Thokbirim | logo

২৯শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ | ১২ই জুন, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

গারো কৃষ্টি, শিক্ষা ও সংস্কৃতি।। শেষ পর্ব ।। মণীন্দ্রনাথ মারাক

প্রকাশিত : জুলাই ২৩, ২০২০, ০৯:১৮

গারো কৃষ্টি, শিক্ষা ও সংস্কৃতি।। শেষ পর্ব ।। মণীন্দ্রনাথ মারাক

রেভা. মণীন্দ্রনাথ মারাক গারোজাতিসত্তার একজন পণ্ডিতজন এবং সমাজ চিন্তক। তিনি পুরো জীবনটাই লেখালেখি আর সমাজ ভাবনায় ব্যয় করে যাচ্ছেন। বর্তমানে উনার বয়স প্রায় ৮৫ বছর। রেভা. মণীন্দ্রনাথ মারাকের  ‘গারো কৃষ্টি, শিক্ষা ও সংস্কৃতি’ লেখাটি অনেক আগের। থকবিরিম পাঠকদের জন্য এই লেখা ছাড়াও অন্যান্য লেখা লেখকের প্রকাশিতব্য ‘প্রবন্ধ সংগ্রহ’ গ্রন্থ থেকে ধারাবাহিক প্রকাশ করা হচ্ছে। ‘গারো কৃষ্টি, শিক্ষা ও সংস্কৃতি’ লেখাটির আজ শেষ পর্ব-সম্পাদক।

পণ্ডিতজন মণীন্দ্রনাথ মারাক

শিক্ষা

পূর্বে গারোদের পুঁথিগত শিক্ষা ছিলো না। তবে শরীর চর্চা ও বুদ্ধিবিদ্যা শিক্ষা দেওয়া হত। কৃষি কাজ ও সংসারের যাবতীয় কাজকর্ম অভিভাবকদের কাছে শিক্ষা করত। গারো ছেলেমেয়েরা বড়দের নীতিবাক্য শুনে, তাদের আচার ব্যবহার বা শিষ্টাচার দেখে শিখে নিত।

গারোদের পুঁথিগত শিক্ষা ইংরেজ রাজত্বের অবদান। সংঘাত বিক্ষুব্ধ সীমান্ত পরিদর্শন এসে ইংরেজ কর্মচারীগণ গারোদের সাথে পরিচিত হনে এবং তাদের মধ্যে পুঁথিগত শিক্ষাদান ও খ্রিষ্টধর্ম প্রচারের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে কুচবিহারের তদানীন্তন কমিশনার মি. ডেভিড স্কট, তিনি গারো অঞ্চলের জন্যে পুরুষ ম্যাজিস্ট্রেট নিযুক্ত হন (১৮১৬ সালে)। তিনি গারো নেতৃবৃন্দের সঙ্গে শান্তি আলোচনা করে সর্বপ্রথম গারোদের শিক্ষার জন্যে সিংগিমারীতে স্কুল স্থাপন করেছিলেন। কিন্তু গারো ছেলে মেয়ে না পাওয়ায় যে স্কুল আপন আপনি ভেঙে যায়। ১৮২৩ সালে মি. ডেভিড স্কটের মারা যাওয়ার পনেরো বিশ বছর পরে ব্রিটিশ সরকারি কর্মচারীদের উদ্বোগে দ্বিতীয় বার গোয়ালপাড়ায় স্কুল স্থাপন করে গারোদের মধ্যে শিক্ষা বিস্তারের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু প্রথম দিকে এ স্কুলেও গারো ছেলেমেয়েরা আসতো না, অভিভাবকরা তাদের পাঠাইতো না। কারণ গারোরা বরাবরই ইংরেজদের সন্দেহের চোখে দেখতো। তারপর একদিন কয়েকজন ব্রিটিশ কর্মচারী বালক ওমেদ ও রামথেকে গরু চরাবার মাঠ থেকে ধরে নিয়ে, ছবি দেখিয়ে এবং আকারে ইঙ্গিতে ভাব বিনিময় চেষ্টা করেন। তারপর কিছু জিসিমপত্র দিয়ে তাদের বাড়িতে পাঠান এবং ইঙ্গিতে পরের দিনেও তাদের আসতে বলে দেন। তাদের অভিভাবকগণ এসব জেনে শুনে রেগে যায় এবং তাদের নানা প্রকার ইংরেজ ভীতি দেখিয়ে তাদের আস্তানায় যেতে নিষেধ করে। কিন্তু ফল হয় অন্যরূপ। ঐ দু’টি ছেলে পরের দিনেও গোপনে আরো কয়েকজন মেয়ে সঙ্গে নিয়ে ইংরেজদের আস্তানায় এবং ভাব বিনিময় করে। এভাবে দিনে দিনে গারো ছেলে মেয়েদের ইংরেজদের আস্তানায় আসা যাওয়ার সংখ্যা বেড়ে যায় এবং অভিভাবকদেরও ইংরেজদের উপর বিশ্বাস জন্মে যায়। ফলে স্কুল ভালভাবে চলতে শুরু করে। এই ওমেদ রামথে দুই মামা ভাগ্নেই ১৮৬৩ সালে খ্রিষ্ট ধর্মে দীক্ষা নিয়ে গারোদের মধ্যে প্রথম খ্রিষ্টান হন।

পরবর্তী কালে ব্রিটিশ সরকার গারোদের শিক্ষার ভার সম্পূর্ণরূপে মিশনারিদের হাতে ছেড়ে দেন। মিশনারিগণ গারোদের শিক্ষাক্ষেত্রে Downward filtration theory অনুসরণ করেন। তারা গারো যুবকদের Middles school In Minor school পাশ করায়। গারো গ্রামে গ্রামে স্কুল করে তাদের শিক্ষক এবং প্রচারকরূপে নিযুক্ত করে ছেলেমেয়েদের শিক্ষা দেন ও গারোদের খ্রিষ্টান করান। সম্প্রতি কয়েকটি মিশনে হাইস্কুল হওয়ায় গারো ছেলেমেয়েরা ম্যাট্রিক ও এস,এস,সি পাশ করেছে এবং করছে। তাদের কেউ কোউ এখন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি পেয়েছে এবং পাচ্ছে।

পূর্বে গারো অঞ্চলে কোন স্কুল ছিলো না। দু একটা যা ছিলো, তাও হিন্দু জমিদারদের দ্বারা স্থাপিত হয়েছিলো নিজেদের জন্য। সেসব স্কুলে গারোদের প্রবেশাধিকার ছিলো না। অসভ্য ও অষ্পৃশ্য বলেই যুগ যুগ ধরে গারোদের দূরেই রাখা হতো। এখন মিশনারিদের চেষ্টায় গারোরা শিক্ষার আলো পেয়েছে। বর্তমানে গারোদের অক্ষর জ্ঞান সম্পন্ন লোক বা শিক্ষিতের সংখ্যা শতকরা ৬০/৭০ কিংবা তার চেয়েও বেশি হবে। কিন্তু উচ্চতর শিক্ষার, পোশাগত ও বৃত্তিগত শিক্ষায় গারোরা এখনো অনেক পিছিয়ে আছে। এখনো গারোদের মধ্যে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, দার্শনিক, বুদ্ধিজীবি প্রভৃতি শিক্ষার সুযোগের অভাবে হয়নি। বর্তমান সভ্য জগতের শিক্ষার মানদণ্ডে বিচার করলে শিক্ষায় গারোরা পিছিয়েই আছে বলতে  হবে।

কৃষ্টি-সাংস্কৃতির অবস্থা ব্যাপক। এতে আছে কোন জাতির আচর-আচরণ, রীতিনীতি, শিল্পকলা, সমাজ সংগঠক, শিক্ষা, রাজনৈতিক কাঠামো, ধর্ম বিশ্বাস, জীবন দর্শন, ভাষা, সাহিত্য ইত্যাদি মানুষেরই সমস্ত সৃষ্টি। গারোদের এসমস্ত দিক এক্ষুদ্র প্রবন্ধে পুর্ণাঙ্গরূপে তুলে ধরা সহজ এবং সম্ভব নয়।

গারোদের কৃষ্টির কয়েকটি দিক আগেই সংক্ষেপে আলোচনা করা হয়েছে। গারো ভাষার কৃষ্টিকে বলা হয়-দাকবেওয়াল।

ওয়ানগালায় গোরি রোয়ার দৃশ্য। স্থান চুনিয়া খামাল জনিক নকরেকের বাড়ি। ছবি থকবিরিম

গারো সমাজ ব্যবস্থা মাতৃতান্ত্রিক/ মাতৃসূত্রীয়

গারো সমাজ ব্যবস্থা মাতৃতান্ত্রিক। মেয়েরা সম্পত্তির মালিক হলেও পরিবারের, প্রতিপালনের, পরিচালনের, তত্ববধানের সম্পূর্ণ দায়িত্ব পুরুষেরই হাতেই ন্যস্ত থাকে। সমাজ ব্যবস্থা স্বামীকে স্ত্রী পালনের অধিকার দিয়েছে, কিন্তু স্ত্রীকে স্বামী শাসনের অধিকার দেয়নি। সমাজ ব্যবস্থা অনুসারে বংশ ও পদবি স্ত্রীলোক থেকে ধরা হয়।

সম্পত্তি রক্ষার জন্য Cross cousin Marriage প্রথা বংশ গরস্পরায় গারো সমাজে প্রচলিত আছে। এক পত্নী বিবাহ, বহুপত্নী বিবাহ ও বর্হিবিবাহ প্রথা গারো সমাজে অনুসৃত হয়। অন্ত: বিবাহ গারো সমাজে মারাং (পাপ বা দূষনীয়)। এখন বিবাহ সমাজে স্বীকৃত হয়  না, হলে তাকে বলা হয়-বাকদং (দু প্রকার)। প্রথাগত আইনে এমন দমস্পত্তিকে বেওয়ারিশ করা হয় এবং তাদের গ্রাম থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়।

গারোদের ধর্ম বিশ্বাস

গারোদের ধর্ম বিশ্বাস সরল। তারা এক সৃষ্টকর্ত্তা- তাতারা রাবুগা, স্তুরা-পাস্তুরা, বা ব্রা প্রভৃতি বহু নামে যিনি পূজিত তাঁতে বিশ্বাস  করে। তিনিই এই বিশ্বম-ল বিভিন্ন দেবতা-নস্তু নপান্তু, মাচি, চিগং নকমা, বালং গিতেল, চিচিং বারচিং নজারিক۰নকদিল, নরে-চিরে-কিনরে বকরে  নোবিচি কিমরি বকরি), আপিত পা, আগপ পা, পিৎরাং পা, গবাং পা, টিকরে-টিকসে, ব্রা বা দগিনী, রুরুবে কিন্নাবে মারেমু-মারেবক-কসাপিক ফসাপিন প্রভৃতির দ্বারা সৃষ্টি করেন। তাতারা আদেশে রুরুকে-কিন্নাসে আদি নরনারী শনি ও মনিকে সৃষ্টি করেন এবং আমিতং নামক স্থানে রাখেন। তাদের সন্তানগণ-গানচেং এবং দুজং। তাদের পরবর্তী বংশধর দরমান্দে (পুরুষ) ও বিমা রঞ্চিও (দিমারিসি) গারোদের আদি পিতামাতা।

গারোরা অশরীরী আত্মীয় বিশ্বাসী, জন্মান্তরবাদী এবং আত্মার অবিনাশিতায় বিশ্বাসী। গারোদের বিশ্বাস-কবরস্থ কাজে মৃত ব্যক্তির আত্মা সদল বলে আত্মার দেশে চলে যায় এবং পরেরদিন (চি আংগাল-চিদিমাক) ফিরে এসে দেল۰আং এ বাস করে। দেল۰আংম আর সময়ে তার আত্মা চিরতরে আত্মার দেশে চলে যায়। পরলোকে ব্যবহারের জন্য গারোরা মৃত ব্যক্তির জিসিমপত্র কবরস্থ বা দাহ কালে দিয়ে দেয়।

গারোদের বিশ্বাস

গারোদের বিশ্বাস, মৃত ব্যক্তির আত্মা পরলোকে নিম্ন লিখিত স্থানগুলোতে পর্যায়ক্রমে বাস করে-নাপাক, বালপাকরাম, বালস্রি, বালমাং চিগা, চিৎমাং এবং শেষ পর্যায়ে মাংরু-মাদাংয়ে চলে যায়। সেখান থেকে সে পুনরায় জন্ম গ্রহণ করে ও জগতে ফিরে আসে। পর্বোক্ত স্থানে গুলোতে যাত্রাকালে মৃত ব্যক্তির আত্মা নিম্ন লিখিত স্থানগুলোতেও বিশ্রাম নিয়ে যায়। এগুলো হল-বগিরানী জা নংটাকরাম, কাৎচিনি কাসিপেরাম, মিমাং মিশাল চারাম, মাৎচু বলদাককারাম, মিমাং গামা সিকরাম, মিমাং ওয়ালতৎ তৎরাম প্রভৃতি।

গারো ভাষা

গারো ভাষা তিব্বতী-চীনা ভাষা পরিবারের অন্তর্গত। এ ভাষা পরিবারের প্রধান উপ-পরিবারগুলো হল-তিব্বতী-বর্মী শাম-শাম, আন্নামী ও চীনা। গারো ভাষা তিব্বতী-বনী ভাষা উপ-পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। কাছারী, রাভা, নাগা, টিপরা, বরো, মনিপুরী, লুবই, লালুঙ, ভুটিয়া প্রভৃতি জাতিদের ভাষার সঙ্গে গারো ভাষার অনেক মিল আছে। সমগ্র হিমালয়ের পাদদেশে, খাসিয়া পাহাড় ধারে সমগ্র সাবেক আসাম এবং বাংলাদেশের উত্তর-পূর্ব অংশে তিব্বতী-বর্মী ভাষা উপপরিবারের বিস্তার আছে। পানি-তি, দি, চি জাতিদের ভষার শব্দ। এসব শব্দকে কেন্দ্র করে হয়েছে তিস্তা, তিতাস, দিহিং, দিহ, চিন্দুইস প্রভৃতি নদীর নাম। ব্রহ্মপুত্র-গারো নাম সংডু, ইহার তিব্বতী নাম হল সানপু।

গারোদের বিশ্বাস যে আগে তাদেরও ভাষার বর্ণমালা, সাহিত্য, ইতিহাস সব কিছু ছিলো। কিন্তু কোন এক সময়ে এক ভীষণ র্দুভিক্ষে তারা সেগুলো খাদ্যের অভাবে খেয়ে ফেলে। গারোদের অলিখিত ভাষার সাহিত্য গল্প, কাহিনি লোক সাহিত্য, কাব্য, বিরত্ব গাথা, সঙ্গীত, প্রবাদ-প্রবচন, শিলূক, ছড়া সবই আছে। সতী সাবিত্রীর মতো নারী চরিত্র গারো কথা সাহিত্যের এক মায়িকা সিংউইলে দেখা যায়। মহুয়া ও মলূয়ার মতো দুর্জ্জয় নারীর প্রেম দেখা যায় সিরাজিংএ। স্বদেশপ্রীতির প্রকাশ দেখা যায় সাহিত্য ও সঙ্গীতের ভাণ্ডারে।

।। সমাপ্ত।।




সম্পাদক : মিঠুন রাকসাম

উপদেষ্টা : মতেন্দ্র মানখিন, থিওফিল নকরেক

যোগাযোগ:  ১৯ মণিপুরিপাড়া, সংসদ এভিনিউ ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৫। 01787161281, 01575090829

thokbirim281@gmail.com

 

থকবিরিমে প্রকাশিত কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। Copyright 2020 © Thokbirim.com.

Design by Raytahost
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x