Thokbirim | logo

৮ই বৈশাখ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ | ২১শে এপ্রিল, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

১৯৬৪ ৬ই ফেব্রুয়ারির ট্র্যাজিডি ।। সরোজ ম্রং

প্রকাশিত : নভেম্বর ২৪, ২০১৯, ১১:৩৬

১৯৬৪ ৬ই ফেব্রুয়ারির ট্র্যাজিডি ।। সরোজ ম্রং

সীমান্ত লাগুয়া সাবেক ৬টি থানা শ্রীবর্দী লালিতাবাড়ি হালুয়াঘাট দুর্গাপুর ও কলমাকান্দার আদিবাসীদের জাতীয় জীবনে ১৯৬৪ সাল ৬ই ফেব্রুয়ারির আদিবাসী গণহত্যার ঘটনা আলোয় উজ্জ্বল হয়ে জেগে আছে এক ভয়ংকর কালো দিবস হিসেবে। ১৯৬৪ সালের সাস্প্রদায়িক দাঙ্গা ও আদিবসীদের বিতাড়নের ঘটনা বহুল দামাল দিনগুলো মনে হয়ে সময়ের আলোয় রাঙা সজীব স্মৃতির ক্যানভাস যা দীর্ঘ সময়েও ধূসর হয়নি, মুছে যায়নি জাতীয় স্মৃতি থেকে। অথচ দিনটির গুরুত্ব তাৎপর্য ও মর্যাদা নিয়ে আনুষ্ঠিকভাবে আলোচিত হওয়ার, জাতীয় শোক দিবস বা কালোদিবস হিসেবে শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের, আদিবাসী বিতাড়ন ও হত্যার নীলনক্সা হিসেবে বিবেচনার আওতায় আনার প্রয়োজন অনুভূত হয়নি আজও।

আগামী প্রজন্ম ভুলে যাবে রাষ্ট্রের এই ঘৃণ্য নীলনক্সা অমানবিক মর্মস্পর্শী, জাতীয় ট্র্যাজিডির সেই ঘটনা অজানা থেকে যাবে এ দেশে আদিবাসীদের সংখ্যালঘু করণের অশুভ প্রেক্ষাপট। তাই আগামী প্রজন্মের শক্তভিত রচনার স্বার্থে শোকাবহ এই দিনটি অমর অম্লান, চিরজীবি ও আলোকিত করে রাখার স্বার্থে, আজকের সচেতনতার পতাকাবাহী ও আদিবাসী সুশীল সমাজকেই এগিয়ে আসতে হবে শুভ ও মহৎ উদ্যোগ নিয়ে। অতএব ৬ই ফেব্রুয়ারি আদিবাসীদের জাতীয় শোকদিবস ও আদিবাসী হত্যা দিবস হিসেবে রূপায়নের প্রস্তাবনার নিরিখেই এই লেখার অবতারনা।

তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের এই অঞ্চলের আদিবাসীদের উচ্ছেদ ও বিতাড়নের লক্ষ্যে গৃহীত প্রথম টার্গেট হচ্ছে ১৯৫০ সাল। এই সময় কম্যুনিস্ট হাজংদের দমনের নামে হাজংদের এদেশ থেকে সমূলে উৎখাত ও বিতাড়নের সিদ্ধান্ত নেয় পাকিস্তান সরকার। হাজার হাজার হাজংরা পালাতে থাকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. নিম চন্দ্র ভৌমিকের মতে, এ সময় ৭০ হাজার হাজং ও ৭৫ হাজার গারো দেশ ত্যাগ করেছিলেন। সরকারের এমন নগ্ন ও বিমাতাসুলভ আচরনে এই সময় শিক্ষিত গারোদের এক বিশাল অংশ প্রথম দেশ ত্যাগ করেছিল। এরপর দ্বিতীয় টার্গেটটি ছিল আরো নির্মম আরো পাশবিক, সালটা ১৯৬৪ সাল। এই সময়েই এ অঞ্চলের আদিবাসীদের জাতীয় অস্তিত্বের স্তম্ভ ভেঙে গুড়িয়ে তছনছ করে দেয় পাকিস্তান সরকার। কেঁপে উঠে এ আদিবাসী অঞ্চল । রাষ্ট্র ও প্রশাসনিক শক্তির মদদ পুষ্ঠ একপাশে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার নগ্ন থাবায় ক্ষত বিক্ষত ও রক্তাক্ত হয়ে পড়ে হাজার বছরের আদিবাসীদের এই স্বপ্নভূমি। রাষ্ট্র নামক দানব থেকে প্রাণ বাঁচাতে নিরীহ আদিবাসীরা জননী জন্মভূমিশ্চ স্বর্গাদপী গরিয়সী ছেড়ে ভিন্ন রাষ্ট্র ভারতের সীমান্ত পথে পা বাড়াল সীমান্ত রক্ষী ইপিআর বাহিনীরা অসংখ্য আদিবাসীদেও নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করেছিল। এর মধ্যে শুধু ৬ই ফেব্রুয়ারীতেই শিশু নারীসহ ২০ জনকে আধিক আদিবাসীদের নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।

আদিবাসী সংহারের এসব স্মৃতি রোমন্থনে প্রত্যক্ষদর্শীরা ভয়ে আতঙ্কে শিউরে উঠে আজো। এই শ্বাসরুদ্ধকর সাস্প্রদায়িক দাঙ্গা ও সন্ত্রাসের কালপর্বেও জীবন্ত চিত্রের কাহিনি মানুষকে হতবাক ও বিম্মিত করে তোলে। অতীত ইতিহাস পর্যালোচনা করওে দেখা যায় এর আগে আদিবাসীরা কখনই এ ধরনের মহাবিপর্যয়ের মুখোমুখী হয়নি। কাজেই ৬ই ফেব্রুয়ারির এই দিনটি শ্রদ্ধায় চিরভাস্বও, চিরস্মরণীয় ও বরণীয় করে রাখার স্বার্থে সচেতন যুব ছাত্র সমাজ সুশীল সমাজ ও নীতিনির্ধারক সমাজের দৃষ্টি আর্কষণ করছি। আর এই স্বর্ণদার উন্মোচনের শুভ ও মহৎ সিদ্ধান্তকে গণতান্ত্রিক মানবতাবাদী দেশের বুদ্ধিজীবী, সুশীল সমাজ, লেখক গবেষক সাংবাদিকসহ অগ্রসর অংশের সব প্রগতিশীল নাগরিক সমাজের কমিটমেন্ট। একই সাথে গণতান্ত্রিক সরকার দায়িত্ব ও কর্তব্য একে স্বীকৃতি ও মর্যাদা দান করা এবং পৃষ্ঠপোষকতার জন্য স্বেচ্ছায় উদারভাবে হাত বাড়ানো। কেননা বিষয়টি শুধু আদিবাসী হত্যা নয়, দেশের ভেতর একটি জনপদেও নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের শিকড় উৎখাত নয়, এটি একটি ইতিহাসকে, একটি সভ্যতাকে, সংস্কৃতির বৈচিত্রকে হত্যা করাও বটে।

৬ই ফেব্রুয়ারির ট্রাজিডির রাজপথ ধরেই এগিয়ে এসেছে এই দেশে, এই এলাকায়, আদিবাসীদের সংখ্যালঘু করনের সাম্প্রদায়িক সরকারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত। আদিবাসীদের হাজার বছরের শেকড় সে থেকেই উপড়ে যেতে থেকে, আদিবাসীরা উধাও হতে থাকে, উচ্ছেদ হতে থাকে, বিতাড়িত হতে থাকে নিজস্ব আবাসভূমি থেকে। এভাবে আগনতান্ত্রিক, সাম্প্রদায়িক সরকারের সৃষ্ট আদিবাসী শূন্যকরণের। কেয়ামতের কালপর্ব টিকে থাকা অবশিষ্ট আদিবাসীরা সংখ্যা লঘু হয়ে ঐতিহাসিক প্রত্নতত্ত্ব হয়ে দাঁড়িয়ে আছে হাবিয়া দোজকের উপর। এরপরও তৃপ্ত নয় রাষ্ট ও সরকার। এই প্রশ্নতত্তের উপর গুজব নাজিল করছেই্ জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা আদিবসীদের স্বার্থ ও অধিকার রক্ষায় সোচ্চার হয়ে উঠেছে। জাতিসংঘ বিশ্বেও আদিবাসীদের সাহস ও স্পিরিট জোগাচ্ছে, ছায়া দিচ্ছে, আলো দিচ্ছে। সে আলোয় আলোকিত হয়ে বাংলাদেশের আদিবাসীরাও জেগে উঠেছে নিজস্ব স্বার্থ ও অধিকার রক্ষায়। বৃহত্তর ময়মনসিংহের লড়াকু আদিবাসীদের জন্য বিশেষ শুভবার্তা রয়েছে। বার্তাটি হচ্ছে ৬ই ফেব্রুয়ারির অনাদরে অবহেলায় ওয়ারিজ হয়ে থাকা পানিহাটা পেকামারার আদিবাসী শহিদদের রক্ত, রক্তগোলাপ হয়ে আপনাদের পিছু ডাকছে কী, শুনতে পাননা শহিদ আত্মা ডাকছে কান পেতে শুনুন। পেছনের দিকে তাকিয়ে দেখুন। আসুন আমরা এদের বরণ করে নেই।

১৯৪০ সালের মুসলীম লীগের লাহোর প্রস্তাব পাক-ভারতের ইতিহাসে একটি ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে বিবেচিত। এই লাহোর প্রস্তাবের অন্যতম দিক ছিল পাকভারতের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের স্বার্থ ও অধিকার সংরক্ষণ। এই সুপ্রসিদ্ধ প্রস্তাবের দ্বিতীয় প্রস্তাবে বলা হয়েছিল- যেসব অঞ্চল নিয়ে রাষ্ট্রসমূহ গঠিত হবে সেসব অঞ্চলের মুসলিম ছাড়াও অন্যান্য সংখালঘু সম্প্রদায়ের ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, শাসনতান্ত্রিক এ অন্যান্য অধিকার ও স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য তাদের সাথে পরামর্শ করে যথোপযুক্ত কার্যকরী ও বাধ্যতামূলক রক্ষাকবচের ব্যবস্থা সংবিধানে পর্যাপ্ত বিধান থাকতে হবে। এই লাহোর প্রস্তাবগুলো জাতিসংঘের আদিবাসী অধিকার বিষয়ক ঘোষণা থেকে বেশি শক্তিশালী ও কার্যকরী প্রস্তাব। অথচ এই মুসলিম প্রতিনিধিগণ ভারত পাকিস্তান বিভক্ত হবার পরই এসব উচ্চমানের প্রস্তাব ভুলে গেলেন? নাকি ভুলে যাবার ভান করলেন? বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলার উত্তরাঞ্চল সাবেক ৬ টি থানা দেয়ানবাঞ্জ শ্রীবর্দী, নালিতাবাড়ি, হালুয়াঘাট, দূর্গাপুর ও কলামাকান্দা আদিবাসীদের স্বার্থ ও অধিকার রক্ষার লক্ষে ব্রিটিশ সরকার আংশিক শাসক বহির্ভূত এলাকার স্বীকৃতি ও মর্যাদা দিয়েছিল।

পাকিস্তান সরকার আদিবাসী সংখ্যালঘুদের জন্য গৃহীত বাধ্যতামূলক এই রক্ষাকবচটি বাতিল করে দিয়েছিলেন ১৯৬২ সালে। এর নামই কী তাহলে লাহোর প্রস্তাব? লাহোর প্রস্তাবে সংখ্যালঘুদের যে স্বার্থ ও অধিকারের কথা বলা হয়েছিল তা কি আদিবাসীদের জন্য মূলা ঝুলানো হয়েছিল? না কি ফায়দা লুঠে নেয়ার একটি পলিসি বা ধাপপাবাজী ছিল মাত্র? সেটা যে আসলে ধাপ্পাবাজি তার প্রমাণ হচ্ছে ময়মনসিংহের আদিবাসীরা। ১৯৬২ সালে ময়মনসিংহের আদিবাসীদের জন্য বাধ্যতামূলক রক্ষাকবচ বলবৎ রাখার বদলে বাতিল করলেন। সে সাথে আসাম প্রত্যাগত মোহাজেরদের কেবান পরিকল্পনাপ ও নীতিমালা না নিয়েই গারো অধুসিত এলাকায় হিংসার বাঘকে লোকালয়ে ছেড়ে দেবার মত করে ছেড়ে দিলেন।
বাংলায় এত এত জায়গা থাকতে এই মোহাজের গারো অধ্যুসিত এলাকায় ঠেলে পাঠিয়ে দেয়ার কারণ উদ্দেশ্য সহজেই অনুমান করা যায়। অনুমান করা যায় রাষ্ট্র ও সরকারের মনোভাব ও দৃষ্টিভঙ্গি। মুসলিমদের আল্লাহ ও হিন্দুদের জন্য ভগবানের কি রহমত তা ভাবাই যায় না। তাদের জন্য এ রহমত না থাকলে কী আদিবাসীদের দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়? নিশ্চয় হয় না।

ভগবানের দেশ ভারতের আসাম রাজ্যে মুসলিম প্রজাদের উপর ভগবানের নেক নজর পড়লো। হাজার হাজার মুসলিম প্রজা বিতাড়িত হয়ে ১৯৬২ সালে আল্লাহর রাষ্ট্র পাকিস্তানে আশ্রয় নিলেন। ভগবানের রাজ্য থেকে মুসলিমরা বিতাড়িরত হয়েছে, কাজেই আল্লাহর রাজ্য থেকে বিজাতীদের তাড়ানো জায়েজের কাম বলে মনে করলেন পাকিস্তান সরকার। পুনর্বাসনের কোনো নীতিমালা ও পরিকল্পনা ছাড়াই উদ্দেশ্য প্রনোদিতভাবে হিন্দুদের উপর প্রতিহিংসায় জ্বলে উঠা প্রতিশোধ পরায়ণ ওসব বাস্তুচ্যুত মানুষদের আদিবাসীদের জন্য সংরক্ষিত এই বিশেষ এলাকায় দিলেন। নিরন্ন ক্ষুধার্ত বাস্তুচ্যুত এসব মানুষ প্রথমে ভিক্ষাবৃত্তি অবলম্বন করে। সরকারের নীরব সমর্থন ও মদদে এসব মানুষ প্রকাশ্যে আদিবাসীদের উপর প্রতিহিংসার ঝাল মেটাতে শুরু করে। গোলাঘর লুট করে, গরু বাছুর টেনে নিতে থাকে। এরপর লুঠপাত হত্যা ধর্ষণ, গ্রামকে গ্রাম অগ্নিসংযোগ, জ্বালাও পোড়াও, স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তি প্রকাশ্য দখল হত্যাকার সন্ত্রাস ও নৈরাজ্যেও সাম্রাজ্য কায়েম করে। হাজার বছরের শান্ত সুনিবির আদিবাসীদের স্বপ্নভূমি হিংসা আর সন্ত্রাসের আগুনে জ্বলে উঠে। পরিণত হয় মানবতা লংঘনের অবাধ স্বপ্নপুরিতে।
রেভা. সুভাষচন্দ্র সাংমা তার জি. বি.সি এর ইতিহাস পুস্তিকায় জানিয়েছেন এসব অন্যায় অবিচার ও মানবতা লংঘনের বিষয় সরকারের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করলে উল্টো অপমান অপদস্ত হতে হতো বলে। সরকার ও প্রশাসনের এহন নির্লজ পক্ষপাতিত্ত্ব, নীরব সমর্থন ও অদিবাসী উৎকাতের ষড়ষন্ত্র দেশের অগ্রসর অংশের মানুষ ও মানবতাবাদীদের স্তম্ভিত করে তোলে। সরকারের এমন অমানবিক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে যে ব্যক্তি প্রথম প্রতিবাদের ঝড় তোলেছিলেন তিহি হচ্ছেন ঢাকার আর্চ বিশ্বপ গ্রেইনার সি.এস.সি। (প্রতিবেশী সাপ্তাহিক ১০/১১/১৯৮০) আদিবাসীদের কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠে যে রাষ্ট্র ও সরকার সাথে বিমাতাসুলভ করছে। চরম নিরাপত্তাহীনতার মধ্য আদিবাসী দেশ ত্যাগ করতে থাকে।
আর্ন্তজাতিক মানবাধিকার সংস্থা ও দাতাদেশের ধিক্কার ও তোপের মুখে পড়ে সরকার। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার আইওয়াজমূলক পদক্ষেপ নেয়, মোতায়ন করে পুলিশ ও আনসার বাহিনী।
সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা প্রশমিত করার কাজে নিয়োজিত এসব পুলিশ ও আনসারদের ভবন পোষন দিতে হতো আদিবাসীদেরই। এসব বাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনের প্রচেষ্টা তো করেইনি উল্টো দাঙ্গাকারীদের গোপনে সাহায্য সহযোগিতা করতেন বলে অভিযোগ আছে।

সাম্প্রদায়িক সহিংসতা এমন ব্যাপক আকার ধারণ করে আদিবাসীদের দেশত্যাগ ছাড়া কোন গতি ছিল না। এই ইক পেশে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা থামানোর সরকারের সদিচ্ছা ছিল বলেও মনে হয় না। তাই আদিবাসীরা দলে দলে দেশ ত্যাগ বা হিজরত করতে থাকে ভারতে। কিন্তু আদিবাসীরা নির্বিঘ্নে নিরাপদে হিজরত করতে পারতেন না, সীমান্ত রক্ষীদেশ সশন্ত্র প্রতিরোধের সন্মখীন হতেন।

৭০০ জন আদিবাসীর হিজরত
১৯৬৪ সাল ৫ ই ফেব্রুয়ারি হালুয়াঘাট থানার ৭০০ জনের এক দল গারো প্রাণ বাঁচাতে দিন দুপুরেই ভারতে পালানোর সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু সীমান্ত বরাবর ছিল পুলিশ ও সীমান্ত রক্ষীদের সশস্ত্র ও সর্তক দৃষ্টি। তাদের সাথে ছিল সার্বক্ষনিক দায়িত্বে থাকা একজন ম্যাজিস্ট্রেট। নির্দেশ ছিল আদিবাসীরা যাতে কোনভাবেই ভারতে প্রবেশ করতে না পারে। কী অদ্ভুত বিষয় দেশে আদিবাসীদের নিরাপত্ত্বাও দিতে পারবে না সরকার আবার দেশ ত্যাগ করতে পারবে না। এই ছিল আদিবাসীদের জাতীয় জলে কুমির ডাঙ্গায় বাঘ।

চরম নিরাপত্তাহীনতার ভেতরে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ভারতের অভিমুখে আগ্রসর হতে থাকে গারোরা। অবধারিত পরিণতির কথা ভেবে ফাদার জর্জ পোপ কর্তব্যরত ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে ছুটে গিয়ে অনুরোধ করলেন যেন দেশত্যাগীদের উপর কোনোরূপ হামলা করা না হয় এবং নির্বিঘ্নে যেন সীমা অতিক্রম করে যেতে পারে। ফাদার জর্জ পোপ সীমান্ত রক্ষীদের মতিগতি ভাবভঙ্গি মেজাজ মর্জি দেখে অনুমান আশঙ্কা করেছিলেন যে সীমান্ত রক্ষীরা জেনে শুনেই হয়তো অঘটন ঘটাতে পারে।
কর্তব্যরত ম্যাজিস্ট্রেট রাজি হলেন এক শর্তে। শর্ত হলো দেশত্যাগীরা নিরস্ত্রভাবে সীমান্ত অতিক্রম করবে, কোনো অস্ত্র নেয়া যাবে না। ফাদারের আহ্বানে গারোরা অস্ত্র ( অস্ত্র বলতে গারো তরবারী, মিল্লাম, লাঠি, পালা, বর্ষা ) গুলো তাদের কাছে জমা দিলেন। শুরু হলো অনাকাঙ্খিত ঘটনা। হিংস্র বাঘের মতই প্রথমে ঝাপিয়ে পড়েন ফাদার জর্জ পোপের উপর। সীমান্ত রক্ষীরা রাইফেলের বাট দিয়ে ফাদারের মাথায় আঘাটের পর আঘাট করে বেয়নেট দিয়ে অচিরে ফাদার জর্জ পোপকে মাটিতে ফেলে দেয়। এর পর এলোপাথারি গুলি চালিয়ে কয়েকজনকে ঘটনাস্থলেই হত্যা করে। (সাপ্তাহিক প্রতিবেশী ২০০২)

আদিবাসী হত্যা ও ৬ই ফেব্রুয়ারি
হেমার্সন হাদিমা “কাকরকান্দি বিভাগের ইতিহাস” নামক পুস্তিকায় ৬ই ফেব্রুয়ারির আদিবাসী হত্যা ও ট্র্যাজিডির বিশদ বিবরণ তুলে ধরেছেন। লেখক নিজেও ছিলেন সেই দেশত্যাগীদের একজন। পেকামারী পানি হাটার আদিবাসী হত্যার প্রত্যক্ষদর্শী নীরব সাক্ষী হেমার্সন হাদিমা, নির্মল রিচিল করুন দিও আরো অনেকেই বেচে আছেন জীবন্ত সাক্ষী হয়ে। হেমার্সন হাদিমা ৬ই ফেব্রুয়ারীর ঘটনা প্রবাহের জীবন্ত তথ্য ও মর্মান্তিক চিত্র তুলে ধরেছেন। তখন সহিংস সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের আঘাতে রক্তাক্ত ক্ষত বিক্ষত এই আদিবাসী জনপদ। সরকারের ইচ্ছাকৃত পক্ষপাতের কারণে আইন শৃংখলা অসহনীয় মাত্রায় অবনতি ঘটে। চরম নিরাপত্তাহীনতায় আতংকে কেঁপে উঠে আদিবাসীরা। অমানবিক নিষ্ঠুরতার শিকার পরিণত হয় আদিবাসীরা আর্তচিৎকারে বির্দীন হয় পাহাড়ী ভূমি। দেশত্যাগের মিছিল জলতে থাকে । অবাধ মানবতা লংঘনের এসব তথ্য যাতে বহির্বিশ্ব জানতে না পারে তার জন্য প্রথমে খ্রিষ্টান মিশনারীদের গারো এলাকায় নিষিদ্ধ ঘোষণা করে সরকার। মানবাধিকার কর্মীদের অবাধ চলাচলের উপর বিধিনিষেধ আরোপ করে।

এ ভীতিজনক ভুতুরে পরিবেশ ও পরিস্থিতিতেই নালিতাবাড়ি থানার ১০ টি গ্রামের সাত সাম্প্রদায়িক একত্রিত হয়ে এক বিশাল গারো জনতা দেশত্যাগ করেন ৬ই ফেব্রুয়ারি। এই ১০টি গ্রামের গারো ও কিছু সংখ্যক ডালবা ৫ই ফেব্রুয়ারির কৈলে কাকরকান্দি গ্রামের মেজান নকরেকের বাড়িতে সমবেত হন। তখন দাঙ্গাকারীরা আদিবাসীদের গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দিচ্ছিলেন। পরদিন দুপুর ১২টায় মেজান নকরেকের বাড়ি থেকে ভারতের উকেণশ্যে দেশত্যাগের মিছিল শুরু হয়। মিছিলের অগ্রভাগে ডানে বায়ে ও পেছনে পাহারায় ছিল সাহসী সশস্ত্র যুবকদের দল। দেশত্যাগী এই মিছিলে আনসার বাহিনীর সহায়তায় দাঙ্গাবাজার কয়েকবার আক্রমনের ব্যর্থ প্রচেষ্টা চালায়। এসব আক্রমন প্রতিহত করে সামনে এগিয়ে চলে দেশত্যাগীরা এভাবে বেশিরভাগ লোক যখন বর্তমান বাংলাদেশের বর্ডার বোর্ড অতিক্রম করছে ঠিক সেসময় গাড়ি ভর্তি সশস্ত্র সীমান্ত রক্ষীরা বর্ডাও রোড হয়ে পূর্বদিক থেকে এগিয়ে আসতে থাকে। বর্তমান রংমান পাড়ার ফরেষ্ট অফিসের সামনে গাড়ী রেখে ঘাটক বাহিনীরা জংগলের ভেতর দিয়ে দ্রুত দৌড়ে গিয়ে সুবিধাজনক স্থানে এ্যাম্বুস গ্রহন করেন। মিছিলটি যখন দুপাহাড়ারের মাঝদিয়ে সেই সংকীর্ণ পথ দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে ঠিক সেই মুহুর্তে খুব কাছ থেকে ঘাটক বাহিনীর একের পর এক গ্রেনেড ছুড়তে থাকে নিরীহ দেশত্যাগীদের লক্ষ্য করে সে সাথে চলে অবিরাম গুলি বর্ষন। মর্হুমহূ গুলি আর গ্রেনেডের বিকট শব্দে প্রকম্পিত হয়ে উঠে নির্জন পাহাড়, অবিশ্বস্য ঘটনার আকস্মিকতায় ভয়ে আতঙকে আদিবাসীরা জংগলের ভেতর এদিক ওদিক দৌড়ে পালাতে থাকে।

হৃদয় বিদায়ক এই হত্যাকাণ্ডের তীব্রতা এতই ভয়াবহ ও বেদনাময় যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিটলারের ইহুদী নিধনকে স্মরণ করিয়ে দেয়। সদ্য বিবাহিত থসান তার প্রিয়তমা স্ত্রী হাত ধরে প্রাণ বাঁচাতে পালাচ্ছিলেন, এমন সময় ঘাটকদের তাড়া করা গুলিতে তার প্রিয়তমার মাথার খুলি উড়ে যায়। সঙ্গে সঙ্গে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে থসানের স্ত্রী। প্রিয়তমা স্ত্রী নববধু নামরী । থসানের বা হাতের কব্জিতে গুলি লেগেছে কিন্তু সে দিকে তার কোন খেয়াল নেই। সে তার স্ত্রীর লাশ তুলে পালানোর চেষ্টা করছে কিন্তু পেছনে চলে আসা লোকগুলো লাশ রেখে থসানকে পালাতে বাধ্য করে। থসান পিছু ফিরে তাকাচ্ছে আবার পালায়ে অনুপমা দিও তার দুবছরের ঈস্খথম কন্যা সন্তান দিপ্তীকে পিঠে বেধে স্বামীর হাত ধরে পালানোর সময় হোচট খেয়ে মাটিতে পড়ে যায়্ । তার স্বামী তাকে দ্রুত টেনে তুলে দৌড়াতে শুরু করলে পেছন থেকে ছুটে আসা গুলিতে মা ও মেয়ের পিঠ ঝরঝরা হয়ে যায়। শিশু পলার মা পলাকে পিঠে বেধে পালাচ্ছে পালানোর সময় পলার মায়ের গ্রীবায় গুলি লাগলে সঙ্গে সঙ্গে উবুর হয়ে মাটিতে পড়েন। পলা কাদতে থাকে চিৎকার করে। রক্তে ভেসে যায় পলার সারা শরীর। এই অবস্থায় শিশু পলার মামা পিঠে বাধা শিশু পলাকে মায়ের কাছ থেকে ছাড়িয়ে পলাকে নিয়ে পালায়। এভাবে গারোদের লাল তাজা রক্তে রঞ্জিত হয় পানিহাটা পেকামারীর সবুজ পাহাড়। আহতদের অসহায় ক্রদন আর আহাজারিতে ৬ই ফেব্রুয়ারির পড়ন্ত বিকেল বেদনায় ভারি হয়ে উঠে। আহত ও মুমূর্ষদের বেয়নেট খুচিয়ে হত্যা করা হয়।

এই হত্যাকাণ্ড ঠিক কতজন নিহত হয়েছিলেন তার সঠিক তথ্য নেই। কেউ বলছেন ১৮ জন কেউ বলছেন ১৯ জন কেউ বলছেন কম হলেও ২৫ জন। দেবীপুর গ্রামের করুন দিও জানিয়েছেন এক সপ্তাহর পর দুর্ভেদ্য পাহাড় থেকে দুজনের গলিত লাশ পাওয়া গিয়েছিল তাদের নাম ও ঠিকানা জানা যায়নি। হেমার্সন হাদিমা তার পুস্তিকায় ১৬ জনের নাম লিপিবদ্ধ করেছেন। প্রত্যক্ষদর্শী করুন দিও নিহত তিনজনের তথ্য দিয়েছেন আর এই তিনজন হচ্ছে পলার মা ও অন্যদুজন উল্লেখিত দুজনের লাশ তাহলে সংখ্যা দাঁড়াচ্ছে ২১ জন। নিহতরা হলেন- ১। অনুপমা দিও ২। দিপ্তী দিও(বয়স ২বছর) ৩। সুধামনির রাকসাম ৪। স্বর্ণমনি রাকসাম ৫। শয়নি রাকসাম ৬। মসলা দিও ৭। থসানের স্ত্রী নামরীয়া ৮। উষাবালা রাসভর ৯। শনমনি নেংওয়া ১০। ফনিভুষন রাকসাম ১১। সুগেন্দ্র রাকসাম ১২। দধিরাম নাফাত ১৩। মাফাল চিসিম ১৪। সুধীর চাম্বুগং ১৫। জ্ঞানেন্দ্র দিও ১৬। বিশ্বনাথ বাসভর ১৭। অখেন্দ্র রাকসাম ১৬। ভক্তি রাকসাম ১৯। শিশু পালা রিচিলের মা ২০। অজ্ঞাত
এইসব লাশ ট্রাকে এনে ময়মনসিংহের সম্ভুগঞ্জে পুরনো ব্রম্মপুত্র ফেরিঘাটের পঞ্চাশ পজ দক্ষিণে বালুচড়ে গণকবর দেখা হয়েছিল বলে জানিয়েছেন হেমার্সন হাদিমা ও প্রত্যক্ষদর্শী প্রবীন ব্যাক্তি। সাবেক বৃহত্তর ময়মনসিংহের উত্তরাঞ্চল আদিবাসীদের জন্য ব্রিটিশ ভারত সরকার কর্তৃক সংরক্ষতি (১৯৩৫ ভারত শাসন আইন) এই আংশিক শাসন বহির্ভূত এলাকায় এই যে ৬ই ফেব্রুয়ারি আদিবাসী হত্যাকাণ্ড সরকার সৃষ্ট একপেশে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ছিল আদিবাসীদের অস্তিত্ব ও মেরুদন্ড ভেঙে গুড়িয়ে দিয়ে সংখ্যালঘু করণের ঘৃণ্য নির্লজ্জ এক নীলনক্রা। এই নীলনকশার শিকারে পরিণত হয়েছিল আদিবাসীরা। আদিবাসীদের হাজার বছরের ইতিহাসে এছিল শেকর হাড়ানো এক নির্মম ট্র্যাজিডি, এক কালো অধ্যায়, এক কালো ইতিহাস। এই ইতিহাস ভোলা যায় কি? ভুলতে দেয়া যায় কি? এই ৬ই ফেব্রুয়ারি আদিবাসী হত্যা ও সংখ্যালঘুকরণের দিবস হিসেবে পালন করা যায় কিনা? ছাত্র যুবক শিক্ষক সাংবাদিক আদিবাসী সুশীল সমাজ ও বিদগ্ধ পাঠকদের কাছে প্রশ্ন থাকলো।




সম্পাদক : মিঠুন রাকসাম

উপদেষ্টা : মতেন্দ্র মানখিন, থিওফিল নকরেক

যোগাযোগ:  ১৯ মণিপুরিপাড়া, সংসদ এভিনিউ ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৫। 01787161281, 01575090829

thokbirim281@gmail.com

 

থকবিরিমে প্রকাশিত কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। Copyright 2020 © Thokbirim.com.

Design by Raytahost