Thokbirim | logo

২০শে ফাল্গুন, ১৪৩০ বঙ্গাব্দ | ৪ঠা মার্চ, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

ইদানিং সেরেনজিংরা ।। গুচ্ছ কবিতা।।লোটাস লূক চিসিম

প্রকাশিত : ডিসেম্বর ১৭, ২০১৯, ১৩:২০

ইদানিং সেরেনজিংরা ।। গুচ্ছ কবিতা।।লোটাস লূক চিসিম

ইদানিং সেরেনজিংরা

ইদানিং সেরেনজিংরা ভুলে গেছে

নিজ কৃষ্টি আর ঐতিহ্যকে,

ওরা পরে না ঐতিহ্যের আদিবাসী নথ

পরে শুধুই আটপৌরে শাড়ি

ভুলে গেছে নিজ ভাষা আর সংস্কৃতি

শুধু দেখা মেলে নোলকে সজ্জিত ঐ নারী,

ওরা আচিক নয় ওরা আজ বঙ্গ ললনা

তাই মিসি সালজংকে আর চিনে না

সেরেনজিংরা আজ দঃমি চিনে না

চিনে না আজ কোনো রক্তের বন্ধনকে

ক্ষণিক মোহে ওরা অস্থায়ী খোলসে বদ্ধ

আজ ঘোমটা টানে শুধু শাড়ির আঁচলে

আচিক ভাষা তার আর ভালো লাগে না

ভালো লাগে বাংলিশ প্রায়োগিক ভাষা,

সেরেনজিংদের দেখে আজ মনে হয়

আপাত: স্বল্প বসনে আচ্ছাদিত এক নারী!

ওরা ভালোবাসে না আর মিল্লামদের

মিল্লামরা আজ সুদর্শন কিংবা শিক্ষিত নয়

অপসংস্কৃতিতে আচ্ছন্ন অর্ধ শিক্ষিত

চু- তে আসক্ত এক খলনায়ক

মিল্লামরা আজ সুরা পানে মত্ত

ওরা আজ ভ্রান্ত পথিক পথ জানা নেই,

আর সেরেনজিংরা ? যেন মেঘে ঢাকা চাঁদ

ওরা ফিরে না, ঘরে ফিরবে না কোনোদিন

ইদানিং বাউন্ডুলে স্বপ্নরা

ইদানিং স্বপ্নগুলোকে আজ বড্ডবেশি বাউন্ডুলে বলে মনে হয়

আজকাল কেন যেন মনে হয় দিবা স্বপ্নগুলো বারবার কাতুকুতু দিয়ে যায়

হাজারও স্বপ্নেরা বারবার জ্বলে আর নিভে যায়

হাত বাড়ালেও যেন ধরা নাহি দেয় এ যেন এক অধরা মরীচিকা!

প্রথম প্রহরের স্বপ্নের ছোঁয়া এ যেন এক উষ্ণানুভূতি !

স্বপ্নরা যেন জীবন জাগরুকের গান শুনিয়ে যায়,

প্রতিটি মুহূর্তের অনুভূতি শুধুই প্রেমের উষ্ণতা ছড়ায়

মান-অভিমান খুনসুটি আর স্নেহ ভালোবাসার পরশ

যেন একই সূত্রে গাঁথা-

তাই স্বপ্নরা বারবার দোলা দিয়ে যায়।

দ্বিপ্রহরের স্বপ্ন?

সে যেন হৃদয় বিদীর্ণকারী এক মূহূর্ত,

মনে হয় রাত্রির যাত্রীর পথ চলা শেষ হবার নয়

আর স্বপ্নালোকের মায়া যেন আষ্ঠেপৃষ্ঠে

আলো আঁধারিতে হতাশার

গান শুনিয়ে যায় তাই মনে হয় স্বপ্নরা আজ ভালোই কালো

তখনই মন খোঁজে ফিরে রাত্রির জননীকে

আর শেষ প্রহরের স্বপ্নরা?

সে তো আজ জাগরুক

নিদ্রা আচ্ছন্ন স্বপ্নরা শান্তির গান শুনিয়ে যায়

স্বপ্ন দেবীরা ডানা ছড়িয়ে পুষ্প-গন্ধে সুবাসিত

আর ভোরের আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে,

স্বপ্নলোকের আলোয় শুভ বার্তা বয়ে বেড়ায়

বলে যায় সকলেরই শুভ কামনায়

তাই চলো আজ উচ্চস্বরে বলি,

‘হে স্বপ্ন, তোমায় ভালোবাসি’

স্বপ্নে বুভুক্ষ মানুষেরা

স্বপ্নে বুভুক্ষ মানুষের কান্না,

আর্তনাদ আর চিৎকার শুনতে পাই,

ঘুম থেকে জেগেই দেখি

সহস্র জ্যান্ত মানুষের আহাজারি

চাই ভালোবাসা আর প্রশান্তি

স্বপ্নে খুঁজে পাই অবহেলিত শিশুর স্থূলকায়,

জীর্ণ-শীর্ণকায় দেহের মুখচ্ছবি,

রাস্তায় বেরোলেই দেখি

কলে-কারখানায় নির্যাতিত যত শিশু

চাই অনুকম্পা,শিশু বিকাশে মনসত্তা

স্বপ্নে আঁকি গ্রাম্য কৃষাণীর মুখে ঘর্মাক্ত

বিবর্ণ আর রুগ্নকায় কষ্টে মলিন মুখ,

গ্রাম হতে পাড়ায় তাকালেই দেখি

দরিদ্র কৃষকের পোড়খাওয়া কেষ্ট হাসি

চাই দিবানিশি খাদ্য আর সুপেয় পানি

স্বপ্নে ফের দেখি লাখ যুবদের

সুখের ঠিকানা খুঁজে না পাওয়ার বেদনা,

বন্দরে কিংবা নগরে শুধুই দেখি

বুক ভরা কষ্ট আর নয়ন ভরা জল

চাই ভিত্তি আর জীবনী শক্তি

যুগের মানুষেরা যে আজ বুভুক্ষ,

ওরা বুভুক্ষ নয় শুধু অন্নে আর বস্ত্রে,

ওরা বুভুক্ষ নৈতিকতা, চিন্তা আর মননে,

নেই বোধ-প্রাণশক্তি, শুধুই ঘোর অমানিশা

গাই গান গড়ি প্রাণ, ঐক্য ও জয়গাঁথা

ভাবনার রঙ

ভাবনায় সম্ভাবনার ছবি

চিত্তে আজ খুঁজি ফিরি এক মুঠো সুখ

হৃদয় আজ ভারাক্রান্ত

শুধুই সংকীর্ণ পথ-স্বপ্নে দেখি

মন যে বড্ড বেসামাল

হাজারো স্বপ্নের বেড়াজাল,

জেগে আছে হাজার শকুনির দল

বিকট শব্দ, ছুটে চলি অবিচল

জোরে আরও দুরন্ত গতিতে

ছুটে চলি ঐ সীমানায়,

অজুহাতের শেষ নেই

কিন্তু অবিরাম ছুটে চলা

ভাবনায় মন আজ উত্তাল

হঠাৎ ভেসে আসে একটি কান্নার শব্দ,

একি এ যে একাকী শিশু, কোমল কণ্ঠে

কান্নার আওয়াজে এক করুণ আর্তি

হস্ত প্রসারিত পবিত্র শিশুর মুখচ্ছবি

সমস্ত ভাবনা শুধুই ঘর্মাক্ত শিশুটি,

কোলে তুলি অতঃপর চিৎকার করে বলি,

‘হে আজকের শিশু,

আমার ভাবনার রঙে শুধু তোমায় দেখি

আর ভালোবাসি শুধু তোমায় ভালবাসি’

শৈশবে স্বপ্ন

হঠাৎ স্বপ্ন দেখি

গাঁয়ের মেঠো সরু পথ,

হাওয়া এলেই ধুলো উড়ে

কাঁধে ঝোলানো স্কুল ব্যাগ,

কোমল পায়ে হাঁটি

ভাবি আর মন খুলে গান ধরি

স্বপ্ন দেখি উড়ি শুধুই উড়ি

গাছ হতে গাছে, মাঠ হতে মাঠে,

জাল বুনি বাসা বাঁধি

ভোরের হাওয়াই গাংচিল হই,

পানকৌড়ি হয়ে আকাশে

ডানা মেলে উড়ি

হঠাৎ ঝড়ো বাতাস

স্বপ্নরা এলোমেলো-উড়ে গেলো,

জেগে দেখি চারিদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার

হারিকেন জ্বালিয়ে মা,

ধুলায় মাখা এক বিধস্ত মুখে

আবিষ্কৃত হলাম এক খড়ের গাদায়

কালের সভ্যতা এবং আমরা

আদিকাল আর বন্যতায়

মাথা তুলে নপুংসকের দল,

আর সহস্র যুগ পেরিয়েও

তোমার আদিমত্যতা,

শত সহস্র প্রাণে শিহরণ জাগায়

জেগে উঠে অসভ্য নগরী

স্থূল বুদ্ধি আর হীনমন্যতায়

আচ্ছন্ন এই ব্যস্ত নগরী,

স্বল্পবসনা প্রজাপতিদের বিকিকিনি

অকর্মণ্য মাতালদের বিচরণ,

নগ্ন উদ্যাম নীতিরাজদের নিশ্বাসে

নগর আজ বিষাক্ত

নীতিরাজ আজ উন্মুক্ত মঞ্চে

চিয়ার্স গার্লদের নিয়ে মত্ত,

বাঁ হাতে জ্বলন্ত সিগারেট

ডান হাতে অনুভূতি জাগানিয়া-

এক রঙিন গ্লাসে পূর্ণ সুরা

চোখ তাঁর কামনায় ভরা

কালের পরিক্রমায়

জাতি আজ উলঙ্গ-আনন্দে মত্ত,

খুন রাহাজানি ধর্ষণে মগ্ন

আমি আমরা সবার একই প্রশ্ন,

সভ্যতা, তুমি কি সুশোভিত?

যদি না হও, তো হয়ে যাই দেশরত্ম!

গন্তব্য-জানা নেই

মেঘলা আকাশ

উষ্ণ শীতল বাতাস,

নির্ঝঞ্ঝাট পৃথিবী

মাঝে মাঝে বৃষ্টি,

কী শরৎ কী বসন্ত

চলছে অবিরাম

মায়াবী ঐ আদিবাসী কৃষাণী

কেটে চলে হলুদ ধানের শীষ,

অর্ধনগ্ন বস্ত্রে তাঁর পুরুষ

বিশ্রামহীন বসে, মত্ত সূরা পানে,

থেমে থেমে বিদ্যুৎ চমকায়

গন্তব্যে নেই কোনো কমা, নেই দাঁড়ি ।

কর্দমাযুক্ত মেঠোপথ

হেঁটে চলা ঐ সুদূরে,

ব্যস্ত নগ্ন পদযুগল

শ্রান্ত ভারাক্রান্ত,

কিন্তু হেঁটেই চলছে

গন্তব্য জানা নেই।

দুষ্ট রাজার শিষ্ট প্রজা

ওহে সোনার দেশের রাজা

দাও কেন আজ লোককে সাজা,

থামাও এবার তোমার শোষণ

নইলে দেখবে বাঁদর নাচন

বললো এবার মহা রাজা

‘বেকুব প্রজা হতচ্ছাড়া,

দেখাও দেখি কেমন আমায়

বাঁদরের দল কেমনে ঝিমায়?’

প্রজা এবার কইলো রাজায়,

‘নাচন দেবার দমটা যে নাই’

দেখবে এবার মজার মজা

রাজা যে আজ পাবেই সাজা

রাজা বলে, ‘আমার দেশের পাজি প্রজা

ভাঙবো তোদের মনের ধ্বজা,

দুষ্টমিটা কেমনে করো

সিপাহীদের করছি জড়ো

‘দেখো এবার দুষ্ট রাজা

সবাই মিলে কি দেই সাজা’

সাহসী সব প্রজা মিলে –

ছুঁড়লো যে তীর বুকের মাঝে

পাপী রাজার হলো সাজা

ভাঙলো যে তাঁর অহমিকা,

বলবে না কেউ দুষ্ট প্রজা

আমরা যে সব খাঁটি প্রজা

রাত বিরাতের ডাক

সারাদিন কর্ম ব্যস্ত ক্লান্তি

অতঃপর নীড়ে ফেরা,

খুঁজি ফিরি এক মুঠো প্রশান্তি

চাই শান্তি আর ভালোবাসা

হঠাৎ ওরা ডাকে কিছু চায়

কিন্তু রাত বিরাতে,

কাকের ডাক শুনে কষ্ট হয়

শব্দ বিভ্রাট, সন্ত্রস্ত মনে জাগে ভয়

ইদানিং ওরা সময় কিংবা অসময়

কিছুই বোঝে না বুঝতেই চায় না,

এ যে শুধুই নিরলস আকাক্সক্ষা

খুঁজে বেড়ায় প্রাপ্তির ভারসাম্যতা

চারিদিকে উষ্ণতা অন্তঃসার শূণ্যতা,

এই অবাক পৃথিবী খুঁজে ফের,

সুন্দর একটি মন, শুধুই সারাক্ষণ

বুকে শ্বাস, রবে যতক্ষণ!

এক ঝাঁক স্বপ্নরা

পৃথিবী আজ নিজ কর্মচাঞ্চল্যে ব্যস্ত,

আর ঝাঁকে ঝাঁকে স্বপ্নরা ডানা মেলে

উড়ে যায় গভীর কোনো অরণ্যে,

গ্রাম থেকে গঞ্জে, শহর থেকে নগরে

ব্যস্ত নগরী মগ্ন নিজ আখেরী গোছাতে

ভালোবাসারা তাই বর্ণহীন-গন্ধহীন,

স্বপ্নরা আজ তমসাচ্ছন্ন ফেরারী

যেন এক উদ্বাস্তু রিফিউজি!

লোটাস লূক চিসিম
১৯৭৯ সালের ১৭ ডিসেম্বর শেরপুর জেলা সদর অন্তর্গত চর শ্রীপুর গ্রামে জন্ম গ্রহন করেন। ১৯৯৫ সালে ঝিনাইগাতী পাইলট হাইস্কুল হতে মাধ্যমিক ও ১৯৯৭ সালে ঢাকা নটরডেম কলেজ থেকে মানবিক বিভাগ হতে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণি পেয়ে উত্তীর্ণ হন এবং ২০০১ সালে শেরপুর সরকারি কলেজ হতে বিএসএস ডিগ্রি অর্জন করেন। ২০০৫ সালে ময়মনসিংহের আনন্দ মোহন বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান নিয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করার পর ২০১৭ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় হতে দ্বিতীয় বারের মতো ‘সুশাসন ও উন্নয়ন’ বিষয় নিয়ে প্রথম শ্রেণি পেয়ে আবারোও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি সফলতার সাথে উত্তীর্ণ হন। এছাড়াও তিনি দক্ষিণ কোরিয়া হতে ‘ঈধঢ়ধপরঃু ইঁরষফরহম’ নিয়ে মাসব্যাপী প্রশিক্ষণ গ্রহণসহ ঢাকা বিশ্যবিদ্যালয় হতে ‘জবংবধৎপয গবঃযড়ফড়ষড়মু’ নিয়েও পড়াশুনা করেন। বর্তমানে তিনি আইন বিষয়ে এলএলবি ডিগ্রি অর্জনের জন্য অধ্যয়ন করছেন।
শিশু বয়স থেকেই লোটাস চিসিম লেখালেখির সাথে জড়িত। অষ্টম শ্রেণিতে অধ্যয়ন করার সময় তার প্রথম কবিতা ‘ বৈশাখির আগমনে’ প্রকাশিত হয় । এ ছাড়াও বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন পত্রিকায় ও ম্যাগাজিনে তার লেখা কবিতা ও ছড়া প্রকাশিত হয়েছে। তার লেখা কাব্যগ্রন্থ ‘কবিতা : তোমায় ভালবাসি’ প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছে ।
লোটাস চিসিম ২০০৩ সাল থেকে জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থায় নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। পারিবারিক জীবনে তিনি বিবাহিত এবং এক কন্যা সন্তানের জনক।




সম্পাদক : মিঠুন রাকসাম

উপদেষ্টা : মতেন্দ্র মানখিন, থিওফিল নকরেক

যোগাযোগ:  ১৯ মণিপুরিপাড়া, সংসদ এভিনিউ ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৫। 01787161281, 01575090829

thokbirim281@gmail.com

 

থকবিরিমে প্রকাশিত কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। Copyright 2020 © Thokbirim.com.

Design by Raytahost