Thokbirim | logo

২৯শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ | ১২ই জুন, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

বাংলা একাডেমি নানা অনুষ্ঠানে  আদিবাসী লেখকদেরকে সুযোগ দেয়া উচিত । । বাঁধন আরেং

প্রকাশিত : ফেব্রুয়ারি ০৫, ২০২০, ১১:৪৬

বাংলা একাডেমি নানা অনুষ্ঠানে  আদিবাসী লেখকদেরকে সুযোগ দেয়া উচিত । । বাঁধন আরেং

বাঁধন আরেং একজন লেখক ও গবেষক ও সমাজকর্মী। তিনি শেরপুর জেলার শ্রীবরদী উপজেলাধীন ছোট্ট একটি পাহাড়ি গ্রাম বালিজুরীর স্থায়ী মানুষ তবে বর্তমানে স্বপরিবারে ঢাকার বাসিন্দা। তিনি স্থানীয় পর্যায়ে বিভিন্ন স্মরণিকা ও ম্যাগাজিন ছাড়াও জাতীয় দৈনিক পত্রপত্রিকায় লেখালেখি করেন। নিজের প্রকাশিত বই ছাড়াও কয়েকটি প্রবন্ধ সংকলন রয়েছে। সমতলের হাজং ও পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকার খুমি আদিবাসীদের নিয়ে লেখা দুটি প্রোফাইল আছে। গারো শিশুদের জন্য তাদের মাতৃভাষায় লেখা দুটি শিশুতোষ বই প্রকাশিত হয়েছে। বর্তমানে গারো ভাষার কয়েকটি বই সম্পাদনার কাজ করছেন। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড-এর তত্ত্বাবধানে পাঁচটি আদিবাসী ভাষাভাষি শিশুদের জন্য মাতৃভাষায় শিক্ষা কার্যক্রম বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সরকারীভাবে শিক্ষা উপকরণ তৈরী কার্যক্রমের গারো ভাষার তিনি একজন মনোনীত লেখক।

থকবিরিম : আদিবাসী লেখক হিসেবে অমর একুশে বইমেলা নিয়ে আপনার ভাবনা কেমন? এই নিয়ে কোনো প্রস্তাবনা?

বাঁধন আরেং: প্রথমেই ১৯৫২-এর ২১শে ফেব্রুয়ারি  দিনে বাংলাভাষার জন্য জীবন উৎসর্গকারী ভাষা শহীদদের অমর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই। একসময় ভাবা হত একুশে ফেব্রুয়ারী শুধু মাত্র বাংলাভাষা ও বাঙালিদের জন্য। কারণ বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবীর উপর ভিত্তি করেই অমর একুশের সৃষ্টি হয়। এরই ফলশ্রুতিতে ভাষা শহীদদের আত্মত্যাগের প্রতি সম্মান প্রদর্শন ও একটি জাতির ভাষার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা জীবন্ত ও চলমান রাখার তাগাদা থেকেই আমার মনে হয় অমর ২১শে ফ্রেব্রুয়ারী উপলক্ষ্যে মাসব্যাপী বইমেলার আয়োজন করা হয়ে থাকে। এভাবে বাঙালিদের নেতৃত্বে বাংলাভাষার মাধ্যমেই পৃথিবীর সকল মানুষের ভাষা সম মর্যাদা ও সম্মানে স্বীকৃত হয়। আমি সৌভাগ্যবান বাংলাদেশে জন্মগ্রহণ করেছি। যে দেশ থেকে পৃথিবীর সকল মানুষের ভাষার সম্মান ও সমমর্যাদার আহবানের কণ্ঠস্বর ধ্বনিত হয়েছে। জীবন দিয়ে বাংলাভাষি মানুষেরা নিজ ভাষার মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছে। বিশ^ সম্প্রদায় ১৯৫২ সালের একুশে ফ্রেব্রুয়ারী ঢাকার রাজপথে বাংলাভাষা প্রেমীদের অকাতরে জীবন দানের ঘটনার গুরুত্ব ও তাৎপর্য অনুধাবন করতে পারে। ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেস্ক (UNESCO)  আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসাবে অমর একুশে ফেব্রুয়ারী দিনটিকে ঘোষণা দেয় এবং জাতিসংঘের সকল সদস্য রাষ্ট্রের প্রতি দিবসটি যথাযোগ্য মর্যাদায় উদযাপনের জন্য আহবান জানায়। সেদিন থেকেই পৃথিবীর সকল ভাষা সম্মান ও মর্যাদার অন্যমাত্রায় প্রতিষ্ঠিত হয়। গর্ব ও সম্মানে বুক ভরে যায় আমার মাতৃভাষা গারোও এর অংশীদার। সাথে দেশের প্রতি দায়িত্ব অনুভব করি। ভাষা, সাহিত্য, শিল্প-সংস্কৃতি ও সম্পৃতির বন্ধনে মিলেমিশে একসাথে সামনে এগিয়ে চলার খুব ইচ্ছে হয়, স্বপ্ন দেখি।

 

গারো ভাষায় লেখালেখির কাজ এগিয়ে নিতে চাই। বই মেলায় গারো ভাষার বই দেখতে চাই। একা না পারলেও কয়েকজন মিলে স্টল নিয়ে গারো ভাষার বই তুলে ধরতে চাই।

থকবিরিম : কবিতা উৎসব কিংবা বইমেলাতে আদিবাসী কবি-লেখকদের অংশগ্রহণ কেমন?

বাঁধন আরেং: আগে বেশ কয়েকবার জাতীয় কবিতা উৎসবে আমাকে ডেকেছিল এবং আমি অংশগ্রহণ করেছিলাম। একবার আমাকে একটি ক্রেস্টও দিয়েছিল, সেটি সযত্নে রেখে দিয়েছি। এসব অনুষ্ঠানে আদিবাসী কবি ও লেখকদের অংশগ্রহণ করা উচিত। তবে খুব বেশি গুরুত্ব বা মর্যাদা দেয় এমন মনে হয়না তবুও প্রতিনিধিত্ব করা প্রয়োজন। কারণ অংশগ্রহণ না করলে জানা যায়না। তাছাড়া আমাদের নিজেদেরও শুধু কবিতা উৎসব নয় ভাষা, সাহিত্য, শিল্প-সংস্কৃতি বিষয়ক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা উচিত। প্রথমদিকে মানুষের সাড়া নাও পাওয়া যেতে পারে তবে একদিন মানুষ সাড়া দেবেই।

অনেক আদিবাসী লেখক, কবি, সাহিত্যিক এবং বুদ্ধিজীবিরা প্রতি বছরই বই মেলায় যান এবং বই কেনেন। কিন্ত নিজেদের প্রকাশনা থাকেনা। তবে ইদানীং অনেকেই মেলা উপলক্ষে বই প্রকাশ করছে। এটা ভাল লক্ষণ। তবে নিজের ভাষায় বই প্রকাশ করা উচিত। এবিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে সকলের ভাবা প্রয়োজন। একুশে বইমেলা উপলক্ষ্যে ভাষা, সাহিত্য, শিল্প-সংস্কৃতি, ইতিহাস, ঐতিহ্য ইত্যাদি বিষয় নিয়ে বাংলা একাডেমি সেমিনার অয়োজন করে থাকে। এসব অনুষ্ঠানের  কার্যক্রমেও আদিবাসী কবি ও লেখকদের অংশগ্রহণ করা উচিত। কারণ আমরাও এদেশের নাগরিক। আমাদের বিষয়েও দেশের সকল সাধারণ মানুষের জানা প্রয়োজন। অমর একুশে বা বইমেল উপলক্ষ্যে বাংলা একাডেমি আয়োজিত কোনো অনুষ্ঠানে এ পর্যন্ত কোনো আদিবাসী অংশগ্রহণ করে অবদান রেখেছে কিনা আমার জানা নেই।

 থকবিরিম : বইমেলাতে আপনার কী বই আসছে? কোন প্রকাশনী থেকে আসছে?

বাঁধন আরেং: না, বইমেলাতে আমার কোনো বই আসছেনা। নানান সমস্যা ও আর্থিক সংকটের কারণে প্রকাশ করতে পারছিনা।

থকবিরিম : আগের বইমেলাতে যে বই প্রকাশ হয়েছে তার পাঠক সাড়া কেমন?

বাঁধন আরেং: আগের বই মেলাগুলোতেও আমার কোনো বই প্রকাশিত হয়নি। তবে আমার প্রকাশিত বই আছে। গারো শিশুদের জন্য মাতৃভাষায় দুটি শিশুতোষ বইও আছে। এছাড়াও শ্রদ্ধেয় কবি মতেন্দ্র মানখিনের গারো ভাষার কবিতার একটি বই ও বন্ধুবর তর্পণ ঘাগ্রার তথ্য সংগ্রহ ও গ্রন্থনায় গারো পৌরাণিক গল্পের দুটি বই আমি সম্পাদনার কাজ করছি। আমার লেখা গবেষণাধর্মী। এসবে সাধারণ মানুষের খুব বেশী আকর্ষণ থাকেনা। তাছাড়াও ইদানীং আমি গারো ভাষায় লিখি। গারো ভাষার পাঠক এখনো তৈরী করতে পারিনি। তবে দৈনিক পত্রিকায় লেখায় অনেক প্রশংসা ও উৎসাহ পেয়েছি এখনো পাচ্ছি। দেশের বাইরের বিশ^বিদ্যালয়, সমাজকর্মী, গবেষক, লেখক ছাড়াও দেশের পাঠকদের উচ্চসিত প্রশংসা পেয়ে থাকি। এমনকি উপহারও পেয়েছি। দেশের একপ্রান্ত থেকে একজন আদিবাসী লেখককে উপহার পাঠানো সত্যিই তাৎপর্য ও গুরুত্বপূর্ণ। একজন লেখক হিসাবে আমি বুক ভরা আনন্দ, সম্মান ও মর্যাদ উপলদ্ধি করি। আমার সেই পরম শ্রদ্ধেয় পাঠকের প্রতি মাথা নত করে আমি সম্মান জানাই।

 থকবিরিম : বই প্রকাশের আগের আর পরের জীবন সম্পর্কে মূল্যায়ন কেমন? বিশেস করে আদিবাসী সমাজে? বন্ধুবান্ধব কেমন দেখছে আপনাকে?

বাঁধন আরেং: আদিবাসী সমাজের সাধারণ মানুষজন যারা লেখালেখি করে তাদের এমনিতে সম্মান করে। স্বাভাবিকভাবে বলা যায় লেখকদের সামাজিক মর্যাদা আছে। কিন্ত বাস্তব প্রেক্ষাপট ভিন্ন। দেখা যায় লেখালেখির মানুষেরা আর্থিক সংকট ও দৈনতায় ভোগে। এসব কারণে অনেকে লেখালেখি ছেড়ে দেয়। লেখকদের সময়, মেধা, শ্রম ও সৃষ্টিশীলতার মূল্যায়ন করা হয়না। অথচ তাদের লেখা ছাপা হয়, বলা হয় লেখকেরা সমাজের বিবেক। কথাটা শুনতে ভালই লাগে। কিন্ত অর্থবিত্তহীন মেধাবী, সৃষ্টিশীল লেখকের সামাজিক স্থান ও মর্যাদা আমি খোঁজে পাইনা। বই ছাপতে টাকার প্রয়োজন। টাকা ছাড়া বই হয়না। অথচ আদিবাসী সমাজের মানুষেরা আদিবাসী লেখকদের একটি বই কেনেনা। তবে অন্যদের বই কেনে, গর্ব করে গল্পও করে। সমাজের মানুষের প্রতি বিষয় সম্পর্কে ভেবে দেখার বিনীত আহবান জানাই।

বই প্রকাশের আগে লেখাটাকেই বড় করে দেখতাম। কিন্ত দুএকটি বই প্রকাশ হওয়ার পর দায়িত্ব বিষয়টাকেই বড় করে দেখি। কারণ আমি মনে করি লেখার কাজ একটি দায়িত্ব। তাই চেষ্টা করি লিখে সমাজ ও জাতির প্রতি দায়িত্ব পালনের।

   থকবিরিম : আপনার লেখালেখি শুরু কীভাবে?

বাঁধন আরেং: ছোটবেলায় বাবা বাজার থেকে কাগজের ঠোঙায় সদায় নিয়ে আসত। সে ঠোঙায় কিছু লেখা থাকলে মা আমাকে পড়ে বুঝিয়ে দিত। আর সুন্দর করে কাগজ ভাজ করে এক জায়গায় রেখে দিয়ে মা বলত, বড়  হয়ে তুমি পড়বে, আমি রেখে দিলাম। বাবা স্কুল শিক্ষক ছিলেন। গ্রামের মানুষের সুবিধা এবং পরামর্শ অনুযায়ী বছরের চাষাবাদের সময় বিকালে স্কুল করতেন। সকালে হালচাষ করে এসে বাবা বই পড়তেন। অন্য বাবাদের দেখতাম জমিতে কাজ করে দুপুরে শুয়ে বিশ্রাম করতেন। আর বাবা বই পড়ে বিশ্রাম করতেন। বাবাকে কোনোদিনই দুপুরে ঘুমুতে দেখিনি। এভাবে হাইস্কুলে পড়ার সময় থেকে আমার মধ্যে বই পড়ার প্রবণতা কিভাবে যেন হয়ে ওঠে। বুঝতে পারিনি। ক্লাশ এইটে পড়ার সময় থেকে মিশনে নানান অনুষ্ঠানের সংবাদ সাপ্তাহিক প্রতিবেশীতে লিখে পাঠাতাম। যখন দেখতার আমার লেখা ছাপা হয়েছে খুব ভাল লাগত। কলেজের দেয়াল পত্রিকা ও মেগাজিনে আমার লেখা কবিতা ছাপত। সাপ্তাহিক প্রতিবেশীতে আমার কবিতা প্রকাশ হতে থাকে। প্রতিবেশীতে লেখার ক্ষেত্রে প্রয়াত দুজন পরম শ্রদ্ধেয় মানুষ রেভা: ফাদার জ্যোতি এফ: গমেজ ও পরম শ্রদ্ধেয় তৎকালে রমনা ইন্টারমিডিয়েট সেমিনারির রেক্টর রেভা: ফাদার ফ্রান্সিস এ. গমেজ (পরবর্তীতে ময়মনসিংহ ধর্মপ্রদেশের বিশপ) আমাকে উৎসাহ দিয়েছিলেন। রমনা সেমিনারিতে থাকার সময় প্রতিবেশীতে যে সপ্তায় আমার লেখা থাকতনা ফাদার ফ্রান্সিস আমাকে অফিসে ডেকে জিজ্ঞাসা করতেন “তোমার লেখা এ সপ্তায় আসেনি কেন?” এমন প্রশ্নের মুখোমুখি আমাকে প্রায় সময়ই হতে হয়েছিল।

আমার নিজেরও ইচ্ছা ছিল। এভাবে মানুষের ভালবাসা, প্রেরণা ও সহযোগিতায় আস্তে আস্তে লেখায় মনোনিবেশ করতে থাকি। আর এভাবেই লেখার কাজ চালিয়ে যাচ্ছি।

 থকবিরিম : আপনার সময়ে কারা লিখতো?এখন কি তারা লিখছে?

বাঁধন আরেং: গারোদের মধ্যে ছোট বেলা থেকেই শ্রদ্ধেয় মতেন্দ্র মানখিন ও জেমস জর্নেশ চিরানের লেখা কবিতা পড়ে আসছি। প্রয়াত বিধি পিটার দাংগ এর লেখা গল্প পড়তাম। এর পরে মনিন্দ্রনাথ রংমা, সুভাষ জেংচাম, নিখিল হাজং, ফাদার ক্লেমেণ্ট রিছিল, নিখিল হাজং প্রমুখদের লেখা পড়তাম। পরবর্তীতে বাবুল ডি নকরেক, লিপা চিসিম, গৌরব জি. পাঠাং, হিমেল রিছিল, থিওফিল নকরেক, মিঠুন রাকসাম ও আরো অনেকের লেখা পড়েছি। তবে তারা কেউ গারো ভাষায় লিখতনা। শ্রদ্ধেয় কবি মতেন্দ্র মানখিনের লেখা গারো ভাষার কালজয়ী বেশ কয়েকটি গান ও কবিতা রয়েছে। এছাড়া অন্য লেখক ও কবিদের গারো ভাষায় লেখা কবিতা বা গল্প দেখা যায়নি। প্রতিবেশী ভিত্তিক যাদের লেখা পড়তাম তারা হলেন, নিধন ডি. রোজারিও, জেরোম ডি. কস্টা, আলেকজান্ডার রোজারিও, হেলেন রোজারিও এভাবে আরো অনেকের লেখা পড়তাম। জাতীয় পত্রপত্রিকায় লিখে চলেছেন সঞ্জীব দ্রং। এছাড়াও যারা লেখা চালিয়ে যাচ্ছেন তারা হলেন, শ্রদ্ধেয় কবি মতেন্দ্র মানখিন, সুভাষ জেংচামসহ অনেকেই।

থকবিরিম : লেখালেখিকে সচল রাখার উপায় কি?

বাঁধন আরেং: লেখার কাজ অব্যাহত রাখা ছাড়া লেখা সচল থাকতে পারেনা। এর জন্য পড়াশুনা করতে হয়। পড়াশুনা লেখার শক্তি যোগায় চিন্তায় শুদ্ধতা আনে। সুতরাং পড়াশুনা ও লেখা দুটোকে আলাদা করে দেখা যায়না।

থকবিরিম : লেখালেখি করতে গিয়ে কোনো অভিজ্ঞতা? মজার বা দুখের?

বাঁধন আরেং: লেখালেখির কাজে অনেক সুখের, কষ্টের ও ভালো লাগার অভিজ্ঞতা আমার আছে। জাপানের কিওটো বিশ^বিদ্যালয়ের পিএইচডি-এর একজন ছাত্র যুগান্তরের সাময়িকিতে পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকার খুমি আদিবাসীদের নিয়ে আমার একটি লেখা পড়ে পশংসা করে ধন্যবাদ জানিয়ে লম্বা একটি চিঠি লিখেছিলেন। আজো সেই প্রসংশা আমাকে উচ্ছ্বসিত করে। বেঙ্গালরের একজন পুলিশ অফিসার সানতাল আদিবাসীদের নিয়ে একটি লেখা পড়ে প্রসংশা করে তার দেশে যাওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়ে আমাকে চিঠি পাঠিয়েছিলেন। তাঁর চিঠির ভাষায়, আমি একজন পুলিশ অফিসার তবে আমি সমাজ সেবার কাজও করি। আপনার লেখা পড়ে বাংলাদেশের সানতাল আদিবাসীদের বিষয় জানতে পারি। আমি আপনাকে বেঙ্গালরে আসার জন্য আমন্ত্রণ জানাই। এই সাক্ষাৎকারের একটি জায়গায় আমার শ্রদ্ধেয় একজন পাঠকের উপহার পাঠানোর ঘটনা উল্লেখ করেছি। নিজের লেখা দামি একটি বই তিনি আমাকে কুরিয়ার করে পাঠিয়েছিলেন। এর আগে অমার লেখা নিয়ে তিনি ইমেইলে মতামত পাঠিয়ে আমার ঠিকানা চেয়ে নিয়েছিলেন। কেন তিনি আমার ঠিকানা নিচ্ছেন আমি তখন কিছুই জানতাম না। দুদিন পর সুন্দর একটি প্যাকেট কুরিয়ারের লোক এসে আমার বাসায় দিয়ে যায়। প্যাকেট খুলে দেখি, বড় একটি বই। তিনি  একজন ব্যাংকার। বইটিতে শুভেচ্ছা বাণী লিখে তিনি পাঠিয়েছেন। যেমূহুর্তে বই হাতে নিয়ে খুলে দেখি সেমূহুর্তের অনুভূতি আমি ব্যক্ত করতে পারিনাই এখনো পারিনা। আমি শুধু উপলদ্ধি করছিলাম মানুষের জ্ঞান শক্তির স্পর্শ আর মানবিক আহবানের সাড়া।

মধুপুরের কেজাই বন্দরিয়া নামে একটি জায়গা আছে। সেখানে দুবৃত্তরা আমার ঘারে রামদা চেপে ধরে জিজ্ঞাসা করেছিল, ডরাসনা এই, বেডা ডরাসনা? আমি কিছুই বুঝে উঠতে পারিনাই, হঠাৎ করে গাছের সাথে বেধে রাখা রামদা নিয়ে আমার ঘারে চেপে ধরে। বনদস্যুদের হাত থেকে সেযাত্রায় কোনোরকমে রেহায় পেয়েছিলাম। আমরা কয়েকজন মিলে ঢাকা থেকে মধুপুরের বনসংক্রান্ত রিপোর্ট করার জন্য গিয়েছিলাম। সেড নামে একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় বিবিসি প্রতিনিধিসহ দৈনিক প্রথম আলো, দৈনিক সংবাদ, সাপ্তাহিক ঢাকা কুরিয়ার-এর প্রতিনিধিরা এই দলে ছিলেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী আমরা একেক জন একেক এলাকায় তথ্য সংগ্রহের কাজ করছিলাম। আমি সেড-এর হয়ে দায়িত্ব পালন করছিলাম। তবে আমার রিপোর্ট করার দায়িত্ব ছিল দৈনিক সংবাদকে। যে সময়ের কথা বলছি তখন (১৯৯৬) সে এলাকায় সামাজিক বনায়ন প্রকল্প সংক্রান্ত সমস্যা ও জটিলতা চলছিল। আদিবাসী, স্থানীয় বনবিভাগ ও এলাকার একশ্রেণীর স্বার্থান্বেষী মহলের মধ্যে চলছিল সমস্যা, জটিলতা ও দ্বন্দ্ব। এই প্রেক্ষাপটেই আমরা তথ্য অনুসন্ধান করে বিবিসি ও বিভিন্ন জাতীয় পত্রপত্রিকায় রির্পোট তৈরীর কাজ করছিলাম। ঘটনা ঘটে অনুমান বেলা প্রায় চারটার দিকে। সে রাতে আমি বেদুরিয়া গ্রামের শ্রদ্ধেয় জেরোম হাগিদক (আমার শ্রদ্ধেয় পাজং)-এর বাড়ীতে ছিলাম। আমি ঘটনা ওনাকে বলেছিলাম, তখন আর করার কিছু ছিলনা। উনি আমাকে বলেছিলেন, এখানে এসব কাজে আসলে খুব সতর্ক এবং সাবধান হতে হয়।

  থকবিরিম : আপনার পরে যারা লিখতে আসছে লিখছে তাদের লেখা সম্পর্কে আপনার অভিমত কি?

বাঁধন আরেং: য়ারা লিখছেন তাদের সকলের প্রতি আমার সম্মান জানাই। লেখা সম্পর্কে আমি মন্তব্য করতে চাইনা। তবে পড়াশুনা করতে হবে। অনলাইন ভিত্তিক তথ্য উপাত্ত কিম্বা মৌখিক তথ্যের উপর ভিত্তি করে লেখা খুব বেশী সমৃদ্ধ হয়না। শুধুমাত্র সমালোচনা বা দোষারোপ করে লেখার মধ্যে জ্ঞান বিকশিত হয়না। মানুষের চেতনা ও আত্মাকে জাগিয়ে তোলার স্বক্ষমতার মধ্যেই লেখার শক্তি নিহিত। জনপ্রিয় লেখক এবং দায়িত্বশীল লেখক এদুটির গুরুত্ব ও তাৎপর্য স্ব স্ব জায়গায় প্রতিষ্ঠিত। লেখককে জানতে হয় কী লিখতে চায় এবং কেন লিখতে চায়।

গারো লেখকদের কাছে বিনীত আহবান, আমাদের ভাষা আছে, বর্ণমালা আছে, প্রতিষ্ঠিত লেখ্যরŰপ আছে, অভিধান আছে, ব্যাকরণ আছে। আমরা আমাদের মাতৃভাষায় লেখা চর্চা করি। গারো ভাষায় ভারতের মেঘালয় রাজ্যে প্রাথমিক থেকে বিশ^বিদ্যালয় শিক্ষা অর্জন করা যায়। পিএইচডি ডিগ্রী করা যায় এবং এ ভাষায় সাহিত্য চর্চা ও অফিস-আদালতের কাজ করা হয়। গারো ভাষা সমৃদ্ধ একটি ভাষা। বাংলাদেশেও প্রাক-প্রাথমিক থেকে তৃতীয় শ্রেণী পর্যন্ত গারো ভাষায় ছেলেমেয়েদের শিক্ষা লাভের সরকারীভাবে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। শিক্ষা উপকরণ তৈরী করা হয়েছে এবং এসব উপকরণ সমৃদ্ধ এবং যুগোপযুগী করার চিন্তাভাবনাও রয়েছে। আসুন, পরবর্তী প্রজন্মের জন্য আমাদের মাতৃভাষায় লেখালেখি চর্চা করি। তবেই আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস অমর ২১শে ফ্রেব্রুয়ারী উদযাপন বাণীর তাৎপর্য যথার্থভাবে বাস্তবায়িত হবে। যথাযোগ্য সম্মান দেখানো হবে মহান ভাষা শহীদ, রফিক, সফিক, সালাম, বরকত ও জব্বারের অমর স্মৃতির প্রতি।

থকবিরিম : বর্তমানে আপনি কী লিখছেন? কী নিয়ে সময় কাটাচ্ছেন বা ব্যস্ত আছেন?

বাঁধন আরেং: গারো ভাষা ও সংস্কৃতি নিয়ে নিজের ভাষায় লিখছি। গারো সংস্কৃতির অনেক বিষয় আছে। ধর্মবিশ্বাস, সামাজিক মূল্যবোধ, খাদ্যাভ্যাস, চাষ পদ্ধতি, চিকিৎসা পদ্ধতি, দর্শন, হস্তশিল্প, সাহিত্য, লোকসঙ্গীত, নৃত্য, লোকগাঁথা, পৌরাণিক কাহিনী, সামাজিক রীতি-প্রথা, পারিবারিক ও সামাজিক জীবন, নারী ও শিশু বিষয়ক মূল্যবোধ, জন্ম-মৃত্যু, বিবাহ, প্রসাশন, প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহার ও ব্যবস্থাপনা বিষয়ক মূল্যবোধ, বিশ^ভ্রম্মান্ড, সৃষ্টি কাহিনী, পোষাক, অলংকার, গৃহনির্মান এমন আরো অনেক বিষয় আছে যা নিয়ে আমাদের চিন্তা করা ও সাধারণ মানুষের সামনে তুলে ধরা প্রয়োজন। নানা কারণে এসব মূল্যবান সম্পদ বাংলাদেশের গারো সমাজ থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। বিষয়গুলো নিয়ে আলাপ-আলোচনা, খোঁজ-খবর নেয়া ও পড়াশুনা করার চেষ্টা করি। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO)-এর সহায়তায় আমরা গারো শিশুদের জন্য Abachengani Ki·tap ও Bisarangni Golpo Aro Goserong নামে দুটি শিশুতোষ বই প্রকাশ করেছি। IFAD-IFAP ও Tebtebbaএর সহায়তায় জীবনের জন্য ফসল (Farming for Life and Livelihood) নামে একটি ডকুমেণ্টারি ফিল্ম তৈরী করেছি। এভাবে সংস্কৃতির নিজস্বতা সম্পর্কে বাংলাদেশের গারোদের জাগিয়ে তোলার চেষ্টায় আরো কিছু কাজ করার চেষ্টা করছি। ENESCO ঘোষিত আন্তর্জাতিক আদিবাসী ভাষা বর্ষ উদযাপন কমিটি ২০১৯-এর সক্রিয় কর্মী হিসাবে বিপন্নপ্রায় (Endangered) ভাষা চিহ্নিত ও করণীয় বিষয় নিয়ে কাজ করেছি। তাছাড়াও বাংলাদেশ সরকারের প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের NCTB-এর সাথে গারো শিশুদের জন্য শিক্ষা উপকরণ তৈরীর সাথে সক্রিয়ভাবে জড়িত থেকে কাজে করেছি। অবশ্য ২০১৫ থেকেই শিক্ষা উপকরণ তৈরীর কাজে NCTB-এর সাথে যুক্ত থেকে কাজ করে আসছি।

থকবিরিম :.  লেখালেখি নিয়ে আপনার ভবিষ্যত পরিকল্পনা কি?

বাঁধন আরেং: গারো ভাষা ও সংস্কৃতি নিয়ে কাজ করার লক্ষ্য নিয়ে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছি। এ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বর্তমানে আমরা ভাষা সংক্রান্ত কাজ পরিচালনা করে থাকি। গারোদের খাদ্যাভ্যাস, ঐতিহ্যবাহি ফসল সংক্ষন, চাষ পদ্ধতি, ঐতিহ্যবাহী জ্ঞান এসব বিষয় নিয়েও আমরা কাজ করি। এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে গারো ভাষা ও সংস্কৃতির বিভিন্ন বিষয় নিয়ে গবেষণা ও সুরক্ষার কাজ সুযোগ ও সহায়তা পেলে নিবিড়ভাবে করার ইচ্ছা ও পরিকল্পনা আছে। মাতৃভাষায় লেখালেখি ছাড়াও মাতৃভাষায় শিক্ষা কার্যক্রমকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য সাধ্যমত কাজ করে যাব।

 

 

মান্দি সমাজে নতুন জ্ঞান সৃষ্টির কাজে গবেষণা জরুরি । আলবার্ট মানখিন

 

সামাজিক বনায়নের নামে আদিবাসীদের নিজ বাসভূমি থেকে উচ্ছেদ ষড়যন্ত্রের প্রতিবাদে দ্বিতীয় দিনের বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সমাবেশ।

Gepostet von Thokbirimnews.com am Mittwoch, 16. September 2020




সম্পাদক : মিঠুন রাকসাম

উপদেষ্টা : মতেন্দ্র মানখিন, থিওফিল নকরেক

যোগাযোগ:  ১৯ মণিপুরিপাড়া, সংসদ এভিনিউ ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৫। 01787161281, 01575090829

thokbirim281@gmail.com

 

থকবিরিমে প্রকাশিত কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। Copyright 2020 © Thokbirim.com.

Design by Raytahost
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x