Thokbirim | logo

১০ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ | ২৪শে মে, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

গারো মুক্তিযোদ্ধা।। বিশেষ সাক্ষাৎকার ।। দিলীপ সাংমা

প্রকাশিত : ডিসেম্বর ০৩, ২০১৯, ১৩:৪০

গারো মুক্তিযোদ্ধা।। বিশেষ সাক্ষাৎকার ।। দিলীপ সাংমা

ডিসেম্বর মাস মানেই বিজয়ের মাস। এই বিজয়ের মাসে গারো জাতিগোষ্ঠীর বীর মুক্তিযোদ্ধাদের শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি। বাঙালির পাশাপাশি গারো মুক্তিযোদ্ধারাও জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করেছেন। শহিদ হয়েছেন। আমরা স্মরণ করি শহিদ বীর মুক্তিযোদ্ধা পরিমল দ্রংকে। স্মরণ করি সকল মুক্তিযোদ্ধাদের যারা এই পৃথিবীর মায়া ছেড়ে চলে গেছেন। কবি জেমস জর্নেশ চিরান তার প্রবন্ধ গ্রন্থে লিখেছেন ‘মোট ১৩,০০(তেরশত)জন গারো মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশ নিয়েছিলো বলে জানা যায়।’ আমরা সঠিক তালিকা এখনও পাইনি যা পেয়েছি তাও সঠিক নয় কারণ অনেক গারো মুক্তিযোদ্ধাগণই ইন্ডিয়াতে চলে গেছেন ফলে তাদের নামের তালিকা আসেনি বা করা হয়নি। থকবিরিম এই বিজয়ের মাসে গারো মুক্তিযোদ্ধাদের ছবি, সাক্ষাৎকার ভিডিও প্রকাশ করার চেষ্টা করছে। পাঠক আজকে বীর মুক্তিযোদ্ধা দিলীপ সাংমার বিশেষ সাক্ষাৎকার প্রকাশ করা হলো। সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছেন সম্পাদক।

বীর মুক্তিযোদ্ধা দিলীপ সাংমার জন্ম ১৯৪৭ সালে। পাঁচ ভাই তিন বোনে মধ্যে তিনি দ্বিতীয়। দিলীপ সাংমার মায়ের নাম বিমলা সাংমা হাউই। বাবার নাম মাইকেল বনোয়ারী।দিলীপ সাংমা বিয়ে করেন ১৯৭৮সালে।তাঁর তিন ছেলে। দুই ছেলের বিয়ে হয়েছে। আরেক ছেলে সীমান্ত কলেজে পড়া শোনা করছে। স্ত্রী মারা গেছেন।  দিলীপ সাংমা মরিয়মনগর মাধ্যমিক স্কুলে পড়ালেখা শেষ করে নুন্নী হাই স্কুলে নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। এবং মা বাবা কাউকে না জানিয়ে চলে যান মুক্তিযুদ্ধে।  https://www.youtube.com/watch?v=EZg4QaI2S34

যুদ্ধে অংশগ্রহণের কথা…

মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার জন্য আমার বাবা-মা কেউ না করেনি। অর্থাৎ কেউই জানে না আমি মুক্তিযুদ্ধে যাব। একপ্রকার চুপি চুপি যাওয়া। সেখানকার প্রিন্সিপাল মতিউর রহমান আমাকে এক রাতে বলে যে তোমাকে তো এখানে রাখতে পারবো না যেদিন ট্রেনিং হবে সেদিন তোমাকে খবর দেওয়া হবে। তুমি শুধু প্রস্তুত হয়ে থাকো। কথা মতো আমি প্রস্তুতি নিয়ে ছিলাম। কয়েকদিন পর হঠাৎ করে খবর দেওয়া হলো আজ রাত ৯টার সময় যারা যারা মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার জন্য নতুন ভর্তি হয়েছে তাদেরকে ট্রেনিং এর জন্য তেলঢালা পাঠানো হবে। আমি নির্দেশনা মতোই রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে প্রস্তুত ছিলাম হঠাৎ একটা ট্রাক আসলো সেখানে অনেক লোকে ভরা। যুবক বয়স্ক বয়সী লোক। গাড়ি আসার সাথে সাথে সিগনাল দিলাম আর জিজ্ঞেস করলাম গাড়িটি কোথায় যাবে? তারা বলল যে, তেলঢালা যাবে মুক্তিযুদ্ধ ট্রেনিং সেন্টারে। আমি বললাম আমার নাম মাইকেল বনোয়ারী। আমি তালিকায় আছি কিনা? তারা তালিকা দেখে বলল- হে হে আছে আছে। গাড়িতে উঠেন উঠেন। সেখান থেকে আমিও সরাসরি তেলঢালা চলে গেলাম।

ট্রেনিংয়ের সময়…

সেখানে গোলাম রসুল ওস্তাদের কাছে ট্রেনিং নিলাম। সেখানে ১ মাস ট্রেনিং শেষে আমাদের মিশনে দেওয়া হয়। ঢানুয়া কামালপুর ১১ নং সেক্টরে আমাদের পাঠানো হয়। আমার সাথে কোনো গারো বন্ধু ছিল না। সেখানে আমার জানা অনেক সঙ্গী সাথীর নাম আমার জানা আছে। তাদের মধ্যে কোম্পানি কমান্ডার আবুল কাশেম, মতিউর রহমান, এলাহি বক্স, কাজল, আকবর, দিদারিয়া এভাবে আরো অনেকে যাদের নাম এখন আর মনে নাই। আমরা একসাথে বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে যুদ্ধ করেছি। ঢানুয়া কামালপুর ১১নং সেক্টরে থেকে টেঙ্গুরপাড়া, সাবমারি, মহেন্দ্রগঞ্জ, বক্সিগঞ্জ স্কুলের পাশে চেয়ারম্যানবাড়ি এসব এলাকায় আমরা যুদ্ধ করেছি।

যুদ্ধ দিনের কথা…

একদিন ধানুয়া কামালপুর স্কুলে ভীষণ যুদ্ধ হয়। সেই দিন আমরা সারারাত য্দ্ধু করি। পরের দিন দুপুর বেলা যুদ্ধ একটু থেমে যায়। আমাদের জন্য খাবার দাবার কোন কিছুর সাপ্লাই ছিল না। ক্ষিধাা- পিপাসায় আমরা অস্থির হয়ে পড়ি। পানির কোনো বালাই ছিল না। সেখানে আখের বাগান ছিল। ওখানে আমরা ডিপেন্স নিয়ে এক রাইফেল রেখে আরেক রাইফেল দিয়ে আখ থেঁথলিয়ে আখের রস খাই। একজন ছিপড়াইছে একজন হা করে রস খেয়েছে। এভাবে আমরা পানির পিসাপা মিটাই। এমনইভাবে আমাদের দিন গেছে।

যেদিন প্রথম আমরা ডিপেন্স নিয়েছি সেদিন আমরা চেয়ারম্যান বাড়িতে ছিলাম। সেই বাড়িতে কেউই ছিল না। পুকুরের চারিদিকে আমরা ডিপেন্স নিলাম। অর্থাৎ দক্ষিণ দিকটা আমরা ডিপেন্স নিলাম। আসতে আসতে অগ্রসর হয়ে আমরা বাংলাদেশের ঢানুয়া কামালপুর স্কুল, সারমারি, রৌমারী, চিলমারীর দিকে যে রোড গেছে সেই রোডে এসে আমরা ব্যাংকার তৈরি করি। সেখানে আমরা দিন রাত ডিপেন্সেই থাকি। আমাদের টিমে কাজল নামের ছেলেটা খুব ভাল গান গাইতো, ‘চলে যায় যদি কেউ বাঁধন ছিড়ে কাঁদিস কেন মন…’

সেখানে প্রথম যেদিন আমরা ডিফেন্স নিলাম আমাদের আকবর নামে একজন সহযোদ্ধা ছিল। সে সময় কাজল নামের ছেলেটা ব্যাংকারের সামনে দিয়ে দৌড়ে যাচ্ছিল এটা আকবর হোসেন বুঝতে পারে নাই। মনে করেছিল বিহারী দৌড়ে যাচ্ছে তাই সে গুলি করে দেয়। সেই এক গুলিই গিয়ে লাগে কাজলের গায়ে। কাজল সাথে সাথে সেখানেই মারা যায়। কাজলের বাড়ি ছিল গফুর গাও। পরবর্তী যুদ্ধে এমন ভয়াবহ অবস্থা। কঠিন আকারে গোলাগুলি চলছে। বিহারীরা আস্তে আস্তে গুলি করে আর এডভান্স করে। এমন সময় আমি দেখলাম কয়েকজন বিহারী আসতেছে। আমি এলএমজি ব্যবহার করতাম। আমিও এলএমজি ছাইড়া ব্রাশ করি। ব্রাশ করার পরে দেখলাম তিনজন বিহারী পড়ে গেছে। সেই মরার উপর আবারও গুলি চালালাম নিশ্চিত হবার জন্য। তারপর যখন নিশ্চিত হইলাম তারা মারা গেছে তখন আমি তাদের কাছে গিয়ে তাদের অস্ত্র, বেল্ট, হেলমেট, পানির টাঙ্কি, ওয়াটার ব্যাগ সমূহ আমি নিয়ে আসি।

বেল্ট আমি ব্যবহার করতাম। তারপর আমরা যখন আবার ডিপেন্স নিলাম তখন আবার পশ্চিম দিক থেকে আইসা যৌথভাবে আমাদের উপর আক্রমণ করে। আমাদের একই ব্যাংকারে দুই দোস্ত ছিল একজনের নাম আবুল কালাম আজাদ তালুকদার আরেকজনের নাম ছিল আবুল কালাম আজাদ। দুই মিতা, দুজনেরই বাড়ি টাঙ্গাইল। উনারা একসাথে একই ব্যাংকারে দুজন মারা যায়। তাদেরকে আমরা নিয়ে যাই ভারতের চেয়ারম্যান বাড়ির পশ্চিমে তাদেরকে কবর দেই।

যুদ্ধের বিশেষ স্মৃতি…

কর্নেল আবু তাহের সাহেবের পা যেদিন চলে যায় সেদিন কর্নেল আবু তাহের সাহেব আমাকে বলেছিলেন যে, এই এডভান্স! আমি বললাম, স্যার ওদিক থেকে তো আর্টিলারি ফায়ার আসতেছে, গোলাবর্ষণ হচ্ছে যাবো না স্যার। একটু পরে যাই, অন্য দিকে যাই। তিনি বলেন, এই! তোমাকে শ্যুট করবো! তিনি এমনভাবে আমাকে থ্রেট দেন তারপর না পাইরা আস্তে আস্তে অগ্রসর হই যে মুহূর্তে সেই মুহূর্তেই বিশাল একটা শব্দে গোলা বর্ষণ হয় এবং ঐ গোলা আইসা কর্নেল তাহের স্যারের পায়ের উপর পড়ে। সেখান থেকে কর্নেল তাহের স্যারকে নিয়ে আমরা ইন্ডিয়া বান্দুরায় চলে আসি। বান্দুরায় চলে আসার পর খবরাখব দেয়ার পর উনাকে হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয়। কত তারিখ ছিলো তা আমার সঠিক মনে নাই তবে সেদিন ভয়াবহ যুদ্ধ হয়েছিলো। আমার সঙ্গী ছিলো দুইজন একজনের নাম আবুল কালাম আজাদ তালুকদার আরেকজনের নাম ছিল আবুল কালাম আজাদ।

যুদ্ধের সময় আমাদের কঠিনভাবে কষ্ট হয়। প্রচণ্ড ঠান্ডা ছিল। ভাল জামা কাপড় ছিল না। তারপর আমাদের পাঠানো হল ময়মনসিংহ মিশন দিয়ে নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ এই তিন জেলায়। প্রথমে আমরা বিসকা ব্রিজ ভাঙে রেল যোগাযোগ বন্ধ করে দিলাম, কিশোরগঞ্জের পাঠগোদামে আমরা মাইন ফিট করলাম আর উড়িয়ে দিলাম তারপর শ্যামগঞ্জের ব্রিজ ভাঙে তাদের রেশন যোগাযোগ বন্ধ করে দিলাম। এই তিন জায়গায় আমরা অপারেসন করলাম। এর কিছুদিন পরেই সৃষ্টিকর্তার কী ইচ্ছা। আমাদের দেশ স্বাধীন হয়ে গেল।

যুদ্ধ পরবর্তী কাজ…

আমরা সবাই আস্তে আস্তে চলে আসলাম ময়মনসিংহ জেলা স্কুল বোর্ডিং এ। আসার সময় দেখলাম সর্ব সাধারণের মাঝে আমাদেরকে নিয়ে কত আনন্দ উল্লাস। আসলে না দেখলে বিশ^াস করা দায়। আমরা হাঁটতাম চলাফেরা করতাম আর জনসাধারণ আমাদের মুখে খাবার তুলে দিত আর গলায় মালা পড়িয়ে দিত। আবার আস্তে আস্তে রাস্তা ঘাট থেকে ট্যাংক, মাইন এগুলো ডেমিনেশন করতাম। মাটি থেকে আমি নিজে উঠাইতাম। উঠিয়ে আমি ডেট ইউনিটর খোলে দিতাম আর ছুঁড়ে ফেলে দিতাম। অর্থাৎ সেগুলো যে ভ্যালুলেশ তাই বুঝাইতাম। সেগুলো আর ব্রাশ হবে না। নেত্রকোনা থেকে ময়মনসিংহ আসার পথে শম্ভুগঞ্জ থেকে আমি ৫টি এন্টি পারসোনাল মাইন উত্তোলন করি। ভারতীয় এক শিক সেনাকে আমি বলেছিলাম, আপনি এই এন্টি পারসোনাল মাইনটি ডেমিনেসন করতে পারবেন না। এটি করতে যাবেন না। না করা সত্বেও সে যখন মাইনটি ডেমিনেসন করতে গেলো তখন মাইনটি ব্রাশ হয়ে সে মারা যায়। আসলে সেই মাইনগুলি ডেমিনেশন করার কিছু কৌশল আছে। অন্যথায় যে কোন সময় ব্রাশ হয়ে যেতে পারে।

বীরাঙ্গনার কথা…

জামালপুর ঢানুয়া কামালপুরে অনেক বীরাঙ্গনা মেয়ে ছিল। বিহারীরা আমাদের সাথে যুদ্ধ করে পরাজিত হয়ে যখন সেখান থেকে চলে যায় তখন আমরা বিহারীদের ব্যাংকার থেকে তাদের উদ্ধার করি। অনেকে বিবস্ত্র, রক্তাক্ত অবস্থায় ছিল। আমরা আমাদের পরনের জামা কাপড় তাদের জন্য খোলে দিলাম। সেখান থেকে সেই বিরাঙ্গনা মেয়েদের সম্ভবত কোন চিকিৎসা কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়। আমরা আর সেই খবর পায়নি। সেখানে মোট ১১ জন যুবতী, বিধবা, মধ্য বয়সী মেয়ে ছিল। বিহারীরা তাদের ধরে নিয়ে তাদের ব্যাংকারে আটকে রেখে বিভিন্নভাবে নির্যাতন করে।

যুদ্ধ পরবর্তীর স্মৃতি…

আমাদের সর্বশেষ ঠিকানা বলতে ময়মনসিংহ জেলা স্কুল বোর্ডিং আসার পর সেখানে একজন খুবই অত্যাচারী কসাই ছিল। নবা কসাই নাম তার। উনি খুবই সিরিয়াস লোক ছিল। সে অনেক জায়গায় লুটপাট করতো, হিন্দুদের হত্যা করতো, নারী ধর্ষণ করতো। এ সমস্ত কথা শোনে আমরা তাকে ধরলাম। তাকে জেলা বোর্র্ডিং স্কুলে নিয়ে এসে জনসাধারণের পিটুনিতে মেরে ফেলা হয়। এটা দেশ স্বাধীন হওয়ার পরের ঘটনা। জনগণের আদালতে আবার ঘোষণা করা হয় যে, তাকে রেইন ট্রির গাছের ডালে ঝুলিয়ে মারা হোক। মরা মানুষকে আবার ফাঁসি দিয়ে মারা হয়। এটা ময়মনসিংহ জেলা স্কুল মাঠেই হয়। আমি বললাম এটা এখানে রাখা ঠিক হবে না। এটাকে এলাকার বাইরে নদীতে বা অন্য কোথাও দাফন করা হোক এই বলে সেখান থেকে বের করে দিয়েছিলাম।

পরবর্তী একটা ঘটনা কালো সর্দার নামে নেত্রকোনার এক বংশীবাদক ছিল। এই লোকটা হঠাৎ একদিন ধরা পড়লো মুক্তি বাহিনীর একটি কোম্পানির হাতে। তবে ঐ লোকটা আসলেই পাকিস্তানিদের পক্ষে ছিল না। সে পাকিস্তানি বেতারে বাঁশি বাজাতো। এই লোকটাকে রাজাকার মনে করে নকলার বুট কোম্পানির লোকেরা ধরে ফেলে। তাকে মেরে ফেলার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। তাকে নিয়ে যাওয়া হয় শম্ভুগঞ্জ রেল ব্রিজের ধারে। এই সংবাদ পেয়ে আমি দৌড়ে গেলাম সেখানে। সেখানে গিয়ে আমি তাদের বললাম এই তোমরা রাখ তাকে মারতে হয় বাঁচাতে হয় আগে কথা শোন। আমার কথা শোনে তারা আর গুলি করে নাই। তারপর আমি তার কাছে গিয়ে বললাম তোমরা মারতে চাও আমাকেসহ মারো কারণ এই লোকটা আমার। দোষ যদি করে থাকে তবে সে আমার সাথে করেছে। তাকে মারার অধিকার থাকলে আমার আছে। তাকে মারা যাবে না মারতে হয় আমি মারবো। এই বলে আমি তাকে নিয়ে আসলাম আমার কাছে।

তাকে আমার কাছে একমাস রাখার পর আমি আমার কমান্ডারের সাথে কথা বলে তাকে নেত্রকোনা জেলখানায় রেখে আসলাম। তখন দেশ পুরোপুরি স্বাধীন হয়ে গেছে। এ দেশ থেকে বিহারীরা আত্মসমর্পন করে চলে গেছে। তখন জেল থেকে তাকেও মুক্তি দেওয়া হয়। বেশ কিছুদিন পর আমি আবার নেত্রকোনায় যাই। সেখানে সেই লোকটা শুনছে যে দিলীপ আসছে। কোন দিলীপ? আরে তোমারে যে বাঁচাইছিল। আমিও কালো সর্দারের খোঁজ করি। সেও খোঁজ পেয়ে আমার সাথে দেখা করতে আসে। আরো ছিল আনোয়ার আলী। আনোয়ার আলী আড়াই সাহেবের কাছে জিজ্ঞেস করলো, এখানে দিলীপ নামে একজন আমার জীবন দাতা। যে আমাকে বাঁচাইছিল আমাদের জেলায় তার আসার কথা সে কি এসেছে? তখন আড়াই সাহেব বলল যে, যে লোকরে খোঁজতাছেন সেই লোকটা এই যে বইসা আছে। কথাটা শুনেই অমনি সামনে গিয়ে মাটিতে শুয়ে আমার পা জড়াইয়া ধইরা কান্না করতে থাকে। বলে যে এই হল আমার জীবন দাতা। আমাকে তো আর ছাড়ে না। আমাকে তাদের বাড়িতে নিয়েই আসবো। বাড়িতে এনে ছেলে মেয়েদেরকে আমাকে দেখাবে। আমি বললাম এখন তো রাত এখন আর যাবো না, দিনে যাবো। পরের দিন ঠিক আমাকে ধরে নিয়ে গেলো তাদের বাড়িতে। নিয়ে তো খাবার দাবারের বিশাল আয়োজন। অনেক আদর যত্ন করলো। সেই লোকটা এখন আর বেঁচে নেই। তার ছেলে মেয়েরা বেঁচে আছে।

 স্বাধীনতার পরবর্তী সময়…

স্বাধীনতার পরবর্তীতে আমরা ময়মনসিংহ জেলা স্কুল বোর্ডিং এ ক্যাম্প করেছিলাম। তখন পুলিশ বাহিনীতে লোক নিচ্ছিল। আমাদের কোম্পানি কমান্ডার আমাদের বলল যে তোমাদের মধ্যে কে কে পুলিশে যাবে বল। আমরা কেউই রাজি ছিলাম না। পরে আমাদের কমান্ডার একপ্রকার জোর করে আমাদের কয়েকজনকে পুলিশে পাঠিয়ে দিল। সেখানে আমিও ছিলাম। দিন তারিখ আসলো। আমাদের ট্রেনিং এ যেতে হবে। যোগদানের তারিখ জানানো হলো। ট্রেনিং নিয়ে তারপর থেকে পুলিশের চাকরি করেছি।

মুক্তিযোদ্ধের তালিকায় নাম উঠানোর দৌড়ঝাপ…

আমি বর্তমানে শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছি। আমার স্ত্রী খুব ইচ্ছা ছিল যেন আমি মুক্তিযুদ্ধের পূর্ণাঙ্গ স্বীকৃতি পাই। গ্রামের সবাইকে নিয়ে বড় করে একটি অনুষ্ঠান করার পরিকল্পনা করেছিল। কিন্তু তার সেই ইচ্ছা পূরণ হলো না। আমার খুব কষ্ট এখানেই। আমি যদিও মুক্তিযুদ্ধের পূর্ণাঙ্গ স্বীকৃতি পাই তবু আগের সেই আনন্দ, মনোবল আর পাবো না। সেই সময় আমি মুক্তিযুদ্ধের তালিকায় নাম উঠানোর জন্য অনেক চেষ্টা করেছি কিন্তু পারিনি। অনেকে বলেছে নালিতাবাড়িতে যোগাযোগ করো যোগাযোগ করো। সেখানেও যোগাযোগ করলাম অনেক টাকাও খরচ করলাম কিন্তু কোন কাজ হলো না।

শেষের দিকে সুরুজ নামে জলছত্র থেকে আমাদের এক লোক আসে। আমি তাকে বললাম ঘটনাগুলি। সুলভ দফো অনেক যোগাযোগ করলো। লেখা লেখি করলো। তখন সরকারি ভাবে ঘোষণা করলো যে, গ্রামের আনাচে কানাচে এখনও অনেক মুক্তিযোদ্ধা আছে তাদের তালিকা নেওয়া হচ্ছে। তখন আমিও সেই তালিকা প্রদান করি। যাচাই বাচাইয়ের জন্য নালিতা বাড়িতে গেলাম। তালিকা বাচাইয়ের যে প্রদান সে আমাকে বললো যে, আপনি সরাসরি ভাতার জন্য আবেদন করেন। তাদের কথা মতো আমি ভাতার জন্য আবেদন করলাম। কিন্তু এখনো কোন ভাতা পেলাম না। সেখানে গিয়ে খোঁজ নিলে তারা বলে যে, মুক্তিবাহিনীর তালিকায় কোন নাম নাই। গেজেট নাম্বার নাই এইসব বলে পাঠিয়ে দেয়। কল্যাণ ট্রাস্টের নাম্বার দিলাম কিন্তু কোন কাজ হলো না।

তাদের কাছে জানতে চাইলাম আমি কোথায় গেলে আমার জন্য গেজেট নাম্বার পাবো? কিন্তু তারা কিছুই বলতে পারে না। আমি এ যাবত এভাবেই বসে আছি। আর কোন কিছু পাবার জন্য চেষ্টা করি নাই। আমি বর্তমানে পুলিশি যে ভাতা পাই তাই দিয়ে সংসারের যাবতীয় খরচাদি করি। তবে আর্থিক অবস্থা খুবই শোচনীয়। আমি আশা করেছিলাম যে, বাংলাদেশ সরকার আমাকে মুক্তিযোদ্ধার তালিকা ভুক্ত করবে এবং তার উপযুক্ত সম্মান প্রদান করবে। আমার সন্তানরা সরকারি চাকরিতে অংশগ্রহণ করতে পারবে। কিন্তু জানি না আমার সেই আশা সেই স্বপ্ন পূরণ হবে কিনা। এটা এখন সম্পূর্ণ ঈশ্বরের ইচ্ছা।

গারো মুক্তিযোদ্ধাদের আরো খবর

গারো বীরমুক্তিযোদ্ধা : সন্ধ্যা রানী সাংমা

বীরমুক্তিযোদ্ধা নরেন্দ্র মারাক (চাম্বুগং)

যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা সুরেশ মারাক অসুস্থ

লব সাংমা ।। মুক্তিযোদ্ধার মুখচ্ছবি

গারো মুক্তিযোদ্ধা।। ভদ্র ম্রং




সম্পাদক : মিঠুন রাকসাম

উপদেষ্টা : মতেন্দ্র মানখিন, থিওফিল নকরেক

যোগাযোগ:  ১৯ মণিপুরিপাড়া, সংসদ এভিনিউ ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৫। 01787161281, 01575090829

thokbirim281@gmail.com

 

থকবিরিমে প্রকাশিত কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। Copyright 2020 © Thokbirim.com.

Design by Raytahost
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x