Thokbirim | logo

১৪ই ফাল্গুন, ১৪৩০ বঙ্গাব্দ | ২৭শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

গারো লোককাহিনি :  যে গ্রন্থ সমৃদ্ধ গারো গল্প-সাহিত্যের নিদর্শন বহন করে ।। মিঠুন কুমার কোচ

প্রকাশিত : জুলাই ১৭, ২০২০, ২০:৪৬

গারো লোককাহিনি :  যে গ্রন্থ সমৃদ্ধ গারো গল্প-সাহিত্যের নিদর্শন বহন করে ।। মিঠুন কুমার কোচ

কোনো লেখার অনুবাদে মূল রচনার স্বকীয়তা পুরোপুরি বজায় রাখা যায় না বা রাখা হয় না বলে অনুবাদকৃত সাহিত্যকর্ম পাঠে আমার বরাবরই একটু অনীহা ছিল, সবসময় চাইতাম মূল গ্রন্থ পাঠ করে সরাসরি লেখকের চিন্তার অংশীদার হতে। তবে দেওয়ানসিং এস রংমুথুর ইংরেজিতে সংকলিত গারো গল্পসমূহ থকবিরিম প্রকাশনী থেকে “গারো লোককাহিনি” নামে উদীয়মান তরুণ কবি ও অনুবাদক দেবাশীষ ইম্মানুয়েল রেমা’ কর্তৃক বাংলায় ভাষান্তরকৃত বইটি যখন হাতে পেলাম তখন এটি পাঠে অনুবাদকৃত সাহিত্য পাঠে আমার ধারণা রীতিমত অমূলক প্রমাণিত হয়েছে। আলোচ্য বইটি অনুবাদ করে অনুবাদক গারো সাহিত্যের অনবদ্য সৃষ্টি “গারো লোককাহিনি” বাংলাভাষী  পাঠকদের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিয়ে সর্বসাধারণের জন্যে গারো লোকসাহিত্যে প্রবেশের দ্বার উন্মুক্ত করে দিয়েছেন বলা যেতে পারে।

ইংরেজিতে লিখিত মূল গল্পের বইটি আমার পড়ে দেখার সুযোগ হয়নি, তাই তুলনামূলক বিচার আমার পক্ষে সম্ভবপর নয়, সঙ্গতও নয়। অতএব, মূল গ্রন্থের ভাব ও বিষয়বস্তুর কতটা রক্ষিত হয়েছে, কতটুকু সংযোজিত বা বিয়োজিত হয়েছে সেটা আমার বিচার্য নয়, সেটা আমার বিবেচ্যও হতে পারে না মূল বইয়ে আমার প্রবেশগম্যতা বা পঠন না থাকার কারণে। তবে এটুকু বলতে পারি, আলোচ্য বইটির অনুবাদক বইটি শুধু অনুবাদ করেছেন বললে রীতিমত অবমূল্যায়ন করা হবে, কারণ তিনি তার সাধ্যমত ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় এত প্রাণবন্ত ভাষায় সাবলীলভাবে গল্পগুলো বর্ণনা করেছেন যে, পাঠকের মনে হবে যেন স্বয়ং অনুবাদকই গল্পকথকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন, যা আসলে অনুবাদের চেয়েও বেশি কিছু, আর এখানেই অনুবাদ ও অনুবাদকের সার্থকতা। মৌলিক সৃষ্টি না হওয়া সত্ত্বেও অনুবাদ-দক্ষতা ও বর্ণনকৌশলে বইটি ভাষান্তরে অনুবাদক স্বকীয়তার ছাপ রেখেছেন এবং অনুবাদকর্মও যে একটি শিল্প সেটিই এই পাঠককে বারবার মনে করিয়ে দিয়েছেন।

গারো জাতিসত্তার কোন ব্যক্তির মাতৃভাষা বাংলা না হওয়া সত্ত্বেও বাংলা ভাষায় এতটা দখল থাকতে পারে, বাংলা শব্দভাণ্ডার এত সমৃদ্ধ হতে পারে, এই গল্পের বইখানি পাঠ না করলে তা ঠিক হৃদয়ঙ্গম করা যাবে না। অনুবাদক যতটা না অনুবাদ করেছেন, তার চেয়েও পরম যত্নসহকারে গারো জাতিসত্তার গল্পের সমাহার সযত্নে সর্বসমক্ষে লিখিত আকারে উপস্থাপনে মনোনিবেশ করেছেন।

 

গল্পগুলোতে গারো জনগোষ্ঠীর প্রকৃতির সাথে জন্মান্তরের নিবিড় সম্পর্কের বিষয়গুলো সহজাতভাবে প্রতিভাত হয়েছে। আবহমানকাল ধরে গারোদের বীরত্ব, সাহসিকতা, অতিথিপরায়ণতা, আন্তরিকতার মত বিষয়গুলো গল্পের ভাঁজে ভাঁজে উন্মোচিত হয়েছে। হতে পারে গল্পগুলোর কাহিনি অনুবাদকের নিজস্বজাত নয়, কিন্তু গল্পগুলোকে সুন্দর, কুশলী শব্দচয়নে জীবন্ত করে উপস্থাপনের কৃতিত্ব অবশ্যই অনুবাদকের একান্ত নিজস্ব, তা নির্দ্বিধায় বলা যায়।

এই বইটি গারো জাতির চিত্তাকর্ষক অনেক লোককাহিনির সাথে পাঠকদের পরিচয় করিয়ে দেবে, দুঃসাহসিক গল্পগুলোর বৈচিত্র্য অনাস্বাদিত রোমাঞ্চের স্বাদ পাইয়ে দেবে, পাঠকের কল্পনাপ্রবণতাকে উদ্দীপ্ত করে নিয়ে যাবে গারোদের প্রাচীন সেই সময়ে, যে সময়ে গারোদের লড়তে হত বৈরী প্রকৃতির সাথে, যখন ভয়ানক হিংস্র বন্য জন্তুদের সাথে যুদ্ধ করে বেঁচে থাকতে হত, যখন খাদ্য সংগ্রহের জন্যে মানুষকে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করতে হত, যেখানে পরিস্থিতিটা এমন ছিল যে- হয় কোন হিংস্র প্রাণীকে মেরে খাদ্য বানাও নতুবা তার খাদ্যে পরিণত হও। তাই গল্পের কোন কোন চরিত্রের আসন্ন ভয়ানক পরিণতির কথা ভেবে পাঠক কখনো কখনো উৎকণ্ঠিত ও বিচলিত হতে পারেন। আর গল্পের এই আবহগুলো প্রকৃতপক্ষে সেই সময়ের গারোদের সংগ্রামমুখর দৈনন্দিন জীবনেরই প্রতিনিধিত্ব করে।

গারো রূপকথার দরন নামের তরুণ ও অপ্সরার অসম অথচ অলৌকিক প্রণয় এবং অতপর প্রণয় থেকে পরিণয়ে পরিগ্রহ হওয়া; মৎস্যরাণি ও মর্ত্যমানবের প্রেমগাঁথার সূচনার সুখবিলাস আর বিয়োগান্তক পরিণতির কথা ভেবে আপনার কল্পনাপ্রবণ মন কখনো প্রেমাবেগের অনুবর্তী হয়ে বিমোহিত হবে আবার কখনো বিয়োগব্যথার নিমিত্তে দুঃখবোধেও ভুগতে পারেন। কল্পনাবিলাসী মনের অজান্তে হয়ত চকিতে গল্পের সেই মর্ত্যমানব কিংবা  মৎস্যরাণি, নয়ত অপ্সরার স্থলে নিজেকে ভেবে বসলেও অবাক হবার কিছু থাকবে না।

“বনৌষধি ও উদ্ভিদের রাণির” অরণ্য রাজ্যে হরেক রকম উদ্ভিদ, লতা ও গুল্মের আশ্চর্য সব ওষুধি গুণাবলি ও অতিপ্রাকৃতিক শক্তি প্রকৃতি, উদ্ভিদ ও বৃক্ষরাজি সম্পর্কে আপনাকে নতুন করে ভাবাতে পারে। মাচ্ছাদুদের (অর্ধ মানব ও অর্ধ ব্যাঘ্র নরখাদক) প্রতারণার প্রতিশোধ নিতে গিয়ে বুদ্ধিমান অনাথ বালক জেরেং এর উপস্থিত বুদ্ধির জোরে তার বিপদ থেকে উদ্ধার পাওয়া ও সেই চতুর বালক কর্তৃক প্রতারকদের উপযুক্ত শাস্তি ও চূড়ান্ত পরিণতি প্রদানের গল্পও আপনাকে যুগপৎ আনন্দ ও স্বস্তি দেবে, চমকে দিতে পারে তার শানিত বুদ্ধি।

গারো ভাষার বিভিন্ন শব্দ, উপমা এবং প্রাচীন ও ঐতিহাসিক স্থানসমূহের পাদটিকা, বিশদ ব্যাখ্যা এবং তথ্যসূত্রসমূহ আপনাকে দেবে বাড়তি তথ্যের সন্ধান। আচিক গারোদের বিভিন্ন প্রথা, ধর্মবিশ্বাস ও নানা সংস্কারের সাথেও পরিচয় ঘটবে পাঠকের। মনোহর প্রকৃতির চিত্রকল্পাশ্রয়ী বর্ণনা একাগ্র পাঠককে মুগ্ধ করতেই পারে। শুধু ভারতীয় উপমহাদেশ নয়, তাবৎ বিশ্ব সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ বিবেচিত হবার যোগ্যতা রাখে “গারো লোককাহিনি” শীর্ষক গ্রন্থটির অনেকগুলো গল্পই।

শিশুদের গল্পতৃষ্ণার্ত মনের তৃষ্ণা মেটানোর পাশাপাশি বড়দের বিনোদনের খোরাক ও নিজেদের পূর্বপুরুষদের  অতীত ও শেকড়ের সন্ধান দিতেও সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে বইখানি। নিজেদের পূর্বসূরিদের সাহসিকতা, বীরত্বগাঁথা, অতিথিপরায়ণতা, সমৃদ্ধ সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্য অনুপ্রেরণা যোগাতে অনুঘটক হিসেবে কাজ করতে পারে গ্রন্থটি এবং তাদের উত্তরসূরী নতুন প্রজন্মের গারো তরুণ-তরুণীদের গারোদের নিজস্ব বর্ণমালা হারানোর আক্ষেপ স্পর্শ না করে পারবে না।

বলা হয়ে থাকে, পৃথিবীর কোন অনুবাদকর্মই পরিপূর্ণ নয়, সেটা যতটা না  অনুবাদকের অনুবাদ-দক্ষতার সীমাবদ্ধতার কারণে, তার চেয়েও তা এক ভাষা থেকে অন্য ভাষায় হুবহু ভাবপ্রকাশজনিত সীমাবদ্ধতার কারণে। তবে এ বইয়ে নিজস্ব বর্ণনাগুণে, শ্রুতিমধুর শব্দবন্ধে সাজিয়ে লেখক যেভাবে গল্পগুলো লিপিবদ্ধ করেছেন, তাতে বিদগ্ধ পাঠকসমাজের হতাশ হবার সুযোগ খুবই সীমিত।

তবে বইটিতে দু’একটি নাতিদীর্ঘ গল্পের সন্নিবেশ পাঠকের মনে অতৃপ্তি আনয়ন করতে পারে। এছাড়া খুব সামান্য কিছু মুদ্রণপ্রমাদ ব্যতীত বইটির তেমন কোন অসঙ্গতি চোখে পড়েনি। চূড়ান্ত বিচারে বলা যায়, বইটি পাঠে শুধু গারো জনগোষ্ঠি নয়, সকল শ্রেণীর পাঠক চিরায়ত গারো লোকসাহিত্যের রস আস্বাদন করে সমৃদ্ধ হবেন এবং আনন্দ লাভে সক্ষম হবেন। এই আশাবাদ যে একেবারে অমূলক হওয়ার নয় তা বইটি পাঠমাত্রই পাঠক অনুধাবন করে থাকবেন।

আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসের বহুমাত্রিকতা, উদযাপনের রকমফেরে কোভিড-১৯ এর প্রভাব ও কিছু স্মৃতিচারণ ।।  মিঠুন কুমার কোচ

কোচ ভাষায় বঙ্গবন্ধুকে নিবেদিত কবিতা

সি আর দত্ত  আমার শিক্ষক, আমার অভিভাবক ছিলেন ।।  রেমন্ড আরেং




সম্পাদক : মিঠুন রাকসাম

উপদেষ্টা : মতেন্দ্র মানখিন, থিওফিল নকরেক

যোগাযোগ:  ১৯ মণিপুরিপাড়া, সংসদ এভিনিউ ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৫। 01787161281, 01575090829

thokbirim281@gmail.com

 

থকবিরিমে প্রকাশিত কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। Copyright 2020 © Thokbirim.com.

Design by Raytahost