ‘চু’ জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত অত্যন্ত আবশ্যকীয় জিনিস। গারোদের কোনো কোনো খ্রিষ্টীয়ান সম্প্রদায় সরাসরি মদের আসরে বসে না। তারা মদ খায় না এ কথা সত্য তবুও অধিকাংশ গারোই মদের প্রতি আসক্ত এবং গোপনে গোপনে কেউ কেউ মদ পান করে থাকে। ‘চু’ ছাড়া গারোদের কোনো উৎসব অনুষ্ঠান হয় না। আর সে জন্যই দেখা যায় ওদের ওয়ানগালা উৎসব, মিমাংখাম (শ্রাদ্ধ) রান্দি মিকচি গালা (বিধবার কানড়বা) চুগান, রংচুগালা, নাখাল চিকা (মাছ উৎসর্গ) ইত্যাদি পালা পার্বণ ও সামাজিক উৎসব ছাড়াও নতুন গৃহপ্রবেশ, বিয়ে, বিচার শালিসি, ফসল বপন, রোপন ও কর্তন এবং আমোদ-প্রমোদ বিভিনড়ব অনুষ্ঠানে চু-ই তাদের এক মাত্র প্রধান সামগ্রি। কোন নকমা বা ধনী গারো পরিবারে কোন সম্ভ্রান্ত আগন্তুক এলে উক্ত গৃহস্বামী নাগ্রা পিটিয়ে আশে-পাশের লোকজনদের চু খাওয়ার জন্য দাওয়াত দেন। আর তখন শুধু চু-এ সীমাবদ্ধ থাকে না।

খাওয়া দাওয়া ও খাজির জন্য বড় ওয়াক অথবা ষাঁড় মারা হয়। গারোদের মদ পানে কোন পরিমাণ থাকে না। একবার আরম্ভ করলে তা রাতদিন চলতে থাকে। ওয়ানগালা ও চুগান উৎসবে এক নাগারে প্রায় এক সপ্তাহ যাবৎ মদ ও মাংস খাওয়া চলতে থাকে। ধনী গরিব সবার বাড়িতে মদ প্রস্তুত করে এবং প্রত্যেক বাড়িতেই চলে মদের অনুষ্ঠান। এই পর্যন্ত যে চু বা মদের বর্নণা দেওয়া হয়েছে সেই গুলোর মধ্যে হাংঙ্গি বা কলসি চু পরিমাণ মত খেলে তা খুব একটা ক্ষতি করে না।

অনেকেই মদ খেলে ভাত খেতে চায় না, খালি পেতে মদ খেতে থাকে, এটে তার শারীরিক নানা ক্ষয়ক্ষতির মুখোমুখী হয়। বেশি রকম মদ পান করলে শরীর স্বাস্থ্য ভেঙে যায় সংসারের কাম-কাজ হয় না। গারোরা উৎসব প্রিয় জাতি। বার মাস ধরে নানা পালা পার্বণ উৎসব লেগেই থাকে। কাজেই ঐ সব উৎসব আনন্দে মেতে থেকেই তাদের অর্থ‣নতিক অবস্থাও ভাল হয় না এটাও তাদের অবনতির একটা কারণ।

মাত্রাতিরিক্ত মদে আসক্ত হয়ে অনেক বিত্তশালী ব্যাক্তিও সর্বশান্ত হতে দেখেছি। গারো ও অন্যান্য আদিবাসীদের মদ বা চু বিজ্ঞান সম্মত ভাবে ক্সতরি নয়। সে কারণেই অনেক সময় মাত্রাতিরিক্ত মদ পান করলে বিরাট ক্ষতি হতে পরে। এই মদ ব্যাবহারে অনেকেরই অর্থকড়ির অপচয় হয়ে থাকে। বড় বড় উৎসব অনুষ্ঠানে ধনীর পাশাপাশি গরিবরাও যথেষ্ট মদ ক্সতরি করে এবং রাত দিন মদ নিয়ে মেতে থাকে। এক নাগারে মদের নেশায় মেতে থাকলে আয়-উপার্জন বন্ধ হয়। ঘরে চাল-ডাল থাকে না তার হিসেবও রাখে না। এর জন্য গারোদের একটি প্রবাদ বাক্যে বলে- ‘মদ খায়লে গারো রাজা হানথামোদে মিরং দংজা’ অর্থাৎ “মদ খায়লে গারো রাজা হয় সন্ধা বেলায় চাল নাহি রয়” সে খেয়াল থাকে না।

আরো লেখা

উত্তরে লক ডাউন দক্ষিণে লাশের গন্ধ ।।  মতেন্দ্র মানখিন

পালাগান ‘সেরেজিং’ ।। পর্ব-৭ ।।মতেন্দ্র মানখিন

পালাগান সেরেজিং ।। পর্ব-৬।।মতেন্দ্র মানখিন

পালাগান সেরেজিং ।। পর্ব-৫।।মতেন্দ্র মানখিন

পালাগান সেরেজিং ।। পর্ব-৪ ।।মতেন্দ্র মানখিন

 




সম্পাদক : মিঠুন রাকসাম

উপদেষ্টা : মতেন্দ্র মানখিন, থিওফিল নকরেক

যোগাযোগ:  ১৯ মণিপুরিপাড়া, সংসদ এভিনিউ ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৫। 01787161281, 01575090829

thokbirim281@gmail.com

 

থকবিরিমে প্রকাশিত কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। Copyright 2020 © Thokbirim.com.

Design by Raytahost