Thokbirim | logo

৮ই বৈশাখ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ | ২১শে এপ্রিল, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

গারো কৃষ্টি, শিক্ষা ও সংস্কৃতি।। পর্ব-২ ।। মণীন্দ্রনাথ মারাক

প্রকাশিত : জুলাই ২২, ২০২০, ১২:২৫

গারো কৃষ্টি, শিক্ষা ও সংস্কৃতি।। পর্ব-২ ।। মণীন্দ্রনাথ মারাক

রেভা. মণীন্দ্রনাথ মারাক গারোজাতিসত্তার একজন পণ্ডিতজন এবং সমাজ চিন্তক। তিনি পুরো জীবনটাই লেখালেখি আর সমাজ ভাবনায় ব্যয় করে যাচ্ছেন। বর্তমানে উনার বয়স প্রায় ৮৫ বছর। রেভা. মণীন্দ্রনাথ মারাকের  ‘গারো কৃষ্টি, শিক্ষা ও সংস্কৃতি’ লেখাটি অনেক আগের। থকবিরিম পাঠকদের জন্য এই লেখা ছাড়াও অন্যান্য লেখা লেখকের প্রকাশিতব্য ‘প্রবন্ধ সংগ্রহ’ গ্রন্থ থেকে ধারাবাহিক প্রকাশ করা হচ্ছে-সম্পাদক।

লেখক মণীন্দ্রনাথ মারাক

গারোদের সারাবছরে (বিলসিকারি বা সলেতক) জুম চাষের কার্যক্রম, মাস, সময়ের নাম, কাজের নাম ও কৃষি উৎসবের নাম নিম্নরূপ-

(১)    ফেব্রুয়ারি মাসের অর্ধেক এবং মার্চ মাসের অর্দ্ধেক হল ‘গালমাফজা’। এটাই গারোদের প্রথম মাস। এ মাসে নববর্ষ উৎসব উদযাপন করা হয়। আসং কোশির (গ্রাম ও জীবন রক্ষক দেবতার) পূজা হয়। এ কৃষি সময়কে আসকারী বলা হয়। এ মাসের কৃষি উৎসব হল “দেন বিলসিয়া (নতূন কৃষিজমি পরিস্কারের উৎসব)। গিৎচিপং মিচিল তাৎআ ইত্যাদি বহু সংখ্যাক এ মাসে হয়ে থাকে।

(২)    মার্চ মাসের অর্ধেক এবং এপ্রিল মাসের অর্ধেক হল ‘মেবাকজা’। এ কৃষি সময়ের নাম হল গালমাক বা গেআ খারি। এ মাসে আসিরকা বা আ সিআকা কৃষি উৎসব হয়। আসি অকা অর্থ মন্দ শক্তির প্রভাব দূর করা। এ মাসে পাহাড়ি ধান বুনা হয় এবং সামসি দাংআ বা আগাছা নিড়ান হয়।

(৩)   এপ্রিল মাসের অর্ধেক এবং মে মাসের অর্ধেক হল ‘জাগ্রোজা’। এ কৃষি সময়ের নাম হল জাকরাকারি। এ মাসে নতুন কৃষিক্ষেত নিড়ান হয় এবং একে কেন্দ্র করে আ-জাকরা উৎসব পালিত হয়।

(৪)    মে মাসের অর্ধেক এবং জুন মাসের অর্ধেক হল ‘সগালজা’। এ কৃষি সময়ের নাম হল দাংকারি। এ মাসে দ্বিতীয় বছরে ববহৃত কৃষি ক্ষেত নিড়ান হয়। এর নাম আব্রেংদাংআ। এ মাসে ভুট্টা (মিখপ) ফসল তোলা হয় এবং আব্রেংদাংয়া উৎসব পালিত হয়।

(৫)   জুন মাসের অর্ধেক এবং জুলাই মাসে। অর্ধেক হল ‘জাগাপাজা’। এ কৃষি সময়ের নাম হল মিসিকারি। এ মাসে পাখির (দ্বিতীয় ফসলের জন্য নতূন করে চাষ) এবং আব্রেংরাত (দুই ফসল  শেষ করে তোলা) হয়। মিসি নামক চিক্কন শস্যও এ সময়ে কাটা হয়। এ মাসে ‘বি’ আমূয়া বা রকিমের (শষ্য দেবী) পূজা উৎসব হয়।

(৬)   জুলাই মাসের অর্ধেক এবং আগস্ট মাসের অর্ধেক হল জামেদকজা। এ কৃষি সময়ের নাম হল মিত্তেকারি। এ মাসে সাম রাংদাংআ বা আগাছা নিড়ান হয়। এ মাসে গ্রীষ্মকালীন ফসল তেল শেষ হয় এবং রংচুগাল্লা, গিন্দেগালা বা মিগিতালা উৎসব পালিত হয়।

(৭)    আগস্ট মাসের অর্ধেক সেপ্টেম্বর মাসের অর্ধেক হল মেপাংজা। এ কৃষি সময়ের নাম হল সামপাংখারি। এ মাসে মুরাদ রাতা(আগাছা নিড়ান) করে এবং আহাইয়া আ۰আ উ আ বা জামেগাপ উৎসব পালন করে। এ উৎসবের আগে গারোরা লাল চাল খায় না।

(৮)   সেপ্টেম্বর মাসের অর্ধেক এবং অক্টোবর মাসের অর্ধেক হল আ۰নিজা। এ কৃষি সময়ের নাম ওয়াছি ছাকাতকারি। এ মাসে গারোদের প্রধান উৎসব ওয়ানগালা  ও ঘুরে ওয়াতা উৎসব উদযাপিত হয়।

(৯)   অক্টোবর মাসের অর্ধেক এবং নভেম্বর মাসের অর্ধেক হল বেরকজা। এ কৃষি সময়ের নাম সিনখারি। এ মাসে কার্পাস ফসল তোলা হয় এবং আ۰বিয়া উৎসব পালিত হয়।

(১০)  নভেম্বর মাসের অর্ধেক এবং ডিসেম্বর মাসের অর্ধেক হল কিলকজা। এ কৃষি সময়ের নাম শ্রুরুকারি। এ মাসে আ۰খিং নকমা (রাজা) আ۰দাল (নতূন জমি) চাষের জন্য বিতরণ করেন। এ মাসে উল্লেখ্যযোগ্য কোন উৎসব নেই।

(১১)  ডিসেম্বর মাসের অর্ধেক এবং  জানুয়ারি মাসের অর্ধেক হল আ۰উতেজা। এ কৃষি সময়ের মাস আ۰আ অ অ۰কারি। এ মাসে নতুন জমি পরিস্কার করার কাজ আরম্ভ করা হয় এবং অ۰পাতা   উৎসব পালন করা হয়।

১২ জানুয়ারি মাসে অর্ধেক এবং ফেব্রুয়ারি মাসের  ক্ষেতের ফসল অর্ধেক হল ওয়াচেংতা। এ কৃষি সময়ের নাম ওয়াচেংকারি। মাসে এ মাসে বরাং তৈরি করা হয় এবং আ উইতা  উৎসব করা হয়।

সাধারণ পশুপাখি বাদেও ক্ষেতের ফসল ও গোলাঘরে সংরক্ষিত শস্য অপদেবতা-বাং এ বাকওয়েন, রাক্কাসি, মিস্কাল, চুয়াল প্রভৃতি দ্বারা অপহৃত ও ক্ষতিগ্রস্ত যাতে না হয় যে জন্য গারোরা নানা প্রকার কলাকৌশল অবলম্বন করে থাকে।

জুম ক্ষেতে গারোরা নানা প্রকার ধান, ভুট্টা, জোয়াব, বাজরা, লাউ, কুমড়া, বেগুন, কচু, সর্বপ্রকার আলু, হলুদ, আদা, কার্পাস, পাট, কলা, লেবু, আনারস ইত্যাদি ফসল, ফল, মূল উৎসব করে থাকে। যা তারা উৎপন্ন করতে পারে না এমন প্রয়োজনীয় জিসিম তারা সমতলভূমি থেকে জিনিসের বিনিময়ে কিংবা কিনে নিয়ে যায়।

 

গারোরা দিনে তিনবার খায়। তাদের খাবার গুলো হল-

মিফ্রিং, (সকালের খাওয়া)

মিশাল (দুপুরের খাওয়া)

মি আতাম (সন্ধ্যার খাওয়া)।

ছোট ছেলেমেয়েরা দিনে চার বার খায়। দুপুর ও সন্ধ্যার মাঝখানে তাদের খাওয়ার নাম মিশাল। মি (সাধারণ ভাত) হাঁড়ি পাতিলে রান্না করা হয়। মিব্রেংয়া (সুস্বাদু ভাত) বাঁশের চুংগায় এবং মি মিৎদিম বাষ্পে রান্না করা হয়। নানা ধরণের পিঠা, চিড়া ইত্যাদি তৈরি করে খায়। গারোরা তরকারীকে বলে সাম, বিজাক, জাবা বা জাবেক। সাধারণ তরকারি কড়াই, পাতিল ইত্যাদি পাত্রে রান্না হয়। উতেপা কলার পাতায় এবং ব্রেংয়া বাঁশের চুংগায় রান্না হয়। গারোদের পানীয় জলের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলে মদ। তারা নিজেরাই চাল, ভ্ট্টূা, জোরার ইত্যাদি দিয়ে পচাই মদ তৈরি করে। মদের সাধারণ নাম চু। পচাই মদের অমিশ্রীত রসের নাম চুবিচ্চি। বাষ্পে তৈরি করা মদের নাম মত্তাং। মদ আমোদ প্রমোদে পানীয় হিমেবে, উৎসব-পূজার উপাচার হিসেবে এবং বন্ধবান্ধব ও আত্মীয় স্বজনের আগমনে সেবা ও আদর যত্নে দ্রব্য সামগ্রী হিসেবে ব্যবহৃত হয়। মদ তৈরির পাত্রগুলোর নাম-সাংগি, দিকসাং, দিক্কা বা বটকি। মদ ওয়াপেকে (বিশেষ নল) এবং ছেঁকে ফং, বেক, লাউ, কাক্সি ইত্যাদি পাত্রদ্বারা পান করা হয়। মদ পরিবেশন কালে খাজিও (মাংসের তরকারি) পরিবেশিত হয়। সম্মানিত লোকদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা করা হয়।

গারোদের জীবন চক্র

গারোরা গর্ভবস্থায় গর্ভবর্তী নারীর এবং গর্ভস্থ সন্তানের মঙ্গলের জন্যে নানা প্রকার ও ব্যবস্থা নেয়। শিশু জন্মের চার পাঁচ মাস আগেই চুজাংগি (জীবন মদ) তৈরি করে রাখে। প্রসব বেদনা দেখা দিলে মেচিক কামাল (ধাত্রী) নিয়ে আসে। শিশু জন্মের সঠিক দিন ও সময় কামালের দ্বারা পরীক্ষা করে জেনে নেয়। যদি কেউ যাদুক্রিয়া করে থাকে তবে তা যাদুক্রিয়া দ্বারাই নির্ধারণের চেষ্টা করে। জন্মের দিন দারিচিক ও বাগোবা মিত্তে ক্রিতা করা হয়। নকজাত শিশুকে ঈষৎ উষ্ণ জলে স্নান করানো হয়। তারপর তাকে কাপড়ে জড়িয়ে শুকিয়ে রাখা হয়। অপদেবতাদের দূরে রাখার জন্যে দরজায় জাল, ঘরের মাঝখানে অগ্নিকুণ্ড ও শিয়রে দুর্গন্ধযুক্ত পাতা ইত্যাদি রাখা হয়। জন্মের দিন চুজাংগি খাওয়া হয়। এ মদ ছেলেমেয়েদের খেতে দেওয়া হয় তা, শুধু বয়স্ক লোকেরাই এ মদ খেতে পারে। তবে কেহ এ মদ খেয়ে দিনে কোন প্রকার কাজকর্ম করতে পারবে না। ঐ দিনে কাজ করা মানা বা দূষনীয় বলে নিষিদ্ধ। এক সপ্তাহ পর টংবেংমা জাপার্কা করে আনুষ্ঠানিক ভাবে কামালের দ্বারা শিশুর নামকরণ করা হয়। বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সে সামাজিক বিধি বিধান ও কাজকর্মগুলো শেখে। অসুখ বিসুখ হবে কামালের দ্বারা অসুখ বিসুখের কারণ পরীক্ষা করে (পংসি নিয়া,রিসাল নিয়া, সিমআ নিয়া) নিয়ে তার প্রতিকার করে-লতা পাতা-মূলের ঔষধ, ঝাড়ফুক, যাদু ক্রিয়া, ক্রুদ্ধ দেবতার পূজা ইত্যাদি ব্যবস্থা করা হয়। বড় বড় দেবতার পূজার কামালকে সাহায্য করেন রানগিপা (উপপুরোহিত)। বয়স্ক হলে সামাজিক প্রথার বিয়ে শাদি করে যে সংসারী হয়। তার অনেক বন্ধবান্ধব (বাইস/রিপেং) জুটে তাকে আত্মীয় স্বজনের সেবা করতে হয়, বিপদে ও প্রয়োজনে তাদের সাহায্য করতে হয়। তার বিপদের আত্মীয় স্বজনের ঐ ভাবেই তার সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসে। ভুল জীবন যাপন করলে সে সমাজে মান সম্মান নিয়ে থাকে। খারাপ জীবন যাপন করলে তাকে নানা প্রকার বিচার সালিশ অগ্নিপরীক্ষা, জলপরীক্ষা, আপাল গাল্লা এর (সমাজ চ্যুত) সম্মুখীন হতে হয়। এমনি করে একদিন তার মৃত্যু আসে। তার মৃতদেহ বিধি অনুসারে দাহ বা কবরস্থ করা হয়। মৃত ব্যক্তি মেয়ে হলে বিপত্নীকে ‘আখিম’ বলে মেয়ের মাহারী  (গোষ্ঠী) দ্বিতীয় স্ত্রী সরবরাহ করে। মৃত ব্যক্তি পুরুষ হলে, বিধবা মেয়েকে অলঙ্কারাদি খুলে শ্বশুর-শাশুড়ির বাড়িতে গিয়ে মৃত স্বামীর জন্যে শোক প্রকাশ করে (গারো ভাষায় রান্ধি মিকচি গাল্লা) পরে দ্বিতীয় বর যে শ্বশুর-শাশুড়ির বাড়িতে গিয়ে দ্বিতীয় বর প্রার্থনা করে (গারো ভাষায় রান্ধিনক গাআ)। এমনি করে একজন গারোর সারাটি জীবন ধর্মীয় ও সামাজিক বিধানে নিয়ন্ত্রিত হয় এবং তার জীবন ও মরণকে কেন্দ্র করে হয় নানা আচার অনুষ্ঠান।




সম্পাদক : মিঠুন রাকসাম

উপদেষ্টা : মতেন্দ্র মানখিন, থিওফিল নকরেক

যোগাযোগ:  ১৯ মণিপুরিপাড়া, সংসদ এভিনিউ ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৫। 01787161281, 01575090829

thokbirim281@gmail.com

 

থকবিরিমে প্রকাশিত কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। Copyright 2020 © Thokbirim.com.

Design by Raytahost