Thokbirim | logo

১৪ই ফাল্গুন, ১৪৩০ বঙ্গাব্দ | ২৭শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

গল্প ।। কাঠের পা।। তেনজিং ডিব্রা

প্রকাশিত : নভেম্বর ২৯, ২০১৯, ১৬:৩৯

গল্প ।। কাঠের পা।। তেনজিং ডিব্রা

সেই দীর্ঘ নব্বই দশকে শহরে আসা। হিসেবের খাতায় দুই যুগের অধিক পেরিয়েছে।সেই  সময়ের মানুষ গ্রামের চেনা জানা মুখ রেখে,শহর পাড়ি দেওয়া খামখেয়ালি না।সেই গ্রামীণ জনপদ, নদী-নালা,খালবিল, সবুজে ঘেরা গাছপালা, জরাজীর্ণ মানুষের জীবন যাপন। সব কিছু না ভুলা স্মৃতি গুলো ভুলে যেয়ে, মায়ার বাঁধন ত্যাগ করা।বাধ্য হতে হয় হচ্ছে, নিষ্টুরতায় পারি দিচ্ছে।স্বার্থপর হতেই বাধ্য হতে হচ্ছে আবার কখনও কখনও মন থেকেও মনোভাবহীন হতে হচ্ছে। হ্যাঁ এটাই বাস্তবতা, এটাই না বলা অশ্রু জল। নীরবে সহে যায়। তবুও যেনো অপূরন না বলা কথাগুলো মনের কাছেই গেঁথে রেখে চলে যায়। এই ইট পাথরের দালানকোঠায়।ভালো না লাগা চার দেয়ালের বন্দি জীবন তবুও বাস্তবতার কাছে পরাজিত। অনিচ্ছা  সত্ত্বেও শক্ত মনোভাব নিয়ে বন্দিজীবন কাটাতে বাধ্য। হয়তো সেখানে  আশার আলো দেখার তীব্র আকাঙ্ক্ষা ।আর মনকে একটুখানি নাড়া দিয়ে যায় দারিদ্র্যতা অনটনের ছোয়া। হয়তো কোনো একদিন থাকবে না।পরিবর্তন আসবে,পরিবর্তন হবে।এই না বলা ভাবনা যেনো একটু মনটাকে আশার আলো দেখিয়ে দেয়।এই শহর  কারো কাছে মন ভাঙা- গড়ার শহর, স্বপ্ন  ভাঙ্গা – গড়ার শহর আবার কারো কাছে ভাগ্য পরিবর্তনের শহর।

আমি পারবো, আমি রঙিন আলো দেখবো, নতুন করে স্বপ্ন বুনবো। আমার আছে বিশ্বাস, টিকে থাকার অধম্য শক্তি।

তাইতো চার দেয়ালে বন্দিজীবন। দিন কীভাবে হচ্ছে, রাত কীভাবে হচ্ছে, সূর্য কোন দিকে উদয় হচ্ছে, সূর্যাস্ত হচ্ছে। অদেখা মনের ইচ্ছা বারবার তারা করছে।কিন্তু চারদেয়ালের সীমাবদ্ধতায় হয়না ইচ্ছাপূরণ। নীরব অভিযোগে হয় না ইচ্ছাপোষণ। কখনও চিন্তামগ্ন পরাস্ত মনকে ভুলিয়ে দেয়।  কিন্তু ভুলে যাওয়ার মতো কি আর অভিমান- অভিযোগগুলো।নীরব একাকিত্ব। আবার কিছু নীরবে স্মরণ করিয়ে দেয়।

নিরলস পরিশ্রমী ভাগ্যের পরিবর্তন। বাস্তবতার কাছে বার বার হার মানা তার মন বড়ই স্বার্থপর হয়ে গেছে। বিচ্ছেদ হওয়া স্বামীর সংসার। রেখে যাওয়া সন্তানদের ভরনপোষণ করা। দিশেহারা হয়ে যাচ্ছে জীর্ণ এই কাতর দেহ,ঝুলে যাওয়া চামড়া। তবুও রেখে যাওয়া সন্তানদের মানুষের মত মানুষ করে জীবনের শেষ ইচ্ছার আবদার। আরাম আয়েশে থাকার প্রবল ইচ্ছা।সন্তানদেরকে নিয়ে দুচোখে স্বপ্ন ভরা আশা আকাঙ্ক্ষা। সন্তানেরা মায়ের মুখ উজ্জ্বল করবে।না বলা কথাগুলো সন্তানের কাছে আবদার হয়ে থাকবে।তাইতে, রোদের আলো না দেখা চার দেয়ালের বন্ধ  হওয়া।দুপায়ের চারুকলার কাজ বন্ধ করে।কোনো একসময় আয়েশে দিন যাবে।অস্হির দু-পা সন্তানের সাফল্যে একসময় স্থীর হয়ে যাবে। মায়ের শত ইচ্ছা আবদার নিজের মধ্যে জমে আছে। পারে না বলতে তার সন্তানদের। মুখ ফসকে বলার খুবই সংকীর্ণ সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে।তাদের  অগোছালো জীবন, দায়িত্বহীনতায় রয়ে গেছে।

কে শুনবে তার কথা।পাড়া- মহল্লায় বলতে গেলেই সবাই হতবাক হয়ে যায়।এত বড় বড় সন্তান থাকতেও আজ তোমার এই বেহাল অবস্থা।

সত্যি তুমি এক অভাগিনী জননী,

সন্তান থেকেও নাই তুমি,

এ কেমন অভাগিনী,

পায়ের ধুলা এখনও সারেনি।

অভাগী দুর্দশা সময় যে বড়ই কষ্টে পার হচ্ছে। এই শহরে ঠিকে থাকা বড়ই দায়। এমন পরিস্থিতি সময়ে কর্মের অবসান আসবে। এটা আশাহত।

সেই চার দেয়ালে বন্দিজীবন জীবনের চাকুরে। ইউরোপী মহাদেশের জার্মান দেশের তার বস। তার ছেলের বয়সী জার্মান বস ছিলো।মা ছেলের মতো সম্পর্ক ছিলো। তার ছেলের মতো বড্ড বেখেয়ালি-বেহিসাবি। সে কখনও কল্পনা করতে পারেনি হঠাৎ এই দেশের শহর ছেড়ে একবারে চলে যাবে তার জন্ম স্থানে। কিন্তু শহরের যা পরিস্থিতি। এই সময় না থাকাটাই শ্রেয়।শহরে প্রতিনিয়ত খুন, ডাকাত, দস্যু, গুম, প্রকাশ্যে গুলাগুলি বাটপারে পরিপূর্ণ শহর।কবে এক দলীয় সন্ত্রাসী এসে হামলা করে তার কোনো নিশ্চিয়তা নেই,নেই কোনো নিশ্চিত নিরাপত্তা। বড্ড খারাপ সময় যাচ্ছে।

যে চলে যাবে সে-কি আর ফিরে আসবে কি? এই দেশের কিছু অভাগা মানুষের দিকে কি আরো তাকাবে কি? হয়তো না।

বড্ড অভিমান নিয়ে চলে যাবে।কার দারিদ্র্যতা ঘুচবে,কার কপাল খুলবে। এই কথা ভাবার সময়তো আর তার নেই।

সে চলে গেছে,  পরিবারে দেখা গেছে ফাটল।অভাবের জোয়ার  চারদিকে ভাসছে।পরিবারে দুর্বিষহ নামছে।তবুও সব কথা লুকায়িত কান্নার মাঝে হাসি,কষ্টের মাঝে সুখ ভালোর মাঝে খরাপ সব মিলিয়ে দিন পারাপার হচ্ছে। আবার একের পর এক ঝামেলা নেই কোনো শেষ। সন্তানেরা অঘটন করেই চলছে।জৈষ্ট্য সন্তানের নিষ্ঠুরতায় হয়েছে আরেকটি বিচ্ছেদ ।বিশাল অট্রলিকায় সাজানো মন বিচ্ছদে ধরে গেছে ফাটল।

যে চলে যাওয়ার চলে যাক।যে বিচ্ছেদ হওয়ার হয়ে যাক।চলে যাওয়া সন্তানের আশা ছেড়ে দেয়। নিজের মতো করে বাঁচি। এবার বাকি সন্তানের আশায় গুছিয়ে নেবো ফেলে আশা দুঃখ কষ্ট। আকাশ ছোয়া ভাবনা ভোর যেনো মনকে বারবার সান্ত্বনা দিয়েই যাচ্ছে।

সময় নিজ গতিতেই অতিবাহিত হচ্ছে।  সময়ের সাথে পাল্লা দিয়েই জীবন সংগ্রাম সাথে সংসার ভরনপোষণ চলছে। কিন্তু অপূরণীয় হলেও সত্য হয়ে দাঁড়ায়। বাকি সন্তানের উপর  সংসারের চাপ।চাকরি করার তাগিদ। কিন্তু চাইলেই কি আর পাওয়া যায়। যুগের বিবর্তনে চাকরি সন্ধান বড়ই কঠিন। না পারছে একাডেমিক  শেষ করতে, না পারছে লাগাম ধরতে।দ্বিধা দণ্ড যেনো প্রতিনিয়ত খুঁড়ে খুঁড়ে খাচ্ছে। তবুও তারা ছায়ার আশ্রয়টুকু সুনিশ্চিত পায়।পায় অনুপ্রেরণা অন্যনা শক্তি। দিন – কাল- সময় তোমার সাথে সবসময় নিষ্ঠুরতা দেখাবে না।আজকে না হয় মেঘলা দিন কাল ঠিকই সূর্য উদয় হয়ে যাবে।

দু-চার মাসের ভাবনা পেরিয়ে এবার নতুন চাকরির সন্ধান পেলো।

দিন ঘনিয়ে সময় চলে এসেছে। চাকরি পাবার কঠিন এক ইন্টারভিউ। কিন্তু কত শর্ত, বাহানা, নিয়মাবলি। এ যেনো কোনো এক কারাগারে কয়েদিদের জেল কাঁটার বিদ্বান। পাখিরা ঘুম থেকে উঠার আগে ভোরে জাগা।সেই ভোরের মধ্যেই যথাসময়ে কাজে উপস্থিত হওয়া।আবার মনিবের বিদ্বান মোতাবেক কাজে ঘাটতি থাকলে,যথাসময় কাজে উপস্থিত না হলে মাইনে কর্তন করা।

কাজের তুলনায় মাইনে আশা বড়ই নগন্য। তবুও সংসারের বেহাল অবস্থা সময়ে না করাটা বড়ই বোকামি।

ত্যাগই মাধ্যমে  শান্তি খুঁজে নিতে হয়।এটাই শ্রেষ্ট সময়।

তাইতো সমস্ত কিছু ত্যাগের মাধ্যমে ইচ্ছা শক্তিকে কাজে লাগিয়ে মনকে স্থির করে কাজে ঝাপিয়ে পরা।

বেশতো এবার দিনটা ঘনিয়ে আসছে।দিনটা বৃহস্পতিবার, শুক্রবারের রাত পোহালে শনিবার। শহরে বেঁচে থাকার কঠিন সংগ্রাম।

হাতে নেই কোনো টাকা কড়ি।চারিপাশে লেনদেনে ভরপুর।

তাইতো না পারে রিক্সা চড়ে,

না পারে বাইক চড়ে,

না পারে বাসে চড়ে।

সেই সুদূর কাজের স্থানে যাওয়ার একমাত্র বাহন হয়ে দাড়ায় “দুটি পা”।

এটা যেনো তার দামি গাড়ি, বাইক, বাসের চেয়েও অতুলনীয় মুল্যবান দুটি পা।যা পরিবারের সুখ ফিরিয়ে আনার একমাত্র বাহন। এই দুটি পা যেনো পিচ ঢালাইয়ের পরিচিত বাহন।আবার এই পা শহরে বেঁচে থাকার আরেক অবদান। তাইতো পুরো শরীর যত্ন রাখার চেয়ে পা দুটির যত্ন রাখাটাই বেশি জরুরি হয়েছে। বয়সটা অনেক হয়ে যাচ্ছে। পা কি আর এই বয়সে চলতে চাই। আগের মতো আর চঞ্চলতা যৌবনা বয়স আছে।দুইশো ছয়টি হাড়ে ধরেছে ফাটল। ক্যালসিয়ামের ঘাটতি ধরেছে প্রত্যেকটা হাঁড়ে। এবার  এক এক করে হাঁড়গুলো ক্ষয় হওয়ার বায়না ধরছে।কখনও হাঁড়ের অস্বস্তিকর ব্যাথা,যন্ত্রণা দিন দিন বেড়েই চলছে।তবুও মনের প্রবল ইচ্ছা শক্তির কাছে হার মানে।শরীর ক্ষয় হয়ে নিপাত  যাক।শরীর কাজে আসুক আর না আসুক।দুটি পা কাজে আসলেই হলো।বাহন হয়ে সবসময় সর্বোচ্চ কাজে আসতেই হবে।কেনো কমতি হওয়া চলবে না।আর এটাই শহরে থাকার প্রতিজ্ঞা।

মাঝে মাঝে দীর্ঘ রাত ঘুমোতে দেয় না।প্রতিরাতে অনুভব করে,

এই হাত আর আগের মতো শক্তি নেই,

শরীর আগের মতো ঠাঁই পাচ্ছে না,

পা দুটি পাড়াই পাড়াই ঘরে বেড়ানো,দলছুট, গোল্লাছুট, দৌড়ানোর শক্তি আর নেই। তবুও প্রতিনিয়ত পরিবার, সংসারের দিকে তাকালে মনে হয়।যতই শরীরে ব্যাথা অনুভব হোক না কেনো।আমার পা নিজস্ব গতিতে চলতেই হবে।

কাক ডাকার আগে,মোরগ ডাকার আগে ঘুম থেকে উঠেই কাজে বেরিয়ে পড়া।এটাই নিয়মিত কর্তব্য।

ইচ্ছে নেই ভোরে উঠার,ইচ্ছে নেই কাজ করার। এই কথা শোনার কেউ নেই।বলবে আর৷ কাকে?

সারাদিন মবিল বিহীন গাড়ি চালানোর পর যখন দিনের শেষে গাড়িটা অচল হয়ে পড়ে।ঠিক তেমনি  দিনের শেষে বাহিরে কাজের শেষে বাসায় ফিরে।সারা রাস্তার নিস্তব্ধতা আবরণের ছাপ বাসায় নিয়ে আসে।তখন এক নিঃশ্বাস নিয়ে তার সন্তাদেরকে বলে উঠে।

-বাবা গো! ও মাগো!

-আর কত কাল?

-আর কত কাল আমি এই কষ্ট ভোগ করবো?

-আমার জানে জানি কুলায় না আর।

-যায় যায় অবস্থা।

পায়ের কারুকাজ তো আর চলতে চাচ্ছেনা।কি করে আগলে রাখবো তোমাদের। আর কতকাল আগলে রাখবো তোমাদের।

মায়ের কষ্টের কণ্ঠে সন্তানদের কাঁদো কাঁদো অবস্থা। কিন্তু, সন্তানের এই সময় কী আর করার থাকে।শান্তনা দেওয়া ছাড়া।সময়টা বড্ড খারাপ যাচ্ছে।

এক দীর্ঘ নিঃশ্বাস নিয়ে নিয়ে বিছানায় দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় চিৎ হয়ে শুয়ে পড়ে।তখন তার সন্তানদের কাছে আবদার করলো।

-বাবা গো!  মা গো!

– আমার কথা শোনো গো!

-আমার আবদারটুকু শোনো গো!

-পায়ের ব্যাথায় বেশ অসহ্য হয়ে যাচ্ছি।

-একটু আমার কাছে আয় না!

-বাবারা-মায়েরা

-আমার  “পা “টা টিপে দাওনা?

অনেক ব্যাথা অনুভব করছে ।মনে হয় আমার পায়ে ও শরীরের প্রত্যেকটা হাঁড়ের মধ্যে ক্যালসিয়ামের ঘাটতি ধরেছে।

সন্তানেরা চুপচাপ মায়ের অভিমানী কথা শুনে টোটা মুখ বোটা হয়ে আছে।মায়ের  চিকিৎসার দায়িত্ব নেওয়ার মতো এখনও তারা নিজের মতো করে সাবলীল হয়নি।কর্মহীন জীবন যাপন মধ্যে এখনও বহমান। চুপচাপ সবাই। কোথাও সাড়া শব্দ নেই। মায়ের কথাগুলো সন্তানদের কাছ যাচ্ছে না-কি অন্য কোথাও যাচ্ছে। কথার কোনো প্রত্যুত্তোর নেই, কোথাও যেনো কেউ নেই।তবুও মনকে সান্ত্বনা দেওয়ার অবলম্বন মাত্রই।নেই খাওয়া, নেই গোসল, যত্নহীন শরীর ঝুলে যাওয়া চামড়া। এই বুঝি দারিদ্র্যের ছাপ মুখে ভেসে উঠছে।

-ক্লান্ত শরীর নিয়ে শুয়ে শুয়ে  আবদার।

-কে কোথায় আছিস রে!

-তোরা কি আমাকে দেখতে আসবি না রে!

-সারাদিন কোথায় তৈ-তৈ করে ঘুরে বেড়াও,সারাদিন মোবাইল টিপানোর আসক্তি হয়ে গেছিস তোরা!

-তোরা কি আমায় যত্ন নিবি না?

-তোমরা যে কেমন হীনমন্যতার  মানুষ। আমার বংশেতো এই রকম হীনমন্যতার মানুষ ছিলো না।তোরা কেমনে হলি।

রাগান্বিত ও ক্লান্তি শরীর নিয়ে কথা গুলো দুর্বল কণ্ঠ স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। তবুও দুর্বল কণ্ঠের বকাবকি পুরো বাড়ি তোলপাড় হয়ে যাচ্ছে। পাশের বাড়ির ভাড়াতেরা মা-সন্তানের সমালোচনায় ব্যস্ত হয়ে পড়ছে।এরা যেনো সুযোগ সন্ধানী লোক।

দুর্বল কণ্ঠের তুলকালাম আওয়াজে তার সন্তানেরা যেনো লাগাম ছেড়ে কাছে ছুটে আসা।

কেউ বা ভীতু, কেউবা গম্ভীর ভাব।নিঃশব্দে সবাই এক এক সারি করে দাঁড়িয়ে আছে।মায়ের পূজায় করার মতোই দৃশ্যতা। কে কি বলবে, কি লুকাবে আগাম কোনো পরিকল্পনা নেই।

-এবার মৃদু স্বরে সন্তানদের বলে উঠলো

-তোরা আমার পা টা একটু টিপে দাও না!

সেই দীর্ঘ রাস্তা হেঁটে হেঁটে শরীর বড়ই ক্লান্ত। পায়ের ব্যাথা অস্বাভাবিক হয়ে উঠছে। শত অভিযোগ অভিমান সন্তানের কাছে।কিন্তু তাদের কাছে সেগুলো শুধু শুনে যাওয়া।অভিযোগ অভিমানের কোনো ভাষা নেই।

বলার সাথে সাথে সন্তানেরা মায়ের পা টিপা ও মালিশে ব্যস্ত হয়ে পড়লো।কেউবা মন খারাপের আবেশে গভীর অশ্রুহীন আর্তনাদ করছে।কিন্তু চোখের সামনে ভাসছেনা আর্তনাদের জল ও আওয়াজ। নিতান্তই নিশ্চুপ গম্ভীর মন।

সন্তানের মালিশে এক দারুণ  আরামের অনুভুতি মায়ের শরীরে। এই অনুভুতি দেখে সন্তানেরাও গভীর আর্তনাদ মনে বেশ হাস্যজ্জ্বোল চোখে,মুখে ভেসে উঠছে।

এমন সময়ে তার ছোট মেয়েটা বলে উঠলো।

-মা! ইস!

-তোমার পা এতো শক্ত কেনো?

-এতো পা নয়! এতো শক্ত কি করে হয়?

-মা!  তোমার পা কি কোনো কাঠ দিয়ে বানানো পা নাকি?

-যতই জোরে টিপছি কোনো নরম পায়ের আবাশ পাচ্ছি না।পুরো পায়ের জায়গাটা যেনো হাড় দিয়ে ঢাকানো।পায়ে কোনো বডির ছিটেফোঁটা দেখছিনা।

-মনে হচ্ছে এ তো পা নয়।কোনো নামি দামি কাঠমিস্ত্রীর হাত দিয়ে, পায়ের করম তৈরি করে আনা কাঠের পা।

-মা! তুমি এই পা দিয়ে সুদুর রাস্তা হাঁটো। তারপরেও তোমার পা এ সুন্দর কী করে হয়? আমার পায়ের মতো যত্নতো তুমি নেও না। তবুও আমার পায়ের চেয় তোমার পা বেশ সুন্দর।

-মা! তোমার এই দুটো পা যেমন সুন্দর তেমনি নামটা বেশ চমৎকার।

-ইস রে! পায়ের পাতার গোড়ালিও দেখছি বেশ দাঁড়ালো। আমার নরম কোমল হাতটা ঘষা দিয়ে চামড়া লাল করে দিলো।কি একটা অবস্থা।

-মা! তোমার পায়ের গোড়ালি এতো দাঁড়ালো কী করে হলো?

-মা বলে উঠলো! সুদূর রাস্তায় হাঁটাহাঁটি করলে কি পা কি নরম থাকবে? শক্ত হবে এটাই স্বাভাবিক।

-মা! এই পায়ের সুন্দর নাম দেওয়া যায়।তবে একটু চিন্তা করে নামটা  দিতে হবে। কী দেওয়া যায়, কী দেওয়া যায়?

হু! মাথা ঠিক মতো খেলছে না! কী নাম দেবো, ভেবে পাইনা।

ও সেজো দাদা? ও সেজো দাদা?

একটু শোন না! আমার কথা।

কানের হেডফোনটা খোলো না একটু! আমি তোমার সাথে কথা বলবো!

-মায়ের এই পা দু’টির একটু সুন্দর করে নামকরণ কর না? কি দেওয়া যায়!

-বোনের কথা শুনে সেজো হাস্যজ্জ্বলে মায়ের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসি দিয়ে, ঠাট্টা করে বললো-

-কি নাম দেবো?  বলো?

-মায়ের নাম কি বিকৃত করা যায়? তুমিই বলো?

-মা-তো মা। অন্য নাম দিয়ে তুলনা যায় না।

-তবুও তুমি যখন আবদার করছো নামটা দিতেই পারি।

-কী বলো মা?( সম্মতি)

– পা দুটি যেহেতু তুমি শক্ত কাঠের রূপ দেখতে পারছো।সেহেতু তুমি এটাকে ” কাঠের পা ” দিলেও তো খারাপ হয় না।

-এই কথা শোনার পর কি কেউ না হেসে পারে।হাসিটা সারা বাড়ি কম্পন হয়ে উঠলো।পাশের বাড়ির ভাড়াতেরা কোতুহল হয়ে দেখতে এলো।

-এবার কি সত্যি এই ভাড়াতেরা পাগল হয়ে গেলো নাকি।

-বাপ রে বাপ!

-এতো হাসাহাসি  এতো আনন্দ। সবাই কোতুহল হয়ে জিজ্ঞেস করছে,

-কী ব্যাপার তোমাদের?

-তোমরা আমাদের কিছু বলো না এত হাসাহাসির মানেটা কি?

তা তোমরা বুঝবে না। এটা অনেক কাহিনি।কাঠের পা তোমরা দেখ নাই। কাঠের পায়ের জন্য আমরা হাসাহাসি করছি।

ভাড়াতেরা সুঃষ্পষ্ট উত্তর না পেয়ে। আজব পরিবারের আজব লোকটো সবাই। এই বলে চলে যাচ্ছিলো।

-পাশ থেকে মেয়টা বলে উঠলো, ওটা তোমরা বুঝবে না।

-এই কাহিনির মারপ্যাঁচ অনেক আছে।তোমাদের বলে বোঝাতে পারবো না।

-বেশ! এবার সেজো তার বোনের মাথায়”কাঠের পা” নামক শব্দটা মাথায় ঢুকিয়ে দিলো।ঠাট্টা করে বলা সেই কাঠের পা নামটা মাথা  থেকে কিছুতেই দূর হচ্ছে না।কথার মাঝে, কাজের মাঝে ঘুরে ফিরে মায়ের সাথে মজা নিচ্ছে।

-আমার মায়ের কাঠের পা।

সারাদিন কাজের শেষে ক্লান্ত, রাগান্বিত শরীর নিয়ে যখন বাড়ি ফিরে।তখন মা কি মেয়ের কাছে রাগান্বিত হয়ে থাকতে পারে।শত ব্যস্ততা,পরিশ্রমের পর যখন মুখে হাস্যজ্জ্বোল দেখতে পায়।এটাই সন্তানদের অনুপ্রেরণা হয়ে থাকে।সেটাই হয়তো একদিন সার্থক সফল হবে। এটাই হয়তো পৃথিবীর সকল মায়ের চাওয়া।

সফলতার সবচেয়ে বড় অবদান হয়ে থাকবে “কাঠের পা “। যা মায়ের কাঠের পা এর সমতুল্য সন্তানেরা কোনোদিন হয়নি।সেই “কাঠের পা” এর পরিশ্রম প্রত্যেকটা সন্তানদের কাছে চির ঋণী হয়ে থাকবে। যা অপরিশোধিত হয়ে থাকবে।

কভার ছবি সংগ্রহ

তেনজিং ডিব্রা: তরুণ লেখক




সম্পাদক : মিঠুন রাকসাম

উপদেষ্টা : মতেন্দ্র মানখিন, থিওফিল নকরেক

যোগাযোগ:  ১৯ মণিপুরিপাড়া, সংসদ এভিনিউ ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৫। 01787161281, 01575090829

thokbirim281@gmail.com

 

থকবিরিমে প্রকাশিত কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। Copyright 2020 © Thokbirim.com.

Design by Raytahost