Thokbirim | logo

১লা আষাঢ়, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ | ১৫ই জুন, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

গারো কৃষ্টি, শিক্ষা ও সংস্কৃতি।। পর্ব-১ ।। মণীন্দ্রনাথ মারাক

প্রকাশিত : জুলাই ২১, ২০২০, ২০:৩০

গারো কৃষ্টি, শিক্ষা ও সংস্কৃতি।। পর্ব-১ ।। মণীন্দ্রনাথ মারাক

রেভা. মণীন্দ্রনাথ মারাক গারোজাতিসত্তার একজন পণ্ডিতজন এবং সমাজ চিন্তক। তিনি পুরো জীবনটাই লেখালেখি আর সমাজ ভাবনায় ব্যয় করে যাচ্ছেন। বর্তমানে উনার বয়স প্রায় ৮৫ বছর। রেভা. মণীন্দ্রনাথ মারাকের  ‘গারো কৃষ্টি, শিক্ষা ও সংস্কৃতি’ লেখাটি অনেক আগের। থকবিরিম পাঠকদের জন্য এই লেখা ছাড়াও অন্যান্য লেখা লেখকের প্রকাশিতব্য ‘প্রবন্ধ সংগ্রহ’ গ্রন্থ থেকে ধারাবাহিক প্রকাশ করা হচ্ছে-সম্পাদক।

গারো জাতি মোঙ্গলীয় জাতিগোষ্ঠির বডো সম্প্রদায়ভুক্ত দলের একটি শাখা। এই জাতি এখন উপ-মহাদেশের ভারত ও বাংলাদেশে বাস করে। অধিকাংশ গারোই এখন ধর্মীয় বিশ্বাসে খ্রিষ্টান। আবহমান কাল থেকে আজ পর্যন্ত এবং নানা ঘাত প্রতিঘাত ও বিবর্তনের মধ্যেও নিজেদের অনেক জাতীয় বৈশিষ্ট্য রক্ষা করে এসেছে। এদের জীবন যাপন প্রণালি কঠিন হলেও সরল এবং কষ্টকর হলেও আনন্দময়।

গারোদের জীবন কৃষি ভিত্তিক এবং গ্রাম কেন্দ্রিক। নদী বা ঝর্নার নিকটবর্তী স্থানে এরা গ্রাম স্থাপন করে। সেখানে তাই পরস্পরের কাছাকাছি বাড়িঘর তৈরি করে বাস করে। গোয়াল ঘর ও গোলাঘর সাধারণত: বসত বাড়ির কিছু দূরে করে থাকে। নকপান্থে (যুবকদের ঘর ও ক্লাবঘর) গ্রামের আলাদা জায়গায় তৈরি করে। এ ঘর যুবকদের বসবাসের জন্য, নকমার বিচার কাজের জন্য, আমোদ-প্রমোদ ইত্যাদির জন্যে ব্যবহার করা হয়। এতে মেয়েদের প্রবেশাধিকার থাকে না। গারোদের বসবাসের ঘর ও লম্বা করে মাচাং করে বাঁশ, কাঠ ও শণ দিয়ে তৈনি করা হয়Ñঘরটা নিম্নলিখিত কতগুলো কুঠিরিতে বিভক্ত করা হয়-

দু = ঘুমাবার স্থান

দিগান = পবিত্র স্থান-অস্ত্রাগার

চুসিমরা = মদের স্থান

মালজুরি = উৎসব ও উৎসর্গের স্থান

দূংরাম = খাবার স্থান

চুদাপ = রান্নার স্থান

বালিম ও আবেং =বারান্দা

এ ছাড়াও ‘চিদিকর’ম (হাঁস-মারগীর ঘর), ও আবল বা আম্বল নক(লাকড়ি ঘর) তৈরি করা হয়।

বাড়ির সম্মুখভাগে পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন উঠান থাকে, গারো ভাষায় ইহার নামÑসারা, নক্রা, আ-থালা  বা আতলা। নতূন ঘরে বসবাসের আগে তা নক মিত্তের (গৃহ দেবতা) নামে উসর্গ করা হয় এবং আনন্দ উৎসব করে ঘরে উঠা হয়। একে গারো ভাষায় নকগিত্তালো গা۰আ বলা হয়।

গ্রামকে বন্য হিংস্রর পশু অথবা শক্র মানুষের  বোবিল-গিন্নাল) সম্ভাব্য আক্রমণ থেকে রক্ষা করবার জন্যে সম্ভাব্য আগমন পথগুলোতে ‘ব্রা’ (তীর) এবং ওয়ামিসি বা পাঞ্জি সাজিয়ে রাখা হয়। অপদেবতাদের হাত থেকে রক্ষা পাবার জন্য প্রতি বছর আসং কোশির (গ্রাম ও জীবন রক্ষক কালকামে দেবতার) পূজা করা হয়। যদি কোন সময়ে গ্রামে মহামারীর আর্বিভাব হয়, তখন তার প্রতিরোধ ও প্রতিকার করে বানর, গেছো ঈদুর, কুকুর ইত্যাদি নিম্ন শ্রেণির প্রাণি হত্যা করে পথে পথে তাদের মাংস পুতে রাখা হয়। তাদের রক্ত প্রত্যেক বাড়ির দরজার পূর্বদিতে লাগিয়ে দেওয়া হয়। কঙ্কালগুলো রাস্তায় রাস্তায় বাঁশ, কাঠে দিয়ে টাঙ্গিয়ে বা ঝুলিয়ে রাখা হয়। গ্রামের ও শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য বংশানুক্রমে সংনি নকমা(গ্রাম পালক) নিযুক্ত হয়।

গারোদের জীবিকা নির্বাহের প্রধান উপায় হল কৃষি। এ ছাড়াও বনজ সম্পদের ব্যবহার, শিল্পকর্ম, মিস্ত্রী, শিকার, পশু-পাখি পালন ইত্যাদি জীবিকা নির্বাহের উপায় হিসাবে অবলম্বিত হয়।

গারোদের প্রধান উপজীবিকা হল কৃষি কাজ। পাহাড়ি গারোরা জুম প্রথার কৃষিকাজ করে। সমতল ভূমির গারোদের কৃষি কাজ সমতল ভূমির অন্যান্য লোকদের মতই। বর্তমানে পাহাড়ি গারোদের মধ্যে জাপানি প্রথায় পাহাড়ে টেরাক পদ্ধতিতে কিছু কিছু কৃষি কাজ আরম্ভ হচ্ছে। গারোদের জুম কৃষিকে কেন্দ্র করে সারা বছর চলে নানা উৎসব পার্বন ও দেবতার আরাধনা। সমভূমির গারোরাও জুমচাষ সম্পর্কিত প্রধান প্রধান উৎসবগুলো পাহাড়ি গারোদের মতই পালন করে থাকে।

জুমচাষ করা কষ্টকর, শ্রমদায়ক ও বিপদজনক। বন্য হিংস্র জন্তুদের সাথে সংগ্রাম করে জুম চাষ করা, ক্ষেতের ফসল রক্ষা করা, অশরীর মন্দআত্মার ভয়ভীতির মধ্যেও কাজ করে যাওয়া সহজ ব্যাপার নয়। পরিবারের বয়স্ক সব নরনারী অস্ত্রসহ সারাদিন ক্ষেতে কাজ করে । রাতে পুরুষ লোকেরা বাঁশের ফলা, আগুন, অস্ত্র ইত্যাদি নিয়ে বিশ-ত্রিশ ফুট উচু গাছের ডালে নির্মিত বরাং (পাহারা দেওয়ার ঘর) এ থেকে ফসল পাহারা দেয়।

 

জুম চাষকালে গারোরা খুব ভোরে মিফ্রিং (সকালের খাবার) খেয়ে সঙ্গে করে মিশাল (দুপুরের খাবার), লাউয়ে করে পানি, হাতে মং রেং, সেলু, মিল۰আম ইত্যাদি প্রয়োজনীয় অস্ত্র নিয়ে সূর্য উঠার সঙ্গে সঙ্গে গ্রামের সব মেয়ে-পুরুষ পাহাড়ি চড়াই-উৎরাই আঁকাবাঁকা পথ দিয়ে বন্য হিং¯্র পশুদের ভয়ে সারিবদ্ধ হয়ে গান ও সংকেত ধ্বনি করে দূর দূর জুম ক্ষেতে কাজ করতে চলে যায় এবং অপরাহ্নে শ্রান্তক্লান্ত শরীর নিয়ে বাড়ি ফিরে আসে। দিনের বেলায় বৃদ্ধ-বৃদ্ধা ও ছেলেমেয়েরা বাড়িঘর ও গরু বাছুর দেখাশুনা করে। সন্ধ্যায় ক্ষেত থেকে ফিরে আসে ক্লান্তি দূর করবার জন্যে সবাই মিলে মদ নিয়ে বসে, গল্পগুজব ও আমোদ-প্রমোদ করে পরে আহারাদি করে শুয়ে পড়ে। এ দিকে প্রত্যেক বাড়ির দু’একজন পুরুষ বেলা থাকতে খেয়ে বরাংএ পাহাড়া দিতে চলে যায় এবং সারারাত হাতী, শূকর ইত্যাদির হাত থেকে ফসল রক্ষা করবার জন্য পাহাড়া দেয়।

ছবি : থকবিরিম গ্যালারি।

চলবে…




সম্পাদক : মিঠুন রাকসাম

উপদেষ্টা : মতেন্দ্র মানখিন, থিওফিল নকরেক

যোগাযোগ:  ১৯ মণিপুরিপাড়া, সংসদ এভিনিউ ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৫। 01787161281, 01575090829

thokbirim281@gmail.com

 

থকবিরিমে প্রকাশিত কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। Copyright 2020 © Thokbirim.com.

Design by Raytahost
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x