Thokbirim | logo

১লা আষাঢ়, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ | ১৫ই জুন, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

নাচ

প্রকাশিত : জুলাই ১৬, ২০২০, ১৯:৫১

নাচ

গারো আদিবাসী সমাজে কবে থেকে নৃত্যের প্রচলন হয়েছিল তার কোনো সঠিক ইতিহাস ও তথ্য পাওয়া যায় না। তবে তাদের নৃত্যের ঢং এবং গতি প্রকৃতি উপকথা ও কিংবদন্তি পর্যালোচনা করলে জানা যায় অতি প্রাচীনকাল থেকেই অর্থাৎ মিদ্দি-মান্দিনি চাসং (দেব-দেবী) ও মানুষের যুগ থেকেই ধর্মীয় ও সামাজিক বিভিনড়ব অনুষ্ঠানে নৃত্য অপরিহার্য্য অঙ্গ হিসেবে পরিগণিত হয়ে আসছে। সাধারণত গান্না অর্থাৎ ‘নকমার (গ্রামপ্রধান) অভিষেক অনুষ্ঠানে আর যুদ্ধ বিজয়ী হলে যুদ্ধ বিষয়ক কিংবদন্তি ‘খা-সাংমা খা-মারক’ গ্রিক্কা নৃত্য অনুষ্ঠিত হতে শোনা যায়। এছাড়া গারোদের আ.সং খসি খা.ও দেনবিলসিয়া পালা-পার্বনে মাংওনা, মেংমাংখালা, মেমাংখাম (শ্রাদ্ধ) মৃতলোকের পারলৌকিক ক্রিয়া কর্মানুষ্ঠানে এবং আয়মারাং খৃত্তা, (দেবতা) দাকগিপা আমুয়া (সৃষ্টিকর্তার পূজা) সংআনি খৃত্তা ( গ্রাম্য পূজা) নকদাং গা.আ (নতুন গৃহপ্রবেশ) নকফান্থে নকগা.আ (যুবকদের নতুন গৃহ প্রবেশ) আর ওয়ানগালা (উৎসব) অনুষ্ঠানে নৃত্যনুষ্ঠান হতে দেখা যায়। গারো সমাজ নারী-পুরুষ উভয়েই নৃত্যে অংশগ্রহণ করে থাকে। কোনো কোনো নৃত্য বিশেষ শ্রেণির জন্য। যেমন-গ্রিক্কা ও চাম্বিল নৃত্য পুরুষদের। বাকি বেশির ভাগই মেয়েদের। তবে এর মধ্যে আবার অনেকেটাই নারী পুরুষ সম্মিলিত। কোনো কোনো নৃত্য সব গোত্রের পরিচিত আবার কোনো কোনোটা বিশেষ বিশেষ গোত্র কর্তৃক সংরক্ষিত। গারোদের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে নৃত্যেরই বেশি প্রধান্য দেখা যায়। তাদের এ লোক নৃত্যে একক তেমন কোনো নৃত্য নেই সবগুলিই দলীয় নৃত্য। সাম্যবাদী আদিবাসী সমাজের এই এক প্রধান লক্ষণ। সব অনুষ্ঠানেই তারা দলগত ও সমাজগতভাবে এক সাথে করে থাকে। প্রাচীন গারো খামালদের কাছে জানতে পাই এই নৃত্য তারা পেয়েছে প্রকৃতির কাছ থেকে। প্রকৃতিই তাদের সবকিছুর শিক্ষক এবং দীক্ষাগুরু।


গারোদের এই নৃত্য এবং বাদ্য যন্ত্রের আবিস্কার সম্পর্কে এক কিংবদন্তি গল্পে জানা যায় একদা পাতাল পুরির আধোআলো আধো অন্ধকারে নিজের পেটটাকে ঢাকের মত করে বাজিয়ে সিসিথপা, মুখে বাঁশির সুর করে নাসুদেঙ্গা, স্থলদেহী ফক্কা রন্দা ও পায়ে খাটো দালিং বিবস্ত্র অবস্থায় নেচে গেয়ে, দিন, মাস বছর ভুলে আমোদ ফুর্তিতে দিন কাটাচ্ছিল। তাদের আনন্দের কোনো শেষ ছিল না। ফক্কা রাজা চেংসা নকমা (পানকে․ড়ি) খাদ্যের সন্ধানে ঘুরতে ঘুরতে গভীর সমুদ্রের তলদেশ পার হয়ে সেই আনন্দ কোলাহল পরিপূর্ণ দেশে উপস্থিত হয়েছিল তাদের কা- দেখে তার আর চোখের পলক পরে না। অবাক বিস্ময়ে পর্যবেক্ষণ শেষ করে সে নিজ দেশে ফিরে এলো। ওয়াকমি.থং নামে এক বাজারের কাছে যে বিশাল জলাভূমি ছিল তারই কিনারে প্রতিদিন সকালে ও সন্ধ্যায় কখোনো ডানা মেলে, কখোনো গুটিয়ে কখোনো ডানা ঝাপটিয়ে তালে তালে কখোনোবা সামনে অগ্রাসর হয়ে, কখোনো পিছু হটে সে মনের আনন্দে লাফ ঝাপ দিয়ে বেড়াতে লাগল। সেই আনন্দ ঢেউয়ের সাথে জলাভূমির এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত পর্যন্ত ঝিকমিক করতে লাগল।

একদিন আচ্চু (নানা/দাদা) দুছেংফা ও খামছেংফা এই দুই ভাই ওয়াকমি.থং বাজারে আদা বিক্রির জন্য গিয়ে এমন আজব কাণ্ড দেখতে পেলো। অনেক সাধ্য সাধনার পর ফক্কা রাজা ছেংসা নকমা তাদের পাতাল পুরির পথ বাতলে দিল। গভীর সমুদ্রের নানা বিপদ পার হয়ে তারা সেই স্বপিড়বল পুরিতে উপস্থিত হল। দেখলো ধূপ-ধূনা জ্বেলে গে․রি (ঘোড়া সাজিয়ে নাচ) নাচ চলছে। মনযোগের সাথে নাচ শিখে তারা বাড়িতে ফিরে এলো। নাচ দেখিয়ে তারা গ্রামের লোকদের আনন্দে উদ্ধুব্ধ করলো। তাদের অনুরোধে শিক্ষা দিতে গিয়ে বাদ্যযন্ত্রের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করলো। বাঁশের চোঙ্গার দুপ্রান্তে দামিল জাংআ (এক প্রকার বুনো গাছের পাতা) গাছের পাতা লাগিয়ে সিথ্রি (বন্যলতা) দিয়ে টান টান করে বেঁধে নিল। দুহাত দিয়ে চোঙ্গার দুপ্রান্তে বাজানোর সাথে সাথে পাতা ফেটে গেলো লতাও ছিড়ে গেলো। সবশেষে বলগিপক (গামারিগাছ) গাছ কেটে, খোদায় করে গরুর চামড়া দিয়ে ছাউনি দেয়া হয়। সেটা বাজালে এত সুন্দর আওয়াজ হল যে, সালছাফা, মজিংফা, আফফা সুসিম, খুরিগিপা, মেলাদমকা সকলে খুশি হয়ে হাত তালি দিয়ে নাচতে আরম্ভ করলো। এইভাবে পৃথিবীতে বাদ্যযন্ত্র ও নাচের প্রচলন হলো। গারোদের লোক নৃত্যধারায় অনেক নৃত্য রয়েছে। গবেষকগণ এ পর্যন্ত প্রায় ৬০টির অধিক নৃত্যের কথা উল্লেখ করেছেন।

 থকবিরিম প্রকাশিত কবি মতেন্দ্র মানখিনের ‘গারো জাতির লোকায়ত জীবনধারা’ গ্রন্থের ‘  লোক- নৃত্যধারা’ অধ্যায়ের অংশ বিশেষ।

ছবি কৃতজ্ঞতা : বিরিশিরি কালচারাল একাডেমির ফেসবুক পেজ থেকে সংগৃহীত।




সম্পাদক : মিঠুন রাকসাম

উপদেষ্টা : মতেন্দ্র মানখিন, থিওফিল নকরেক

যোগাযোগ:  ১৯ মণিপুরিপাড়া, সংসদ এভিনিউ ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৫। 01787161281, 01575090829

thokbirim281@gmail.com

 

থকবিরিমে প্রকাশিত কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। Copyright 2020 © Thokbirim.com.

Design by Raytahost
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x