Thokbirim | logo

২০শে ফাল্গুন, ১৪৩০ বঙ্গাব্দ | ৪ঠা মার্চ, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

গারো মিথ।। হরিণ শিশু

প্রকাশিত : জুলাই ০৭, ২০২০, ১৪:৪১

গারো মিথ।। হরিণ শিশু

গারো জাতিসত্তার লোকবিশ্বাসকে যেমন বলা যায় আশ্চর্যের তেমনি বলা যায় চমকপ্রদও । দ্বৈতজীবনের বিশ্বাস গারোদের যাপিতজীবনের সাথে ওতোপ্রতোভাবে জড়িয়ে আছে। গারোরা যেমন বিশ্বাস করে ডাকিনী-যোগিনী, ভূত-প্রেত তেমনি বিশ্বাস করে থাকে জাদু-তুনা, মন্ত্র-তন্ত্রে। তেমনিভাবে তারা দ্বৈত্যজীবন লাভকে গভীরভাবে বিশ্বাস করে থাকে। গারোদের মতে কেউ কেউ মাৎচা ফিললে (বাঘ হয়ে) কেউ কেউ চিপফু(সাপ), কেউ কেউ মাৎচক(হরিণ) কেউ আরিংকা(কুমির) কেউ আবার মাৎফু’র(গুইসাপ) জীবন নিয়ে জন্ম গ্রহন করে। তাদের বিশ্বাস মানুষ দুইভাবে দ্বৈতজীবন লাভ করতে পারে। ১ জন্মগতভাবে ২ জন্মের পর (স্বপ্নের মাধ্যমে)। যে শিশু দৈতজীবন নিয়ে জন্মগ্রহন করে শৈশবকালে সে যে জীবন নিয়ে জন্মেছে সেই জীবনের নানা বৈশিষ্ট্য প্রকাশ হতে থাকে। যেমন যে শিশু বাঘের জীবন নিয়ে জন্ম গ্রহন করে সে ছোটকাল থেকেই তার দুই কান নাড়াতে পারে, বড় বড় খাল একলাফে পার হতে পারে, সুপারি-আম-জাম গাছে বা উঁচু কোনো গাছে উঠতে পারে খুব সহজেই, কাউকে ভয় করে না বরং কেউ ধমক দিলে উল্টা তাকে দেখে নেয়ার ভয় দেখায়। কথিত আছে, যে ছেলে বাঘের জীবন নিয়ে জন্মগ্রহন করে তার পাছায় লেজের মতো চিহ্ন থাকে। সবার বিশ্বাস ছেলেটি বড় হলে সেই চিহ্নটিও বড় হয়। আবার গারোদের বিশ্বাস জন্মের পরও একটি শিশু দ্বৈতজীবন লাভ করতে পারে। তাদের বিশ্বাস মতে, যে শিশু যে জীবের জীবন লাভ করবে সে সেই জীবের আচরণ, জীবন প্রণালী স্বপ্নের মাধ্যমে শিখে থাকে বা স্বপ্নে তাকে শিখানো হয়। যেমন কেউ যদি বাঘ হতে চায় তাহলে সে স্বপ্নে বড় বড় খাল লাফ দিয়ে পাড় হবে, ঘরের ধননা-চাল এইসব জায়গায় লাফালাফি-উঠাউঠি করে, এর ফলে সে ঘুম থেকে ক্লান্ত হয়ে ঘেমে জেগে উঠবে। স্বপ্নের ঘোরে কান নাড়বে, বাঘের মতো শব্দ করবে। জন্মগতভাবে যে শিশু দ্বৈতজীবন লাভ করেছে সেই শিশুটির আশপাশ সে যে জীবন নিয়ে জন্মেছে সেই জীবনের প্রাণীকে সেই ছেলের সাথে ঘুরঘুর করতে দেখা যায়। কিংবা সেই প্রাণি সেই ছেলের সাথে খেলবে বা রাতের আঁধারে সেই ছেলের কাছে আসবে। আর ছেলের সাথে থাকা সেই প্রাণীকে আঘাত করলে বা ভয় দেখালে ছেলেটিও  আঘাত পাবে বা ভয় পাবে। তখন মা বাবাকে স্বপ্নে সেই প্রাণী বলে যে, সে তারই ছেলে, তাকে আঘাত করে তারা ভুল করছে বা তাকে আঘাত করলে তার ছেলেও মারা যাবে বা আঘাত পাবে। আবার যে শিশু কুমিরের জীবন নিয়ে জন্মে সে ছোটবেলা থেকেই সাঁতার বা পানিতে অনেক্ষণ ডুবে থাকতে পারে। কিংবা পানিতে নামার সাথে সাথে তার কাছে কুমির চলে আসে, খেলা করে। থকবিরিম পাঠকদের জন্য হেমারসন হাদিমা কর্তৃক সংগৃহীত দ্বৈতজীবনের গল্প ধারাবাহিক প্রকাশ করা হলো। আজকে দ্বিতীয়-পর্ব।

হরিণ শিশু

ভারতের মেঘালয় রাজ্যের গারো হিলস জেলার সমৃদ্ধ গ্রাম বা উপ-শহর নিশান গ্রাম। সেখানে বাস করেন সম্ভ্রান্ত এক ব্যক্তি। স্ত্রী আর পাঁচ সাত বছর বয়সের এক ফুটফুটে মেয়েকে নিয়ে তার সুখের সংসার। তিনি সে গ্রামের মণ্ডল। গারো হিলসের প্রশাসনিক দপ্তরে মণ্ডল হচ্ছে- গ্রাম প্রশাসনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ পদ। গ্রাম্য প্রশাসনের নির্ধরিত দায়িত্ব পালন সম্পর্কিত মাসিক প্রতিবেদন জেলা প্রশাসনকে দিতে হয়। এ জন্য মাসে কমপক্ষে একবার জেলা সদর শহর টুরায় যেতে হয়।

এক সময় মণ্ডলবাবু তার মাসিক রিপোর্ট দাখিল করার জন্য টুরা যান। অফিসের সব কাজ সেরে, মাসের পাওনা নিয়ে বাড়ি ফেরেন। বাড়ি ফেরার জন্য এখনকার মত তৎকালে এত যানবাহন ছিল না। তাই দীর্ঘ পথ পদব্রজেই পাড়ি দিতেন। পাহাড়ি, চড়াই-উৎরাই পথ- কমপক্ষে দুদিন লাগে হাঁটতে। পায়ে হাঁটা মান্দিদের মজ্জাগত অভ্যাস। অসুবিধা হয় না। সাথে থাকে মিশাল অর্থাৎ দুপুরের খাবার। মিশালের খাদ্য তালিকায় থাকে মিমল (বিন্নি চালের ভাত), বাঁশের চোঙায় নাখাম মিচি (শুটকি মাছের ঝোল) আর ফং এ (লাউ এর খোল) ভরা থাকে চু। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে যাতে অসুবিধা না হয় সে জন্য এসব রাস্তার ধারে থাকে আলদা বা সরাইখানা। মণ্ডলবাবু এ ক-রাত একরকম আলদায় কাটিয়ে পরদিন আবার যাত্রা করেন। দ্বিতীয় দিন বিকেলে স্থানীয় সময় ৪/৫টায় বাড়ি পৌঁছেন।

বাড়ি থেকে প্রায় মাইল সাতেক দূরে থাকতে এক জায়গায় তিনি দেখতে পেলেন একটা ছোট্ট হরিণ শিশু তার আগে আগে লাফাতে লাফাতে যাচ্ছে। মণ্ডল খুশি হলেন। কারণ হরিণটা তাকে ভয় না করেই খুব কাছে কাছে লাফালাফি করে যাচ্ছে। মণ্ডল ভাবলেন আজ তার ভাগ্য ভাল। ইচ্ছে করলে এখনই তার হাতের লাঠি দিয়ে হরিণ শিশুটিকে মেরে ফেলতে পারেন। আবার আরেক মনে এও ভাবলেন, ‘আহা! কী সুন্দর বাচ্চা! একে না মেরে জ্যান্ত ধরে নিয়ে গিয়ে পালন করবেন।’

অতএব মণ্ডল ঐ হরিণ শিশুটিকে জ্যান্ত ধরার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করলেন। কিন্তু, কোনমতেই সে ধরা দিচ্ছে না। এই করে প্রায় মাইল দুই এগুলেন। কিন্তু হরিণ শিশু জঙ্গলে পালিয়েও যায় না- ধরাও দেয় না। অগত্যা, শিকার হাতছাড়া হয় দেখে মণ্ডল তার হাতের লাঠি ছুঁড়ে মারেন হরিণ শিশুটিকে লক্ষ্য করে। অভ্যস্থ হাতের নিশানা! ঠিক হরিণ শিশুর ঘাড়ে লাঠি লেগে তৎক্ষণাৎ সে মারা গেল। তখন বেলা একটা বাজে। মণ্ডলের একটু কষ্ট হল। এত সুন্দর বাচ্চাটাকে মারতে হল এজন্য। তিনি হরিণ শিশুটিকে নিজের কাঁধে নিয়ে বাকি মাইল চারেক পথ হেঁটে বাড়ি পৌঁছালেন।

মণ্ডল তার বাড়ি থেকে কিছু দূর থাকতে দেখতে পান বাড়ির উঠানে অনেক লোক। কাছাকাছি যেতেই তিনি আঁতকে উঠেন। এ-যে কান্নার রোল! অতি দ্রুত বাড়ি গিয়ে শুনলেন, তার মেয়ে মারা গেছে। মণ্ডল তার হাতের লাঠি, পিঠের বোঝা আর ঘাড়ের হরিণ শাবক ফেলে দিয়ে মৃত মেয়েকে কোলে নিয়ে নিলেন। বেলা তখন তিনটা বাজে। দেখা গেল মেয়েটির দেহ এখনও তপ্ত এবং নরম। জিজ্ঞেস করে জানতে পারলেন ঠিক একটার সময় মেয়েটি মারা যায়। কীভাবে? কেউ বলতে পারে না। সে সময় মেয়েটি তার কয়েকজন খেলার সাথী নিয়ে লাফালাফি করে গুটি খেলছিল। সেই অবস্থায়ই হঠাৎ ‘মা’ বলে চিৎকার করে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে।

মণ্ডলের আর বুঝতে বাকি রইল না। তিনি ঠিক একটার সময় পথে হরিণ শিশুটিকে বধ করেছিলেন। তার আফসোস- কেন যে তিনি হরিণটাকে মারলেন! লোকে সিদ্ধান্ত দিল- মেয়েটির দ্বিতীয় আত্মা ছিল হরিণের। বলা বাহুল্য, মেয়েটির সাথে হরিণ শিশুটিকেও কবর দেয়া হল।

ছবি : সংগৃহীত




সম্পাদক : মিঠুন রাকসাম

উপদেষ্টা : মতেন্দ্র মানখিন, থিওফিল নকরেক

যোগাযোগ:  ১৯ মণিপুরিপাড়া, সংসদ এভিনিউ ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৫। 01787161281, 01575090829

thokbirim281@gmail.com

 

থকবিরিমে প্রকাশিত কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। Copyright 2020 © Thokbirim.com.

Design by Raytahost