Thokbirim | logo

১লা আষাঢ়, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ | ১৫ই জুন, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

ছোটগল্প ।।  ওয়ান্নার কান্না ।।দেবাশীষ ইম্মানূয়েল রেমা

প্রকাশিত : জুলাই ১৮, ২০২০, ১১:৫১

ছোটগল্প ।।  ওয়ান্নার কান্না ।।দেবাশীষ ইম্মানূয়েল রেমা

উঠানে নেমে এসেছে কয়েক জোড়া ঘুঘু। এসেই ঘুউউ ঘুউউ গান ছেড়ে আনমনা খাবার খেয়েই যাচ্ছে খুঁটেখুঁটে। বাড়ির দক্ষিণ প্রান্তে নারিকেল গাছে আন্দোলন, পাতাভরা এক এক কান্ডের দুলুনি দেখে মনে হচ্ছে লম্বা এলোকেশীরা দুপাশে কেশ ছড়িয়ে মাথা দোলায়। বাড়িটার পাশেই রাস্তা, রাস্তার ওধারের নদীটা থেকে ধেয়ে আসে পুবেল হাওয়া। আর রাস্তার এধারে পুকুর পাড় থেকে ভেসে আসছে থোকা থোকা ফুটে থাকা গুচ্ছ টগর আর গন্ধরাজ ফুলের কড়া সুবাস৷

ভরা রৌদ্রে গাছের শ্যামল শীতল ছায়া যেমন প্রশান্তির পরশ বুলিয়ে দেয় তেমনি এক অন্যরকম ছবিও এঁকে দেয়। আহা, কী শান্তি! বারান্দায় চাটাইয়ে বসে এসবই মন্ত্রমুগ্ধের মতো দেখতে থাকে সালদো। নীরবে একধ্যানে বিভোর হয়ে আছে সে। মগ্নতা ভেঙে এক পর্যায়ে ভাবতেও থাকে তার এই দিনগুলি, এই ছবি অমলিন থাকবে তো? এই মিষ্ট সুবাসে ভরপুর পাগল করা হাওয়া, পুকুর জলের খেলা মৃদু ঢেউ, সেই টগর-গন্ধরাজ আর তাদের ছড়ানো স্নিগ্ধ শুভ্রতার গন্ধ, গাছের ছায়ার নিবিড় প্রশান্তি, ধান ক্ষেতে ভরা রৌদ্রের সেই ঔজ্জ্বল্য অমলিন থাকবে তো?

সালদো আপন মনে বোনটার কথা ভাবে। যার বাড়ি, যার ঘর, যার পরম মমতায় এ ঘরে লক্ষ্মী বিরাজ করে সেই বোনটা কুলরানি হয়ে মাহারির জ্যোতির্ময়ী হয়ে বিরাজমান থাকবে তো? “সালোরা এখন কোথায়? কোথায় গেলো সে? ও পাড়ায় গেছে বোধহয়, নিশ্চয় তার বান্ধবীদের বাড়ি বাড়ি ঘুরছে।” ছোট বোন সালোরার সইদের কথা মনে পড়তেই বালস্রির কথাও মনে পড়ে গেল ওর। বালস্রির চোখ যেন মায়া হরিণী। সালদো চোখ ফেরাতে পারে না। বালস্রিই কি আর লুকোতে পারে কিছু? সালদোর অভ্রভেদী চোখে ধরা পড়তে বাধ্য বালস্রির বুকের নীরব ভাষা, নীরব স্পন্দন, না বলা সব কথা।

থেংমী, থোরা, সিল্লা এমনকি বান্ধবীদের সাথে সাথে সালোরাও হেসে কুটিকুটি হয় দাদা সালদো আর বালস্রিকে দেখে। এই নিয়ে সইদের মধ্যে কত খুনসুটি চলে। সালোরা চায় তার দাদা আর বান্ধবীর মধ্যেকার অব্যক্ত কথারা আরও কটাদিন এক অজানা আকুলতায় অব্যক্ত হয়েই থাক না। তারপর বোনটাতো আছেই। বান্ধবীটাকেও নাকানিচুবানি খাওয়ানোর সুযোগটা কি আর হাতছাড়া করা যায়? ষোড়শী-অষ্টাদশীদের সময়টা মন্দ কাটছে না। এদের মধ্যে সালোরা, বালস্রি এবং তাদের বান্ধবীরা স্কুল-কলেজ ছুটিতে হোস্টেল থেকে বাড়ি এসেছে সপ্তাহখানেক আগে। ছায়াসুনিবিড় সমতল আদিবাসী গ্রামটাকে শহুরে হাওয়া ছুঁতে পারেনি এখনো। মাঠের সবুজ তাজা ঘাসের সতেজ ঘ্রাণে, পাহাড়ের কোল ঘেঁষে বয়ে চলা পাহাড়ি স্রোতের স্বচ্ছ জলে প্রতিদিন জীবন জুড়ায় পাহাড়ের পাদদেশে পাহাড়-কন্যা গ্রামটির।

হঠাৎ দ•দি (তোতা পাখি)-র ডাকে সম্বিত ফিরে সালদোর। এক অজানা দুশ্চিন্তাও যেন ওকে পেয়ে বসে। ভিটেয় ঘুঘু চরলে কীইবা আসে যায়। কিন্তু সময়টা যে পূর্বপুরুষদের নয়, উনারা গত হয়েছেন, রেখে গেছেন প্রজন্ম। প্রজন্মরা আজ বিদেশীদের দেখে। আ•চিক আসং বা গারোদেশ দিনে দিনে তিলতিল করে ভরে উঠছে বিদেশি দখলদারীত্বে। ওদের ভাষায় ‘ভিটেয় ঘুঘু চরা’ একটা লোকপ্রবাদ যা অশুভ লক্ষণ। এর অর্থ ভিটেমাটি এমন নির্জন জনশূন্য করা যে তা হয়ে উঠবে ঘুঘুদের বিচরণের উপযুক্ত স্থান। তাই কথায় কথায় ওরা বলে ভিটেয় ঘুঘু চরিয়ে দিব। ওরা চারদিক গ্রাস করে ফেলায় এখন সবকিছু ওদের চালেই চলে। ভিটেয় ঘুঘু দেখাটা এখন যেন কেউ দেখতে চায় না। হয়তো একারণেই ক্বদাচিৎ বনকপোত-বনকপোতীরা লোকলোকালয়ে নেমে আসে। বিদেশি আকাশমণিদের ছড়ানো বিষাক্ত বাতাসে ওরা আর নেই।

এখনকার দাদু-দাদীরা আনাল-গোনালের গল্পও ভুলে যাচ্ছে ওদেরকে দেখতে না পেয়ে; নাকি ইচ্ছে করেই ভুলে যাচ্ছে, ভুলে যাবার ভান? আনালদের পাতা ফাঁদে, ওদের খাঁচায় বন্দী হবে নাতো আমাদেরই কোন বোন? ওরা আনালেরা রাক্ষসের মতো খেয়ে ফেলবে তাজা প্রাণ। বালস্রি কি সালদোর মধ্যে থাকা গোনালকে চিনে নিতে পারবে যে গোনাল তাকে সাক্ষাৎ লক্ষ্মীদেবীর আসনে বসিয়ে রাখবে? যে পতিদেব কৃষ্ণগোপাল যার জন্য জীবন বাজি রেখে আনালদের লোভাতুর লালসামাখা দৃষ্টির বিরূদ্ধে অবিরাম যুদ্ধ করে বিজয়ী হয়? যার ভালোবাসার কাছে হেরে যায় আনালদের সমস্ত ছলচাতুরী, হীন অপচেষ্টা আর পরাজিত আনালদের বেছে নিতে হয় নির্ধারিত গন্তব্য? বালস্রি যে সালদোর জাঙ্গি (প্রাণ)! চোখ ফিরিয়ে নিয়ে ফুড়ুৎ করে উড়ে যাবে না তো আনালদের বক্ষে যেমন পতঙ্গ ঝাঁপ দেয় আগুনের হল্কায়?

হাজারো প্রশ্ন সালদোর মনে উঁকি দেয়।

সালদোর ভাবনায় ছেদ পড়ে তার বড় মা দিক্খা এবং বড় মামা ফং এসে পড়ায়। একটু পর তার মাসি জাংথিও সেখানে খকগ্রেং (ঐতিহ্যবাহী ঝুড়ি) নিয়ে চলে আসে। ছোট মামা চু আকিজ বিড়ি হাতে দলতে দলতে চলে আসলে তাদের ভাইবোনদের মধ্যে আলাপ বেশ জমে উঠে। সালদোর আম্বি-আচ্ছু ওর মামা-মাসিদের নাম আদর করে এভবেই রেখেছিলেন। বড় মামা বললেন, “জাক্খালরংগিপ্পা আরঙ্গানি বিজাকনি তামুকখো ওয়াদ্দে দা•ওদে আকিজ বিড়িখোসা জাক্কালনা নাংজক (পাতার বিড়ি ছাইড়্যা অহন আকিজ বিড়িই টানোন লাগে)”। বড় মা এতে যোগ দিলেন, “অএরো, দা•ওদে বাদিকি দাকা সালরাংবা সকবাজকহাই! মান্দি মিচিকরাংবা জাওয়াগিপ্পিন্নি মেসারাংনাহা গিলমিক চা•ই চা•সি চা•থোৎদাকথোকারারা (কোন জামানা যে আইলো! গারো মাগীগোর অহন পরদেইশ্যা চ্যাংড়া পোলাপাইনগুলার লাইগ্যাই যত্তো চুলকানি-কুটকুডানি)।”

বড় মামা এক দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বললেন, “নিনানদে না, দা•ওদে ইয়া চাসোঙোদে রুরিরাং মান্দি নকচা আনথাংনি দেফান্থি না নামছিক সিংনা সকবানাজক। মান্দিরাংবা আনথাথাংনি দেমিচিকরাংনা রুরি নকছা চাওয়ারি সিংনাহা রিয়াংমেকব্রুনাজক। রুরি নকমিং মান্দি নক বেওয়াই খা•নাজক। দা•ওখিনিবা রুরি মেসামিং মান্দি মিচিক সেখ্গি খাদ্দিঙা। মিক্খাং সাল্লোদে দাক্কারাং দংজানাজক। বেওয়াইসা খা•জলারিনাজক। দা•ওনি চাসোঙোদে ইয়ারাঙিন অংনো। উয়া সালরাংখোন নিনা নাংনাজক। (দেখবা যে জামানায় আইলো, হেইত্যা দিন আইয়্যাই পড়ছে, কবে যে পরদেইশ্যারা গারো বাড়ি সম্বন্ধর লাইগ্যা আইয়্যা পড়ব কওন যায় না। গারোগুলাইনও যাইব পরদেশীগোর বাড়াত সম্বন্ধ লইয়্যা। এহনে বেডার লগে বেডি ভাইগ্যা যায়, হেই বেলা আর অইতোই না এইরহুম। একজন আরেকজনের ভুগোলো যাইবো সম্বন্ধ লইয়্যা। এক্কেরে বেয়াই পাতায়ালাইবো। এইগুলানি অইবো। হেইত্যা জামানাই দেহন লাগবো, দ্যাহনে আইতাছেতো সময়ডা।”

বাইরে কড়া রোদ পড়েছে। জলবায়ুর পরিবর্তনের প্রভাব বাংলাদেশের সবখানে। বিদ্যুৎ, ছোট হাট-বাজার, পাকা সড়ক, ঘরে ঘরে পাকা বাড়ি, প্রতিবেশীদের ঘরে উঠতি ছেলেপিলেদের সাউন্ড বক্সে হাই ভলিউমে রক-মেটাল ধাঁচের কানঝালাপালা গান শোনা সবকিছু দেখে পাহাড়-কন্যাকে আর চেনাই যায় না। বড্ড অচেনা লাগছে। উন্নয়নের জোয়ারে গ্রামটাই কেমন যেন খা খা ধূ ধূ মরুভূমি মনে হয়। ভিটেবাড়িগুলোর কোথাও আর শ্রী নেই। সালদো এবং বালস্রির বিয়ের মাত্র চৌদ্দ-পনেরো বছর পেরোতে না পেরোতেই এত শ্রীহীন পরিবর্তন সালদোকে অতীতে তার আশঙ্কার কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। আজ সকাল সকাল বাজার করে নিয়ে আসতে হবে।

সারাদেশে লকডাউন, গ্রামে আবার শহরকে ছাড়িয়ে আরও বাড়াবাড়ি রকমের লকডাউন। রাস্তায় গাছের গুঁড়ি ফেলে রাস্তা ব্লক করে দিয়েছে। চেয়ারম্যান-মেম্বাররা কাওকেই ঘর থেকে বেরোতে দিচ্ছেন না বিশেষভাবে একটা নির্দিষ্ট সময়ে। সালদো পাড়ার মুজিবরের কাছে শুনেছে ঠিক ঐ সময়টাতে নাকি শুধু ট্রাকের শব্দ শোনা যায়। সবাই পুলিশ গাড়ি বলে চালিয়ে দেয়। মুজিবরের কথা হল, “ও জাঙখার বাপ, (ফিসফিসিয়ে) পুলিশের গাড়ি আহে না, ট্রাক আয়ে ট্রাক। মাল ভইরা রেশনের ট্রাক আহে।” সালদো তাজ্জব বনে যায়। দেশে কিসব ঘটে চলেছে। সালদো সেদিন আর কিছু বলতে পারল না। দেখল মুজিবরের মাস্ক নেই, তাই ঘর থেকে এক্সট্রা মাস্ক এনে মুজিবরকে পরতে দিয়েছিল।  মাস্ক এক বক্স পাঠিয়েছে ছোট বোন সালোরা।

সে এখন সরকারি সিনিয়র নার্স। বোনটার জন্য অনেক চিন্তা হয়। ওরা স্বামী-স্ত্রী ঢাকায় আছে। মাঝে বনিঙের (সমন্ধি) সাথে কথা হয়েছে। বেশ ভালোই আছে বলল। রাতের আঁধারে শয়ে শয়ে গ্রামের লোক তল্পিতল্পা নিয়ে দেশের বাড়ি ফিরছে। চাকুরী হারানো সব। ঘরভাড়া দিতে পারছে না, ঘরে খাবার নেই, অগত্যা আবার ফিরতে হচ্ছে মাটির কাছে। পুলিশ আসতে দেয় না, প্রাইভেট কার কিংবা মাইক্রো ড্রাইভাররা কিছু টাকা গুঁজে দিয়ে ম্যানেজ করে নেয়। এর জন্যও গাড়ি ছাড়ার পূর্বেই ড্রাইভারকে আলাদা হিসাব বুঝিয়ে দিতে হচ্ছে, এম্নিতেই সাত/আট হাজারের নিম্নে কোন ড্রাইইভার রাজি হয় না তার ওপর এই লকডাইনে চড়া হয়ে গেছে সব। যাদের পক্ষে এই বড় অঙ্কের টাকার ব্যবস্থা করা সম্ভব না কিংবা গ্রামের বাড়িতে জমিজমা, ভিটেমাটি কি ঘরবাড়ি কিছু নেই তারা সব যন্ত্রণা সয়ে ঢাকাতেই থেকে যাচ্ছে। লকডাউনে দূরপাল্লাসহ গণপরিবহন বন্ধ করে দিয়েছে সরকার। করোনা অতিমারী সব পালটে দিয়েছে, কত স্বপ্ন ওলটপালট হয়ে যাচ্ছে, কেবল গুছিয়ে নিচ্ছিল কেউ কেউ তাদের সদ্য সংসার অথচ শুরুতেই তছনছ করে দিল কোভিড-১৯।

বাজারে গিয়ে সালদো দেখে দূরত্ব বজায় রেখে সালগি, সিলগা, সালজ্রাং ওরা কথা বলছে। কিছুক্ষণ পর রিম্মিট, থাংসিম ওরাও এসে যোগ দিল। বেশ গরম গরম মনে হচ্ছে ওদেরকে। সালদোকে দেখেই সিলগা বলল, ” মাই মসা না•আদে খিন্নাখুজামা উয়া নকমা সিল্টেকদে, জারা বুর্বকদে আনচিংনি মান্দি মিচিকরাংখোদে ফাল্লি চা•না আম্মিংজকনা দি? (বেওয়াই হুনছুইননি নকমার কান্ড, হাঁদারাম গবেট নকমায় আমগোর মাইয়্যাগুলারে নিয়া নাহি সওদা করনের লাইগ্যা উইঠ্যা পইড়্যা লাগসে, সওদা করবো সওদা)।” (নকমা – রাজা, গ্রামপ্রধান, দলনেতা, হেডম্যান)

সালদো বুঝতে না পেরে আবার প্রশ্ন করল, “ফাল্লি চা•না? আঙাদে থালজাংজক। নাম্মি থাল্লি আগানস্রাংবো মসা আংনাদে” (সওদা? বুঝবার পারলাম না তো বেয়াই, পরিষ্কার কইর‍্যা কইন দ্যাহি)।

সালজ্রাং বলল, “অএবা মসা, উয়া গাঙ নালসানি জাফর মিংগিপ্পা ফান্থি দিসা আ আনচিংনি ওয়ান্নাখো নামনিকঙানা, বিখো দংনা আম্মিঙানা। ওয়ান্নাখো মানজাওদে খাই সিনোনা ইন্নি ফাগিপানা আগানিঙানা। ইনা ফাগিপা ফারুক আ রিজভীখো, কামরুলখো, মনুখো রিম্মিমিংনা নকমাছা রি•বানা। ফারুক আ গ্রাপি গ্রাপি আগানানা নকমানা, মলমলানা, রিকোয়েস্ট খা•না নকমাখো। ইনানিন নকমাবা ওয়ান্না মাগিপা-ফাগিপাছা রি•বানারো বেওয়াই ফাত্থিগিতনা ফারুকমিং। (গাঙ্গের হেই পাড়াত থাহে না জাফর নাম কইরা পোলাডা হেইডা নি আমগোর ওয়ান্নারে নিকা করবার চায়, পছন্দ অইছে নাহি বহুত। হের বাহেরে নাহি কয় ওয়ান্নারে না পাইলে গলাত দড়ি দিয়া মরবো। এইড্যার লাগি হের বাপ ফারুইক্যা রিজভী, কামরুল, মনুরে লগে লইয়্যা আমগোর নকমার বাড়াত আইছে। ফারুইক্যা নাহি কাইন্দ্যা কাইন্দ্যা ভাসায়ালাইছে, নকমারে পায়ে পইড়্যা রিকুয়েস্ট কইরছে। হেইডার লাগি নকমায় ওয়ান্নার বাপ-মার ভুগোলোত গ্যাছে ফারুইক্যার লগে সম্বন্ধ পাতাই তো।”

সালদো সারা রাস্তা ভেবে কূলকিনারা পেল না এ কি করে সম্ভব। এও কি হয়! তবে যে আশঙ্কা মা-মামারা করেছিলেন, যে ভবিষ্যদ্বাণী দিচ্ছিলেন গুরুজনেরা তাই কি হতে চলেছে। নিজেদের অসতর্কতা, অবিবেচনাপ্রসূত আজ কিম্ভূতকিমাকার পরিস্থিতির সম্মুখীন। সালদো বুঝতে পারে এভাবে চলতে দিলে ভবিষ্যত কোথায় গিয়ে ঠেকবে। বাতাস ভারী হয়ে আসতে থাকে। থমথমে। রুদ্ধশ্বাসে নাক বন্ধ হয়ে আসার উপক্রম। করোনার ছোবলে গোটা বিশ্বপ্রকৃতি, সমাজ-সামাজিকতাকেও সেই করোনা এসে যেন গলার টুঁটি চেপে ধরেছে। সমাজের নাসারন্ধ্রে গিজগিজ করছে করোনা ভাইরাস বিজ্ঞানীরা যার নাম দিয়েছেন কোভিড-১৯। গ্রামে প্রচুর কানাঘুষা চলছে। অপরদিকে গ্রামের পুরুষেরা, চাচ্চি-আংবাকরা (নিকটস্থ মাতৃসম্পর্কীয়া আত্মীয়-স্বজন) চ্রা-দাল্গিপার (মাতৃসম্পর্কীয়া জ্যোষ্ঠ অভিভাবক পুরুষ) উঠানে।

সালদো সোজা রাস্তায় হেঁটে না গিয়ে খানিকটা ঘুরে টিলার রাস্তা ধরে। ওদিকটায় ওয়ান্নাদের বাড়ি। সালদো বাড়িতে ঢুকলো না। শুধু ওয়ান্নাদের বাড়ি ঘেঁষে নীরব পায়ে হেঁটে আসল।বাড়িতে ঠিকমত উনুন জ্বলার কোন চিহ্ন নেই। রান্নাঘরটার পাশে ২/১দিনের ফেলে রাখা কয়লা। ঘরেও কেউ আছে বলে মনে হল না। ঠিক যেমন হুমকির সামনে ভয়ার্ত চোখে ত্রস্ত-সন্ত্রস্ত কোন শিকার নিজেকে লুকিয়ে রাখে জীবদ্দশায়ই  মৃত জীবে পরিণত হয় তেমনি। বাড়িটা যেন মৃত বাড়ি। বাড়ির পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় সালদো অস্ফূট কোন গোঙানি শুনল? দূর থেকে ভেসে আসা কোন কান্নার আওয়াজ? সালদো মনে করতে পারছে না। কণ্ঠস্বরটা কি ওয়ান্নার কণ্ঠস্বর? সালদো কি কাওকে বলতে শুনেছে, “নকমা সাবিসি (সাবিসি – ভাইরাস বা জীবাণু)”। খুবই অস্পষ্ট কণ্ঠটা কি ওয়ান্নার মা আদি (মাসি) মিগঙের? সালদো কিছুই বুঝতে পারে না, হাঁটতে থাকে, পথ যেন ফুরোয় না, সালদো হেঁটে যায় যেখানে তার জন্য অপেক্ষা করছে সালগি, সিলগা, সালজ্রাং, রিম্মিট, তাংসিমেরা।

নকমা সাবিসি হাঁক দেয়, “কই যাস্ সালদো? বাবারে, কই যাস্?”

গল্পকার দেবাশীষ ইম্মানূয়েল রেমা

আরো লেখা

Nokingni Nokdring : চিলেকোঠা ।। দেবাশীষ ইম্মানূয়েল রেমা

দেবাশীষ ইম্মানূয়েল রেমার প্রথম অনুবাদ গ্রন্থ ।। গারো লোককাহিনি-১ম খণ্ড

গারো লোককাহিনি ।। আওয়াত ও মাচ্ছাদু।।ভাষান্তর: দেবাশীষ ইম্মানূয়েল রেমা




সম্পাদক : মিঠুন রাকসাম

উপদেষ্টা : মতেন্দ্র মানখিন, থিওফিল নকরেক

যোগাযোগ:  ১৯ মণিপুরিপাড়া, সংসদ এভিনিউ ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৫। 01787161281, 01575090829

thokbirim281@gmail.com

 

থকবিরিমে প্রকাশিত কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। Copyright 2020 © Thokbirim.com.

Design by Raytahost
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x