Thokbirim | logo

৮ই বৈশাখ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ | ২১শে এপ্রিল, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

গারো নামের ইতিবৃত্ত-১।।মণীন্দ্রনাথ মারাক

প্রকাশিত : জুলাই ১৬, ২০২০, ২৩:৪০

গারো নামের ইতিবৃত্ত-১।।মণীন্দ্রনাথ মারাক

গারোরা মঙ্গোলীয় জাতগোষ্ঠীর বৃহৎ বডো সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত। প্রাচীন প্রাগ জ্যোতিষপুর ও কামরূপ রাজ্যের, বলতে গেলে সা¤্রাজ্যের বর্তমান খাসিয়া পাহাড়ের খাসিয়ারা বাদে (যাহারা অষ্ট্রিক মনখেমর সম্প্রদায়, অবশ্য তাহারাও মঙ্গোলীয়) সব জাতিই বডো সম্প্রদায়ের অন্তর্গত। এই সম্প্রদায়ের লোকদের আর্যরা দৈত্য, দানব, অসুর ইত্যাদি আখ্যা দিত। এই জাতি দক্ষিণে সমুদ্র উপকূল পর্যন্ত বিস্তার লাভ করিয়া বসতি স্থাপন করিয়াছিল। বর্তমান আসাম, অবিভক্ত বাংলা ও উড়িষ্যায়, প্রাচীন প্রাগজোতিষপুর সাম্রাজ্যের প্রভাব ছিল। আর্যদের চাইতে চীনের সঙ্গে এই অঞ্চলের যোগাযোগ বেশি ছিল। ইতিহাস প্রমাণ দেয় যে, খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীতে আর্যবর্তে যে ষোড়শ মহাজনপদ (রাজা) ছিল তাহাতে এইসব অঞ্চলে কোনো আর্য রাজ্যের উল্লেখ নাই। সুতরাং পূর্বে এইসব অঞ্চল আর্য বিবর্জিত দেশ ছিল তাহাতে কোনো সন্দেহ নাই। প্রাগৈতিহাসিক যুগে এই অঞ্চলের অর্থাৎ প্রাগ জ্যোতিষপুরের প্রথম যে রাজার নাম পাওয়া যায়, তাহার নাম মৈরাং। ইহা একটি মঙ্গোলীয় নাম। পরবর্তীকালে হিন্দু লেখকগণ তাহার নাম দেন মহীরঙ্গ দানব। এই বংশের শেষ রাজা ঘটককে হত্যা করিয়া নরকাপুর প্রাগজ্যোতিষপুুরের সিংহাসনে আরোহন করেন। এই বংশের অনেক রাজা, দীর্ঘদিন প্রাগজ্যোতিষপুরে রাজত্ব করেন। অসুর বংশ রাজত্ব করিলেও অধিবাসীগণ অধিকাংশই ছিল দানব বংশীয়। এই দানব বংশীয় লোকেরাই পরবর্তীকালে ‘কিরাত’ জাতি বলিয়া প্রসিদ্ধ লাভ করে। প্রাচীন পুন্দ্রবর্দ্ধনের রাজা বাসুদেব ও প্রাগজ্যোতিষপুরের রাজা ভগদত্ত বিরাট কিরাত বাহিনী নিয়া কৌবর পক্ষে ভারত মহাসমরে (কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে) যোগ দেন।

নৃত্যরত গারো যুবক-যুবতী

গারোরাও ঐ সময়ে ‘কিরাত’ নামেই পরিচিত ছিল। গারোদের গল্পকাহিনি হইতে জানা যায় যে, মহাদেব (শিব) গারো মেয়ে ‘নাবারীতিরা দিপারীকে’ বিবাহ করিয়াছিলেন। কোচদের কাহিনিতেও জানা যায় যে, মহাদেব কোচ মেয়ে ‘হীরা ও জিরাকে’ বিবাহ করিয়াছিলেন। এই জন্য কোচ ও গারোরা অনেকে নিজের মহাদেবের বংশ বলিয়া থাকে। মহাদেব ‘কিরাত’ জাতির লোক ছিলেন। তিনি আর্য ছিলেন না। পণ্ডিত হরপ্রসাদ শাস্ত্রী স্বীকার করিয়াছিলেন যে, মহাদেব অনার্যদের দেবতা ছিলেন। কালে আর্যরা তাহাকে নিজ দেবতা করিয়া নিয়াছে। বৈদিক যুগে আর্যদের দেব দেবীর নামের তালিকায় মহাদেবের নাম না থাকায় তাহার এই উক্তির প্রমাণ। মহাভারতে ‘কিরাতার্জুন যুদ্ধের বিবরণ আছে। মহাদেব কিরাতরূপে অর্জুনের সঙ্গে যুদ্ধ করিয়াছিলেন এবং যুদ্ধে অর্জুনের বিক্রমে খুশি হইয়া তাহাকে পাশুপত বান উপহার দিয়াছিলেন। সুতরাং কোচ এবং গারোরা মহাভারতে বর্ণিত কিরাত জাতির অন্তর্ভুক্ত।

রামায়নেও গারোদের কিরাত জাতি বলিয়া বর্ণনা করা হইয়াছে। রামায়নে কিঙ্কান্ধ্যা কাণ্ডে সীতার অন্বেষণে পূর্বদিকে যে সৈন্যদলটি প্রেরণ করা হইয়াছে (সেনাপতি বিনোদের অধীনে) তাহাতে ঐ সৈন্য দলকে বলা হইয়াছে :-

ব্রহ্মপুত্র তরি রঙ্গে করিহ প্রবেশ।

মন্দর পর্বতে যাইও কিরাতের দেশ।।

যাইবে দশটি দেশ আর সাকদ্বীপে।

কিরাত জানিবা আছে অত্যদ্ভুত রূপে

কনকচাঁপার মত শরীর বর্ণ।

উঠাখানার মত ধরে দুই কর্ণ।

থালাহেন মুখখান তাম্র্রবর্ণ কেশ।

একপায়ে চলে পথ বিক্রমেতে বিশেষ।।

জলের ভিতর বৈসে মৎস্যবৎ মুথ।

মানুষ ধরিয়া খায় আইসে সম্মুখ।।

বলিয়া মানুষ ব্যাঘ্র তাহাদের খ্যাতি।

আতপ সহিতে নারে কিরাতের জাতি।।

সীতা লৈয়া থাকে যদি কিরাতের ঘরে।

যত্ন করি চাহিও তথায় লঙ্কেশ্বরে।।

এখানে ব্রহ্মপুত্র নদ পাড় হওয়ার পর যে পর্বত বা পাহাড় সম্মুখে পড়ে তাহাই গারো পাহাড়। এই গারো পাহাড়ের একটি চূড়া কোয়াশিমিন্দ্রি। এই মিন্দ্রিকেই মন্দর বলা হইয়াছে। ইহা ছাড়া আরও দুইটি মন্দর পর্বতের নাম পাওয়া যায়। একটি হিমালয়ে ও অপরটি গঙ্গার দক্ষিণে বিহারের ভাগলপুর জেলায়। এই দুইটি পর্বতে যাইতে হইলে ব্রহ্মপুত্র নদপাড় হইতে হয়। সুতরাং নিশ্চিতভাবে ঐ মন্দর পর্বত গারো পাহাড়কেই বুঝাইয়াছে এবং গারোকেই কিরাত জাতি বলিয়াছে। উক্ত বর্ণনায় কানকে উঠানের মত বড় বলা হইয়াছে। কারণ গারোরা প্রাচীনকালে কানের উপরে ও নিচে অনেক অলঙ্কারাদি পড়িত বলিয়া কান বড় দেখাইত। তদুপরি পূর্বে গারোদের বিশ্বাস ছিল যে, গারোরা দিনে মানুষ হইয়া রাত্রে বাঘ হইতে পারিত বা একই সময়ে মানুষ ও বাঘ দুই জীবনের অধিকারী হইত। গারো ভাষায় ইহাকে বলা হইত “মাচ্ছাদু মাচ্ছাবেত”

গারো নারী

বহু দেশি ও বিদেশি লেখকগণ কাশ্মীরের কলতিস্থান, লাজক, সমগ্র হিমালয়ের পাদদেশ, সমগ্র আসাম, অবিভক্ত বাংলার উত্তর ও পূর্বাংশকে বডো ভাষা গোষ্ঠীর কিরাত জাতির বাসস্থান ছিল বলিয়া স্বীকার করিয়াছেন। বর্তমান পশ্চিমবঙ্গ ও উড়িষ্যায় কিরাত জাতির যে সমস্ত লোকেরা এখন মূল জাতি হইতে বিচ্ছিন্ন হইয়া রহিয়াছে এবং নিজেদের প্রাচীন ভাষা পরিত্যাগ করিয়া মিশ্র ভাষা ব্যবহার করিতেছে তাহাদের ‘কিরাস্তি’ বলা হইতেছে।

প্লিনি গারো পাহাড়কে মালেয়াস পাহাড় এবং এই পাহাড়ের অধিবাসীদের মান্দাই (মান্দি, মান্দাই=মানুষ) বলিয়াছেন (মেগাস্থিনিস ও এরিয়ান)। টলেমির ভূগোল পুস্তকে কিরাত জাতির সঙ্গে গারিওনি জাতির উল্লেখ করিয়াছেন। তিনি গারো পাহাড়কে মৈরন্তম পর্ব্বত বলিয়াছেন। তিনি হয়তো রামায়নে উল্লিখিত মন্দর বা মিন্দ্রিকে মৈরন্তম পর্ব্বত বলিয়াছেন। তিনি পাটালিপুত্রে থাকিয়াই অত্রাঞ্চলের তথ্যাদি সংগ্রহ করিয়াছিলেন। তাই জাতির নাম ও স্থানের নামগুলি অপভ্রংশ হইয়াছে। খুব সম্ভব ‘গারো’ নাম লোক মুখে শুনিয়া এবং অপভ্রংশ করিয়া ‘গারো’ শব্দকে ‘গারিওনি’ লিখিয়াছেন। টলেমির জীবনকাল ছিল খৃষ্টীয় দ্বিতীয় শতাব্দী। আর প্লিনি যিনি তাহার ‘নেচারাল হিস্ট্রিতে’ গারোদের মান্দাই বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন। তাহার জীবনকাল ছিল খৃষ্টীয় প্রথম শতাব্দী।

এই উপমহাদেশের সব আদিবাসীদের নাম নিজেদের দেওয়া বা নেওয়া নাম নহে। পরবর্তীকালে যে সমস্ত জাতি এই উপমহাদেশে আসিয়াছে তাহাদের দেওয়া নামেই আদিবাসী পরিচিত হইতেছে। এইসব নামের উৎপত্তি কাল নিয়া নানা মতভেদ থাকিবেই। তবু এইসব নামেই তাহারা ভবিষ্যতেও পরিচিত হইবে তবে স্বীকার করিতে হইবে যে, এইসব নাম পরিচয় দীর্ঘকালের। টলেমির ভূগোল পুস্তকে গারো নাম খৃষ্টীয় দ্বিতীয় শতাব্দীতে প্রকাশিত হইয়াছে। মৈমনসিংহ গীতিকা গুলি চতুর্দশ হইতে ষোড়শ শতাব্দীতে লেখা। এইসব গীতিকা গুলিতেও মাঝে মাঝে ‘গারো’ নামের উল্লেখ আছে।

উত্তরে না গারো পাহাড় ছয়মাস্যা পথ।

তাহার উত্তরে আছে হিমানী পর্বত।।

 

দস্যু কেনারামের পালায় উল্লেখ আছে:

গারুয়া পাহাড় হইতে দক্ষিণ সাগর।

ঘরবাড়ি নাহি কেবল নল খাগড়ার ঘর।।

এইসব ছাড়াও ‘রাজা রঘুর পালা’ “বাংলার পুরনারী” পুস্তকের ‘রাণী কমলাতে’ ‘গারো’ জাতির উল্লেখ রহিয়াছে। ড. দীনেশ চন্দ্র সেন “মৈমনসিংহ গীতিকায়” পূর্ব মৈমনসিংহের রাষ্ট্রীয় অবস্থা বর্ণনা প্রসঙ্গে বলিয়াছেন “প্রাগজ্যোতিষপুরের অবনতির পরে, পূর্ব মৈমনসিংহ কতগুলি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র স্বাধীন রাজ্য পরিণত হয়। রাজবংশীয়, কোচ এবং হাজং প্রভৃতি শ্রেণীয় লোকেরা এই সমস্ত ক্ষুদ্র রাজ্য শাসন করিতেন। ১২৮০ খৃ: সোমেশ^র সিংহ নামক এক ব্রাহ্মণ যোদ্ধা কোচ রাজবংশীয় বৈশ্য গারো নামক রাজার অধিকৃত সুসংঙ্গ দুর্গাপুর রাজ্য কাড়িয়া লইয়াছিল। উক্ত বর্ণনা অনুসারে বুঝা যায় যে, গারোদের রাজবংশী, কোচ ইত্যাদি নামেও অভিহিত করা হত।

লেখক মণীন্দ্রনাথ মারাক

চলবে…




সম্পাদক : মিঠুন রাকসাম

উপদেষ্টা : মতেন্দ্র মানখিন, থিওফিল নকরেক

যোগাযোগ:  ১৯ মণিপুরিপাড়া, সংসদ এভিনিউ ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৫। 01787161281, 01575090829

thokbirim281@gmail.com

 

থকবিরিমে প্রকাশিত কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। Copyright 2020 © Thokbirim.com.

Design by Raytahost