Thokbirim | logo

১৪ই ফাল্গুন, ১৪৩০ বঙ্গাব্দ | ২৭শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

ভালোবাসার অশ্রু।। গল্প।। থিওফিল নকরেক

প্রকাশিত : ডিসেম্বর ২৫, ২০১৯, ১৩:০৬

ভালোবাসার অশ্রু।। গল্প।। থিওফিল নকরেক

রাতে তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়ে সিজার। পরের দিন কলেজে এনুয়্যাল স্পোর্টস হবে। সে দৌঁড়ে কোয়ালিফাই করেছে। গতবছরও সে চার’শো মিটার দৌঁড়ে প্রথম হয়েছিল। এবারও তার সম্ভাবনা আছে ভাল খেলার। গত কয়েকদিন  তাঁর ক্লাশমেট ইমতিয়াজের সঙ্গে চন্দ্রিমাতে সকালে ওঠে প্রেক্টিস করেছে। অনেকটা সাবলিল হয়েছে অনুশীলনীর পর। কোনোভাবেই সে সুযোগ হাতছাড়া করতে চায় না। ইমতিয়াজ ও সে একই উচ্চ বিদ্যালয় থেকে জিপিএ ফাইভ পেয়ে এসএসসি পাশ করেছে। ইমতিয়াজ কিছুটা লাজুক প্রকৃতির তবে সরল। তাতে সিজার মাঝে মাঝে তাকে নিয়ে ঠাট্টা মস্করা করে। সে রেগে যায় না কখনো। তার বাবা উচ্চ পদস্ত সরকারি কর্মকর্তা। কিন্তু তার আচরণে কোনো ছাপ নেই বাবার পদ-পদবীর।  একই সঙ্গে কলেজে যাওয়া, খেলাধূলা করা তাদের সম্পর্ক ঘনিষ্ট করেছে। ইমতিয়াজ তাদের বাসাতে অনেকবার এসেছে বেড়াতে। সেও গেছে তাদের ঢাকার ইন্দিরা রোডের বাসায়। দু’জনের বন্ধুত্ব পারিবারিক বন্ধনে রূপ নেয়। সকাল সাতটায় ফার্মগেট মনিপুরিপাড়া থেকে খামার বাড়ির পিছন থেকে হেঁটে সরু রাস্তা ধরে সিজার ইন্দিরা রোডে পৌঁছে ইমতিয়াজকে খোঁজ করে। ইমতিয়াজ তার জন্য দাঁড়িয়েই ছিল। এটাই তাদের কলেজে যাবার সময়। ‘তুমি এসেছ কখন?’ সিজার বলল।

ইমতিয়াজ বলল,‘এই মাত্র। বাবা চলে গেল অফিসে। আমাকে ড্রপ দিতে চেয়েছিল কিন্তু তোমার সঙ্গে যাবো বলে না করেছি।’

সিজার বলল,‘চলো, বাস ধরতে হবে।’

ইমতিয়াজ জিজ্ঞেস করল,‘সকালের নাস্তা হয়েছে?’

সিজার বলল,‘হ্যাঁ হয়েছে।’ বলে দু’জনে পাশাপাশি হাঁটতে থাকে।

তেঁজগাও কলেজের সামনে দিয়ে গিয়ে ফুটপাতের দোকানগুলো পার হয়ে ওবার ব্রিজে ওঠে। সেখানেও ভিক্ষুকের ভিড়। একজনের ডান পায়ে বিশ্রী ঘা নিয়ে গত এক বছর যাবৎ ভিক্ষা করতে তারা দেখছে। কেন ঘা সাড়ছে না তারা জানে না।  হকারদের নীচে থাকতে দেয় না বলে ব্রিজের উপরে নিরাপদে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। ‘১০০ টাকায় চামড়ার মানিব্যাগ’ বলে হকার অনবরত চিৎকার করছে। কখনো একা,  কখনো সমস্বরে দু’জন। তাদের দখলে শহরের অনেক রাস্তায় চলে গেছে। বারবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ও মেয়রের সতর্কতা কোনো কাজে আসছে না। ফার্মগেট ওভারব্রিজ সংলগ্ন ‘সেজান পয়েন্ট’ শপিং মলের সামনে একবার পরিস্কার হকার শূন্য। আবার এক সপ্তাহ না যেতেই হকারের ভীড়ে রাস্তা বন্ধ। বিরাট সিন্ডিকেট কাজ করে বলে অনেকেই মন্তব্য করেন। তারা দু’জন ব্রিজ পার হয়ে ডানের উয়িং দিয়ে নেমে বাসের জন্য অপেক্ষা করছে। বাস সঠিক সময়েই আসে। সিজার সামনে। ইমতিয়াজ পিছনে। এমন সময় সিজারকে দ্রুতগতিতে একটি লেগুনা প্রায়ই ধাক্কা দেয়ার উপক্রম হয়। ইমতিয়াজ তাকে বাঁচানোর জন্য হাত ধরে টান দেয়। মুহূর্তের মধ্যে আরো একটি ৬ নম্বর বাস ইমতিয়াজকে পিছন থেকে ধাক্কা দেয়। ‘মাগো!’ বলে চিৎকার দিয়ে ইমতিয়াজ পরে যায়। সিজার কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ে। তাড়াতাড়ি গিয়ে ইমতিয়াজকে ধরে। ইমতিয়াজ হাতে আঘাত পেয়েছে। পায়ে প্রচণ্ড ব্যাথা। মনে হয় পা ভেঙে গেছে। হাতের ব্যাগ পিষ্ট হয়ে তিনটি বই ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে। ‘ফ্রেইন্ড কোনো চিন্তা কর না। আমি আছি।’ বলল সিজার। কাছে সিএনজিও নেই। দূরে ট্রাফিক পুলিশকে ডাক দিল, ‘ভাই একটু হেল্প করেন প্লিজ! আমাদের।’  পুলিশ সহায়তা করলো চলন্ত এক সিএনজিকে থামিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজে নিতে। ইমতিয়াজ ব্যাথায় কাতরাচ্ছে। সিজার তাকে বলে,‘চিন্তা নেই, আমরা প্রায় এসে গেছি।’ বাংলামোটর এসে জ্যাম ছাড়ছে না। সিএনজি থেকে নেমে ট্রাফিককে সে গিয়ে বলল, ‘ভাই, ইমারজেন্সি রোগি একসিডেন্ট  কেইস।’ দেখলো তার কথায় কাজ হয়েছে। মূহুর্তেই তারা জ্যাম ছেড়ে মেডিকেলের দিকে চললো। বাড়িতে খবর দেবে এমন কোনো উপায় নেই। হাতে কোনো মোবাইলও নেই। মেডিকেলে পৌঁছে সিএনজি ড্রাইভারকে বলল, ‘আপনার মোবাইল একটু দেবেন?  তার বাসায় ফোন করি।’ ড্রাইভারও মোবাইল দিলেন। সিজার ইমতিয়াজের বাবাকে ফোন করে, ‘আঙ্কেল আমরা ঢাকা মেডিকেলে। ইমতিয়াজ একসিডেন্ট করেছে।’

‘আমি মিটিংএ। পরে কথা বলবো।’ উত্তরে সামাদ সাহেব বললেন।

‘আঙ্কেল ইমতিয়াজ একসিডেন্ট করেছে। আমরা মেডিকেলে এখন।’ সিজার আবার চিৎকার করে বলল।

 সামাদ সাহেব এবার বুঝতে পারলেন, খুব জরুরি নিশ্চয়ই। মিটিং থেকে বের হয়ে ফোন ধরে বললেন, ‘বলো, কী বলবে!’ ‘ইমতিয়াজকে নিয়ে ঢাকা মেডিকেলে আছি। তাড়াতাড়ি আসেন।’ সিজার জানালো। সামাদ সাহেব বুঝলেন যে সিরিয়াস কিছু ঘটে গেছে। তাই মিটিংএ না গিয়ে কেয়ারটেকারকে বললেন, ‘আমি ঢাকা মেডিকেল হাসপাতালে জরুরি বিভাগে যাচ্ছি। সবাইকে জানিয়ে দিয়ে।’ সামাদ সাহেবের দু’সন্তানের মধ্যে ইমতিয়াজ ছোট। তার বড় মেয়ে শ্রেয়া বুয়েটে থার্ড ইয়ারে পড়ে। একমাত্র ছেলের এমন কী হলো কিছুই মাথায় আসছে না। স্ত্রীকে ফোন করবে কীনা ভেবে নেয়। যদি কিছু না হয়। আবার ফোন না করলেও যদি মারাত্মক  কিছু হয়। না ফোন করাই শ্রেয় মনে করে স্ত্রী রাবেয়াকে ফোন করলো। এদিকে রাবেয়া বেগম ফোন ধরেই জ্ঞান হারিয়ে ফেললেন। তার বড় মেয়ে তখনো বাসায়ই ছিল। মাকে চোখে মুখে পানি দিয়ে ছিটিয়ে কোনো রকমে চেতনা ফিরাল। ‘চলো, ঢাকা মেডিকেলে! তাড়াতাড়ি চলো।’ বলল রাবেয়া। শ্রেয়া ভেবে কিছুই পাচ্ছে না। ‘কেন!  কী হয়েছে, মা?’

রাবেয়া উদ্বিগ্নের সাথে বলল,‘তুমি আগে চলো। ইমতিয়াজ মেডিকেলে।’

শ্রেয়া বলল,‘কেন?  কী হয়েছে ভাইয়ার?’

‘জানি না, তোমার বাবা ফোন করেছিল। সেও যাচ্ছে মেডিকেলে।’

‘চলো  মা।’ বলেই শ্রেয়া ও তার মা বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়লো। রাস্তায় এসে সিএনজির খোঁজ করতে লাগল। সামনে এগিয়ে সিএনজিও পেয়ে গেল। ‘যাবেন? ঢাকা মেডিকেলে?’ বলল শ্রেয়া।

‘হ্যাঁ যাবো।’ দু’শো টাকা ভাড়া।

শ্রেয়া এবং রাবেয়া বেগম কিছু না বলে ওঠে পড়লো। রাবেয়া বেগম বারবার চিৎকার করতে লাগল, ‘বাবারে! তোমার কী হলো? কেন  বাসে যাচ্ছিলে?  তোমার তো গাড়ি ছিল?’ শ্রেয়াও খুব ভয় পাচ্ছে। তবে মাকে কে সামাল দেবে, সেও যদি ভেঙে পড়ে। তাই শক্ত থাকার চেষ্টা করছে সে। এক ঘন্টার মধ্যেই তারা মেডিকেলে পৌঁছল।

‘ইমতিয়াজকে ইতোমধ্যে ইমারজেন্সি থেকে ওটিতে নেয়া হয়েছে। অনেক রক্তক্ষরণ হয়েছে। জরুরি রক্ত লাগবে বলেছে ডাক্তার। সিজার ইতিমধ্যে তার মাকেও খবর দিল। শ্রেয়ার রক্ত মিল থাকায় তার রক্ত আগে নিল কর্তব্যরত নার্স। সরকারি কর্মকর্তার স্বজন জানার পর চিকিৎসা দ্রুত চলতে লাগলো। রাবেয়া বেগম এখনো ছেলেকে দেখতে পায়নি। ওটিতে ডাক্তারের বারণ আছে ভিজিটর প্রবেশের। ওটির সামনে বসে রাবেয়া বেগম ছেলেকে দেখার জন্য পাগল হয়ে গেল। কিন্তু কোনোভাবেই ভিতরে প্রবেশ করা গেল না। এক পর্যায়ে ডাক্তার এসে বললেন, ‘মেজর অপারেশন করছি। তার বাবা কে?’ সামাদ সাহেব বললেন, ‘আমি ছেলের বাবা। আমাকে বলুন।’ ডাক্তার সামাদ সাহেবকে অপারেশনের বিষয় বিস্তারিত জানালেন। মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হয়েছে। তার হাতে ও পায়েও ইনজুরি আছে। কিন্তু আমরা আগে তার মেজর চিকিৎসা করছি।’ ডাক্তারের কথা শুনে সামাদ সাহেব বিচলিত হয়ে পড়লেন। তিনি কী করবেন সেটা বুঝতে পারছেন না। ডাক্তার বললেন, ‘আপনাকে ভেঙে পড়লে চলবে না। ছেলের জন্য সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করুন।’ ডাক্তাররা ওটিতে তিনঘন্টা অপারেশন করার পর টীম প্রধান ডা. রশীউদ্দীন বের হয়ে এলেন। ‘সামাদ সাহেব অপারেশন সাকসেসফুল। উই আর স্যরি, তাকে বাঁচাতে পারলাম না। ব্রেইন হেমারেজ হয়েছে। চিকিৎসা বিজ্ঞানে এর বেশি সম্ভব ছিল না।’ কথাটা শুনে সামাদ সাহেব নির্বাক হয়ে গেলেন। কাঁপতে কাঁপতে ফ্লোরে বসে বরলেন। যে ছেলে কয়েক ঘন্টা আগেও তার সঙ্গে কথা বলেছে। সে এখন নিথর। সে আর কথা বলবে না। স্পেশাল জিএফসিএর বার্গার খাবারের জন্য বায়না ধরবে না। অঝর ধারায় কাঁদতে লাগলেন। কিছুতেই ছেলের এই মৃত্যু মেনে নিতে পাচ্ছেন না।  রাবেয়া বেগম ডাক্তারের কথাশুনেই অজ্ঞান হয়ে পড়লেন। কোনো কথায় বলতে পারেননি। ইমতিয়াজের বন্ধু সিজার কান্নায় ভেঙে পড়ল। বার বার বুক চাপড়ে বলছে, ‘ফ্রেন্ড, এ তুমি কী করলে? কেন তুমি আমাকে ধরতে এলে? আমার জন্য তোমাকে আজ চলে যেতে হলো? আমারই অপরাধ আঙ্কেল আমার জন্যই সে চলে গেল!’ হৃদয় বিদারক দৃশ্য দেখে ডাক্তারের চোখেও পানি গড়িয়ে পড়ল। নার্স চোখ মুছতে মুছতে পাশের কক্ষে চলে গেলেন। দুপুরের মধ্যেই সমস্ত আনুষ্ঠানিকতা সেরে ইমতিয়াজের ডেডবডি হাসপাতাল থেকে বাসায় আনা হলে চারিদিকে শোকের ছায়া নেমে আসে। সবাই আফসোস করে বলছে ‘আহা! ছেলেটি অত্যন্ত মেধাবী ও ভদ্র ছিল।’ এলাকায় সকলের প্রিয় ছিল।  একজন বন্ধু তার বন্ধুর জন্য নিজের জীবন দিয়ে প্রমাণ করলো সে তাকে কতো ভালোবাসে।

ছবি : থকবিরিম গ্যালারি




সম্পাদক : মিঠুন রাকসাম

উপদেষ্টা : মতেন্দ্র মানখিন, থিওফিল নকরেক

যোগাযোগ:  ১৯ মণিপুরিপাড়া, সংসদ এভিনিউ ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৫। 01787161281, 01575090829

thokbirim281@gmail.com

 

থকবিরিমে প্রকাশিত কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। Copyright 2020 © Thokbirim.com.

Design by Raytahost